Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি ৪৩

সাধন দাস

বদর বদর (২)

আমি আর গোপাল, গোপাল আর আমি তখন সবেধন দুই নীলমণি, বহরমপুর থেকে বেরুনো ‘রৌরব’ ত্রৈমাসিক লিটল ম্যাগাজিনের ক্যালকেশিয়ান (কোলকাতার) হাড় পাঁজরা। রক্ত মাংস ঘিলু সব বহরমপুরে। ধুকপুকুনির আঁচ বাঁচিয়ে রাখতে বুকের খাঁচা সর্বদা ফুলিয়ে রাখি।

বাংলাদেশের বদরুদ্দিন উমর সাহেব এসেছেন ভারতে। আন্তর্জাতিক মাপের পণ্ডিত। মার্ক্সবাদী দিকপাল। আছেন, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের কোনো তস্য গলির আত্মীয় বাড়িতে।

রৌরব তাঁর মুখোমুখি আলাপচারিতা ছাপবে। দু’কথা বলিয়ে কইয়ে নীলমণি গোপাল যাবে অভিযানে। বাংলাদেশ বনাম ভারতবর্ষ! ভারতবর্ষের মান-সম্মান বদর বদর গোপালের হাতে ছেড়ে দেওয়া রৌরবের কলজেই কুলোলো না। অগত্যা সংগে চললাম। কীর্তিমান গোপাল। এখানেও কীর্তি স্থাপন করেছে। দু’জনে মিলে কয়েকদিনে কয়েকশো জাতীয়, আন্তর্জাতিক স্তরের প্রশ্ন মকশো কষে খাড়া করলাম। গণতান্ত্রিক বিশ্বের তাবৎ নাকানি চুবানির কারণ আর সমাজতান্ত্রিক মহৎ সমাধান ইত্যাদি বিষয়ক পাঁচপাতার ইন্টারভিউয়াস্ত্র। বদর বদরকে পই পই করে হুমকি দিয়ে রাখলাম – প্রশ্নের বাইরে, খবর্দার তর্কে মুখ লাগাবিনে। লাগাবিতো, ভণ্ডুল করে দেবো।

জায়গা মতো দাঁড়ি, কমা, ফুলস্টপের ডাঙশ নিয়ে আমি পিছনে। গোঁয়ার-গুম গোপাল সাদা ফরাসে আয়েস করে বসে, মিষ্টি, সরবৎ, খিলিপান আর পিছন থেকে আমার বিশ পঁচিশেক খোঁচা সহযোগে ভদ্রলোকের মতো দেড় ঘন্টার দুনিয়া কাঁপানো ইন্টারভিউ টেপ করলো। নাচতে নাচতে দুই বন্ধু বিজয় কাহিনি পাঠিয়ে দিলাম বহরমপুরে।

পরদিন দু’খানা তোয়ালে জড়িয়ে টেপ-রেকর্ডার বোগলে কাঁপতে কাঁপতে গোপাল হাজির। যেনো দু’জনেরই জ্বর হয়েছে।

ভিজেবেড়াল মুখে বললো – কিছুই টেপ হয়নি, মাইরি।

সর্বনাশ! চাঁদুর (শুভ চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক) হিটলারি গোঁফওয়ালা স্তালিনিক মুখাকৃতির হুঙ্কারের মুখে গোপালের অন্তহীন বদর বদর কৈফিয়ৎ, কাঁচুমাচু মুখে কুলুপ এঁটে দিলাম। যাওয়া হলো এক সাউণ্ড ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। তিনি বিয়েবাড়িতে মাইক বাজান। তাঁর জয়ঢাক মার্কা শব্দবাক্সে টেপরেকর্ডার জুড়ে সাউণ্ড এনলার্জ করে করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আওয়াজ ফিসফিস শব্দে আবিষ্কার করা হলো, বিশ্ব কাঁপানো প্রশ্নপত্রের আধমরা কুঁই কুঁই উত্তরাবলী। উফ! সে যাত্রা রৌরবিয়ানদের সমাজতান্ত্রিক সীমান্তে কচুকাটা হওয়ার হাত থেকে গোপালের ননস্টপ বদর বদর আমাদের দু’জনকেই বাঁচিয়ে দিলো। বাঁচিয়ে দিলো বদরুদ্দিন উমর সাহেবের সম্মানকে। ইন্টারভিউ সর্বসম্মতিক্রমে ছাপাও হলো।

হু হু বাওয়া, গোপালকে এমনি এমনি রৌরবের সহসম্পাদক করা হয়নি। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই সবাই রাজি হয়ে হয়েছিলাম!

2

Leave a Reply Cancel reply