Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি ৪৪

সাধন দাস

বদর বদর ৩

লালনের মূল পাণ্ডুলিপি থেকে অনুলিপি করা ভোলাই শা’র খাতা, রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত। ডঃ শক্তিনাথ ঝাঁ’র সম্পাদনা, আলোচনা, মূল অনুলিপি সহ ‘লালন ও তাঁর গান’ বইখানা রৌরব (মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ও প্রকাশনা) প্রকাশ করছে। বিজ্ঞাপন বেরিয়ে গেছে। ছাপা চলছে। বইখানা প্রকাশ করার দুরভিসন্ধিতে দেশ পত্রিকা শক্তিদাকে ফুঁসলিয়ে পাণ্ডুলিপিটি ছাপাখানা থেকে তুলিয়ে নিয়ে গেলো (রৌরবের এক সদস্য, আবুল বাশার তখন দেশ পত্রিকার কর্মী)। বিখ্যাত উকিল এপিসি, অরুণপ্রকাশ চ্যাটার্জী বললেন– এ কেসের হিস্টোরিক্যাল মেরিট আছে। আমি বিনি পয়সায় লড়বো।

দেশ পত্রিকার সাথে রৌরবের সরাসরি কোর্টকেস। এপিসি ফ্রি কেস লড়বেন, আমাদের ফ্রি সময়ে যেতে হবে। আমি আর গোপাল রৌরবের প্রতিনিধি, নিত্য রোববার সকাল হলেই সল্টলেকে এপিসির বাড়িতে হত্যে দিই। সেদিন এতো ভোরে পৌঁছে গেছি, এপিসির ঘুম ভাঙেনি। চায়ের দোকান খুঁজতে বের হলাম। ’৮৯ ’৯০ সাল হবে। সল্টলেক এলাকা তখন উঠন্তি মূলো। দশ পয়সার ফোড়ন কিনতে দু’ লাখের গাড়িতে বেহিসেবি তেল খরচ করে দোকান খুঁজতে হয়।

চায়ের দোকান মিললো এক হালফ্যাশন বাড়ির বসার ঘরে। চা এলো সুদৃশ্য ঢাউস কাপে। ফ্যানের নিচে চা পানের পর চা-ওয়ালা চাইলেন টোয়েন্টি রুপিস। আমরা ফুটপাথে দু’ টাকা ভাঁড়ে দুটোকে তিনটে খাওয়া আমআদমি। লাফিয়ে উঠলাম- এ্যাঁ!

গোপাল খেপে গেছে- ইয়ার্কি! কোন লণ্ডন থেকে চা আসে? কতো টাকা খর্চা হয়, কী হিসেবে কুড়ি টাকা? জানাতে হবে, নইলে ছাড়বো না।

দোকানদার আমাকে জামিন রেখে টাকা আনার প্রস্তাব দিলেন।

গোপাল খেপে আরো ব্যোম- টাকা আমাদের আছে। যেতে হলে থানায় যাবো।

লোক জমে যাচ্ছে। গোপাল জানিয়ে দিলো, এপিসি উকিলের বিনি পয়সার ক্লায়েন্ট আমরা। দোকানির বিরুদ্ধে কেস লড়া নস্যি।

এক ভদ্রলোক ঝামেলা মেটাতে, আমাদের হয়ে দাম দিয়ে দেবেন বললেন।

গোপাল দ্বিগুণ বেগে ঝাঁপিয়ে পড়লো- মশায়, আপনার দয়া আপনি পকেটে রাখুন। সহযোগিতা করতে চাইলে থানায় চলুন।

অবশেষে দোকানী বললে, টাকা সে নেবে না।

গোপাল বললে- মামদোবাজি! আমরা ভিখিরি নাকি? দু’কাপ চা-এ কতো খর্চা হয় হিসেব দিন। জেনারেল পাসেন্ট লাভ যোগ করে দিয়ে দিচ্ছি।

গোপাল বদর বদরের মুখে পড়ে দোকানির নাকানিচুবানি অবস্থা। জনতার সর্বসম্মতিক্রমে হিসেব কষতেই হলো। পার কাপে দু’ ভাঁড় চা। ভাঁড়ের হিসেবে দুই দুই চার, এস্টাব্লিশমেন্ট, উত্তম চা চিনি সার্ভিসের একটাকা, একুনে পাঁচ পাঁচ দশ দিয়ে, গোপাল ঘোষণা দিলো, কেউ পাঁচের বেশি কাপ দেবেন না। দু’টাকার খরিদ্দার আমরা। ছ’টাকা সংসার খরচ থেকে দিয়ে গেলাম।

এপিসিও গোপালকে চিনে ফেলেছেন, সমীহ করেন। উনি কেস সাজান, ডিকটেশান দেন, আমরা লিখি। পাশে বসে গোপাল বদর বদর করে। যুক্তি ফাঁদার কায়দা শেখায় ভারত বিখ্যাত উকিল এপিসি কে। আমার পর্যন্ত কান মাথা ঝালাপালা ধরে যায়। শেষে এপিসি গোপালকে পাঠিয়ে দিতেন ভিতর ঘরে ফাইল খুঁজতে। যেটা রাখা থাকতো তাঁর পায়ের কাছে।

1

Leave a Reply Cancel reply