কুলিক রোববার : গ্রন্থ সমালোচনা : সাইকো

উত্তম দত্ত

‘অন্যদের মতো তুমিও কি বলবে আমি সাইকো?’

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রখ্যাত অধ্যাপক ও মনোবিজ্ঞানী Dr. Robert D. hare সারা জীবন ধরে মানুষের মন নিয়ে কাজ করেছেন। এই কানাডিয়ান গবেষক তাঁর ‘Psychopathy : Theory, Research and Implications for Society’ নামের বইটিতে সাইকোপ্যাথদের বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানিয়েছেন :

১) সাইকোপ্যাথি এক দুরারোগ্য মানসিক অসুখ। পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার থেকে এর জন্ম।

২) ক্ষতিকর আবেগ, ভীতিবোধের স্বল্পতা, উদাসীন সহানুভূতি এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

৩) এরা ঠান্ডা মাথায় অপরাধ করে, কিন্তু নিজের ত্রুটি স্বীকার করে না।

৪) এরা নিজের চরিত্র ধ্বংস করে, নিজেকে নষ্ট করে এক অদ্ভুত আনন্দ উপভোগ করে।

৫) ঐতিহ্যলালিত সামাজিক পরম্পরাকে আঘাত করে এরা অনুতপ্ত হয় না, বরং গর্বিত হয়।

এসবের চাইতেও একটি ভয়ংকর কথা লিখেছেন তিনি।  এরা একধরনের “sexual sadist who gets sexual excitement by inflicting psychological pressure on his victims.”

তরুণ কবি বুদ্ধদেব হালদারের ‘সাইকো’ বইটি পড়তে পড়তে এইসব কথা মনে এলো। (প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ২০২১)

এ বইয়ের কবিতাগুলির কোনও পৃথক শিরোনাম নেই। ১ থেকে ৫৮ সংখ্যায় তাদের পরিচয়। প্রথম কবিতার রচনাকাল ১১ নভেম্বর ২০১৮ আর শেষ কবিতাটি লেখা হয়েছে ২০ জানুয়ারি ২০২০। এই ১৩ মাস ধরে একটা পারাপারহীন অন্ধকারের ঘোর কবির আত্মাকে আত্মঘাতী মশালের আগুনে দগ্ধ করার চেষ্টা করেছে ঝাটিংগার রহস্যময় পাখিদের মতো। ডানা পুড়িয়েই তার আনন্দ। নিজের চামড়া ও মাংসপোড়া গন্ধেই তার অদ্ভুত প্রশান্তি।

প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন, কবিতার ভাষা বিষয়ে ন্যূনতম শুচিবায়ুতা বা puritanism থাকলে আপনি এ বই থেকে দূরে থাকুন, পড়বেন না। ছোঁবেনও না। কারণ ছুঁলেই হাত পুড়ে যাবে। অধিকন্তু আপনি নিছক বুদ্ধদেব হালদার নামে একজন তরুণ কবির লেখা পড়ছেন না। আপনি মুখোমুখি হচ্ছেন একজন ভয়ংকর সাইকোপ্যাথের একান্ত গোপন কনফেশন বক্সের। প্রথম কবিতাতেই দেখি তার নিরুপায় স্বগতকথন :

“একটা কবিতা লেখার পর দোতলায় ঘর বন্ধ করে চেঁচাতে থাকি। হয়ত সেদিন সারাক্ষণ বৃষ্টি হচ্ছে দারুণ।… পাড়ার অঙ্কের স্যার হকচকিয়ে বাবাকে বলে ফেলেন, ‘আপনার ছেলেটা কি পাগল?’ আমি জানি, নিভা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এবং আমাকে নিয়ে বাবা সারাজীবন অসম্ভব বিরক্ত ও লজ্জিত ছিলেন। তাঁর এই দুরবস্থা কাটাবার জন্য আমি বাবার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ফোন করে জিগেস করি, ‘বলুন তো, আমার কি নিজেকে পুড়িয়ে ফেলা উচিত?”

একটি শব্দও আরোপিত নয় এখানে। প্রতিটি অক্ষর মুমূর্ষুর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। অর্ধোন্মাদ এক সাইকো নিজের আত্মার উন্মাদনা নিয়ে নিজেই বিপন্ন। সকল লোকের মাঝে বসে নিজের মুদ্রাদোষেই সে নিজেই আলাদা, শোচনীয়ভাবে একঘরে। স্বাভাবিকভাবে তার কবিতাও শান্ত ও শিষ্ট পোশাক পরা চর্বিত-চর্বণ নয় : “ডাক্তারেরা বলছেন মাথার নিউরোট্রান্সমিটার ভেঙে গেছে আমার। এবং ভেস্তে দিয়েছি বাংলা কবিতার চিরাচরিত আদত।”

পাঠকের অনভ্যস্ত শ্রুতিতে পর্তুগিজ জলদস্যুদের মতো শানিত খঞ্জর ছুঁড়ে মারে তার কবিতা : ” বাঙালি কবিরা আমাকে নিয়ে ভীষণ লজ্জিত। সুর তাল কিছুই নেই আমার অনুভূতিতে।”

নিভা তার নির্মম নিয়তি। এই তান্ত্রিক সাইকো নিভার মুণ্ড কেটে তার মৃতদেহের উপরে বসে অনির্বাণ মন্ত্র উচ্চারণ করেছে। ‘পর্নোগ্রাফি’ থেকে ‘সাইকো’ সর্বত্রই উচ্চারিত হয়েছে এই কবিতা-মন্ত্রধ্বনি : “তুমিও চাইলে আমাকে ঘেন্না করতে পারো। আমার সমস্ত কল্পনাশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে এখন। তোমার কথা ভেবে বহুকাল বীর্যপাত করিনি।”

Sexual sadistic এই সাইকো জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের দু দণ্ড শান্তির মিথ ভেঙে চুরমার করে দিতে গিয়েও সোনালি স্বপ্নের হাত থেকে পুরোপুরি পালাতে পারেনি। আসলে কবি বুদ্ধদেব হালদার আদতে একজন আপাদললাট প্রেমিক কবি। ভালোবাসা পেলে তিনি আর পায়সান্ন খেতে চাইবেন না। যা খায় গরিবে, তাই খাবেন যত্ন করে বহুদিন। কিন্তু নিভা নামক নেমেসিসের হাত থেকে তাঁর পরিত্রাণ নেই :

★’আমার বুক ছাই করে চলে গেছ তুমি।… আমি পুড়ে যাচ্ছি। মরে যাচ্ছি, ওহ আমার জীবন।’

★’অনেকটাই রোগা হয়ে গেছি আমি। তোমার স্মৃতির নির্দেশে মাঝে মধ্যে কেঁদে ফেলছি রাতে। অথচ এল এস ডি ব্লটিং জিভে নিয়ে এখনও দারুণ স্বপ্ন দেখি আমি।’

★’তোমার গায়ে হলুদের দিন একটা ছোট্ট পাখি এসে বসেছিল আমার জানলায়। বিয়েবাড়িতে কত আলো। কত লোক। সাতরং। উপহার। হইহই। ভিড়। শুধু তুমি হাসছিলে, এবং হাসছিলে আমার চোখের জলের ভিতর।’

★ ‘ তোমাকে কত কথা বলার ছিল। তুমিই তো বলেছিলে, বীরভূমের কোন অজ গাঁয়ে দু-কাঠা জমি কিনবে। মাটির বাড়ি। সামনেটা গাছপালায় মোড়া।… নীল জ্যোৎস্না রাতে আমরা হাত ছুঁয়ে হেঁটে বেড়াব পথে। এসব কথা শুনলে লোকে হো-হো করে হেসে উঠবে। অথচ আমি তো জানি। তুমি মিথ্যে বলোনি।’

★ ‘তোমাকে চিঠি লিখেছি আমি কাল সারারাত।… কবিতা লেখার জন্য এই যে নিজের জীবনটাকে শুধুমুধু নষ্ট করলাম দিনের পর দিন, সেসব নিয়েও কথা হবে। এবং লেখা হবে।’

★ “বাংলাদেশ থেকে প্রতিরাতে ফাহিমা ফোন করে আমায়। এবং কান্নাকাটি করে রোজ, ‘আমি তোমারে সত্য সত্যই ম্যালা ভালোবাসি। আমি তোমারে বিয়া করবার চাই।’ ফাহিমা আমাকে কুকুরের মতো ভালোবাসে, ঠিক যেভাবে আমিও একদিন নিভাকে কুকুরের মতো ভালোবেসেছিলাম। বস্তুত আর ভালোবাসায় একটুও বিশ্বাস নেই আমার… “

বাংলা কবিতার পুরস্কার দান-প্রথা, কবিতা-উৎসবের রোমাঞ্চকর পক্ষপাতিত্ব, মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠের শূন্যগর্ভ আত্মতৃপ্তি এই সাইকো উত্তমপুরুষের মধ্যে প্রবল বমনেচ্ছা জাগিয়ে তোলে :

★’মঞ্চের উপর ব্যাঙগুলোকে পিষে ফেলছি পায়ে, এবং কবিতা পড়ার বদলে হেগে নেমে যাচ্ছি আমি। বলো, তোমরা কি আমায় অনুকরণে সমর্থ?’

★’যাদের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণাটুকু নেই তারা যখন আমার লেখা পড়ে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন, তখন তাদের প্রত্যেককেই স্রেফ খানকির ছেলে বলে ডাকতে ইচ্ছে করে।’

★’কোন মহাপুরুষ পাচ্ছেন এবারের যুবা সাহিত্য? তুমি কি তাহাকে চেনো? পড়েছ তাহার দু এক কলি ঢং?’

★’তোমার মধ্যে বহু ত্রুটি রয়ে গেছে হে জনৈক বুদ্ধদেব হালদার। কেন তুমি তাহাদের পাজামা ধরিয়া দিনরাত ঝুলিলে না?… সুযোগ সত্ত্বেও কেন যে সরকারের বুলি আওড়াইলে না?’

★’ একদিন এই পশ্চিমবাংলার সমস্ত কবি আমার 

বিরুদ্ধে মামলায় যাবে। অভিযোগ — বাংলা কবিতায় যা-হোক খুশি লিখে দারুণ পাঠক-প্রিয়তা অর্জন।… প্রিয় কবি, আপনারা কেন বোঝেন না, আপনাদের কাটা আঙুল বাংলাসাহিত্যে আর কোনো কাজে লাগে না এখন।’

★ ‘এখন কি তবে নিজেকে বেচে দেব চুতিয়া কবি-সমাজে?’

★’এখন আর শীতকাল ভালো লাগে না আমার। তুমি কি জানো, কী লিখিলে সরকারি কবিতা উৎসবে ডাক পাওয়া যায়?’

★ ‘আমি কবিতা লিখতে ভুলে গেছি এখন। আমার ডান আঙুলে লাফিয়ে উঠছে সাপের জিভ। অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন আমার বন্ধু রবীন্দ্রনাথ।  তিনি আমাকে চেয়ারে বেঁধে ধর্ষণ করছেন প্রতিদিন।’

এই হলেন সেই ‘জনৈক বুদ্ধদেব হালদার’। কবিতায় অপভাষা ও যৌনগন্ধী শব্দ প্রয়োগের অভিযোগে একদা হাংরিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছিল। কিছুকালের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিল সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’। তরুণ বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস পড়ে জনৈক দয়াবতী মহিলা এইসব লেখকদের আঁতুড়ঘরে নুন খাইয়ে মেরে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আজও কোনও রুচিশীল পাঠক বাংলা কবিতার শালীনতা ও সম্ভ্রম নিটুট রাখার জন্য ইচ্ছে করলে কবি বুদ্ধদেব হালদারের নামেও আদালতে মামলা করতে পারেন। কিন্তু মামলা করার আগে এই কবিকে আ-পা-মাথা পড়ুন, তাঁকে ভেতর থেকে অনুভব করুন। দু একটা আলগা শব্দ শুনেই তাঁকে দাগি ও ব্রাত্য করে দেওয়াটা রিফাইন্ড রিডারের কাজ নয়। পড়ুন আগে। চোখে যদি জল না আসে, হৃদয় যদি সন্তাপে সিক্ত না হয়ে ওঠে, তারপর না হয় এক বোতল ফলিডল কিংবা এক বস্তা নুন উপহার দেবেন এই শীতার্ত কবিকে :

“এই শীত আমার হাড় চিরে শাস্তি দিচ্ছে। ভীষণ ভয়ে কাঁপছি আমি। অন্যদের মতো তুমিও কি বলবে, আমি সাইকো?’

★★★★★★★★

কাব্যগ্রন্থ : সাইকো

কবি : বুদ্ধদেব হালদার

প্রকাশক : প্লাটফর্ম প্রকাশন

প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ২০২১

প্রচ্ছদ : সুপ্রসন্ন কুণ্ডু

বিনিময় : ১৫০ টাকা

85