Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি ৪৫

সাধন দাস

বদর বদর ৪

গোপাল বলে- হাঁটলে হার্ট ভালো থাকে।

ওর কলিগরা বলে- হাঁটুরে গোপাল।

আমি গোপালের সঙ্গী। আমার কলিগরা আমাদের বলে- হাঁটা কোম্পানি।

রিপন স্ট্রিটে গোপালের অফিস। হেঁটে আমার অফিস, হাজরারোডে (সাড়ে চার কিমি) আসে। অফিস শেষে দুই বন্ধু হার্টের চর্চা করি। গোপাল বললে- চল, তারাতলা ( সাত কিমি) যাই।

শুরু হয় আমাদের চরৈবতি। – কেনো?

– বেআক্কেলে লোকজনে কোলকাতা ছেয়ে গেছে। ছেলের বাড়ি থেকে এসেছিলো, বোনকে দেখতে। বোনের ছবি* নিয়ে গেছে। ফেরৎ দিচ্ছে না। আনতে যাবো।

– কেনো?

– বিয়ে ভেঙে গেছে।

– কেনো রে?

– বোন বলেছে ছেলের কান ছোটো, জিভ বড়ো।

– মানে? তোর বোন কি কবিতা লেখে?

– বোনকে শুনিয়ে ছেলে খাওয়ানো টিফিনের দাম কষেছিলো। আমার ধারণা পণ চাইবে।

আমি চুপ।

– বোন ইশারায় ছেলেটিকে চুপ করতে বলেছিলো, শোনেনি। ওরা লোক ভালো নয়। ভালো হলে, ছবি ফেরৎ দিতো। আনম্যারেড মেয়ের ছবি কেউ রাখে? আজেবাজে কী কাজে লাগিয়ে দেবে? ফোন করলে বলে, আজ দেবো কাল দেবো।

পা ভারি লাগছে। জিজ্ঞেস করি- কদ্দুর রে?

বদর বলে- জেনে কী করবি? পৌঁছনো নিয়ে কথা। কতো বছর বাঁচবি হিসেব করিস নাকি?

গোপাল যে রেগে আছে ওর কড়া নাড়া শুনেই বাড়ির লোক টের পেয়েছে।

অমায়িক ছেলেটি। দরোজা খুলেই ইঙ্গিতে ডাকলো, ভিতরে আসুন।

– দরকার নেই। ছবিটা দিন, ফিরতে হবে।

ছেলেটির মা এসে দাঁড়িয়েছেন। মায়েদের মতোই স্নেহভাষী- সম্পর্ক না হয় না হবে বাবা, একটু চা খেয়ে যাও।

গলা শুকিয়ে আছে। গোপালকে ঢোকার জন্যে ঠেলা দিই। গোপাল পা ঘষটে ভিতরে ঢোকে।

বসার ঘরে ছেলের বাবা চেয়ার এঁটে কাঠ হয়ে বসে আছেন। সোফা দেখিয়ে মা বললেন- বোসো বাবা। চা খেয়ে যাবে।

হঠাৎ ছেলের দিকে তাকিয়ে গোপাল বললো- চায়ের দাম নিতে হবে। নইলে খাবো কেনো? কোন সম্পর্কে খাবো?

ছেলেটি সামনে শোয়ার ঘরের নিচের চৌকাঠে পা চেপে উপরের চৌকাঠে হাত-আটকে দাঁড়িয়ে আছে। যেনো কাউকে বেরোতে দেবে না। চুলে বচ্চন কাট। কান দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটির বাবা গম্ভীর মুখে বললেন- খোকা, ছবি ফেরৎ দিয়ে দাও।

ছেলে পা দিয়ে মেঝে খুঁড়ছে। ঘাড় হেঁট। বাবা ধমকে উঠলেন- দাও।

খোলা দরোজা দিয়ে দেখলাম, ছেলেটি নিশঃব্দে বিছানা তুলে মাথার বালিশের নিচ থেকে ছবিখানা এনে গোপালের হাতে দিলো। একটা কথাও বললো না। ছেলেটার জিভ দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। লুকিয়ে রেখেছিলো মুখের ভিতরে।

বাবা শক্ত চওড়া গলায় বললেন- চা সিঙাড়া খাওয়ানো বাড়িতে আমরা ছেলের বিয়ে দিই না।

বাসস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম- তোর বোন কান দেখলো কী করে? বচ্চন কাট তো?

– সেদিন উত্তমকুমার ছিলো। বাস এসে গেছে। উঠে পড়।

জানলা দিয়ে দেখলাম, গোপাল হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। ওকে বড়ো একা লাগছে।

সাধন দাস।

*তখন মোবাইল আসিনি। স্টুডিওয় গিয়ে ছবি তুলতে হতো।

1

Leave a Reply Cancel reply