কুলিক রোববার গল্প : গামারমনির চাতাল

উপল মুখোপাধ্যায়

অনোয়ার টমেটো চারা তুলল। আমি বলেছিলাম,“ মাটি কই?” ও মাটি লাগিয়ে দিল। দশখানি চারা ভবিষ্যতে টমেটো ফলাবে। মাটির পাশে বিরাট চাতাল। তাতে জল পড়লে গড়িয়ে মাটিতে গিয়ে পড়ে কারণ চাতালের এক নির্দিষ্ট সীমানা আছে আর তারপরেই মাটি। মাইলের পর মাইল চাতাল পড়ে আছে। কে বানিয়েছিল? কেন বানিয়েছিল? কেন পড়ে আছে? পড়ে থাকবে কি? এই সব ভাবতে ভাবতে চাতালের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলাম গাড়িতে করে। এর আগে মাটির ওপর দিয়ে এসেছি, এবড়ো খেবড়ো মাটির ওপর দিয়ে অনেকটা এসে দেখছি সবজি খেত আছে তাতে পটল ফলে রয়েছে। বেগুন দেখিনি। লাল মাটির আলু কোথাও কোথাও হয়ত লুকিয়ে রেখেছে। আনোয়ার বলল,“ এটাকে বলে গামারমনির চাতাল।”
—— কে বলে?
—— সবাই।
—— সবাই?
—— সবাই বলে।
—— কেন বলে?
—— বলে আরকি?
—— এ রকম কত চাতাল আছে?
—— অনেক চাতাল আছে।
—— চাতালগুলো এত ভেতরে কেন?
—— ভেতরে নয় তো।
—— তবে আমাদের এতটা মাটির রাস্তা দিয়ে আসতে হল যে?
—— মাটির রাস্তা দিয়ে যত যাবেন খেতের কাছেই যাবেন। এখানে চাতাল তুলে খেত বানায়।
—— চাতাল তুলে?
—— হ্যাঁ। এক ফুট চাতাল তুলে খেত বানায়। সবজি ফলায়। কাঁঠাল গাছ লাগায়। সেই কাঁঠালের বাগানে হাতি আসে।
—— হাতি?
—— হ্যাঁ , হাতি এলে বেরতেই চায় না।
—— কোথা থেকে?
—— কাঁঠালের বাগান থেকে। তখন হাতি কাঁঠাল খায় আর কথা বলে। কথা বললে হাওয়া দেয়।
—— হাওয়া?
—— সেই হাওয়া গায়ে লাগলে বোঝা যাবে হাতি এসেছে।
গাড়ির ভেতর থেকে ও বাইরে থেকে প্রচুর হাওয়া দিচ্ছিল আর ইঞ্জিন কথা বলছিল গরগর ঘরঘর গরগর ঘরঘর গরগর ঘরঘর। ও কি বাঘেদের ভাষায় কথা বলছিল? মৌমাছিদের ভাষায় কি কথা বলতে পারে ইঞ্জিন? বিনোদকে জিজ্ঞেস করায় কিছু বলতেই পারল না। ও শুধু হাত তুলল, মানে যতখানি হাত তোলা সম্ভব স্টিয়ারিং থেকে শুধু ততখানিই তুলল আরকি। আমি কি ছবি তুলে তুলে রাখব? আমি কি কথা বলব? আমি কি এসব কথা ইউটিউবে জানাবো? আমি কি দেবাশিসের মতো নৃসিংহ ভাদুড়িকে বলব খান ই খানান রহিমকে নিয়ে কিছু বলতে? আমি কতখানি স্মার্ট হব? কতখানি চাকরি হব? কতখানি গাড়ি হব? কতখানি হাতিদের আর কতখানি টমেটোর চারাদের হব? এ কথা ভাবতে ভাবতে দেখি চাতালের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে গেছি। কে বলছে ,“ এটাই চাতালের মধ্যিখান।” আমি জিজ্ঞেস করলাম,“ মধ্যিখান?”
—— হ্যাঁ মধ্যিখান।
—— কী করে বুঝলে?
—— কারণ একটা মাপ আছে।
—— কিসের মাপ?
—— রানওয়ের।
—— রানওয়ের?
—— হ্যাঁ জানো না এগুলো রানওয়ে। সব রানওয়ে। সব বানানো । সব বানানো হয়েছিল।
—— কে বানিয়েছিল?
—— জানো না?
—— জানি।
—— তবে?
—— বৃটিশরা বানিয়েছিল। তখন ওরা মিত্রশক্তি হয়েছিল।
—— কার বিরুদ্ধে?
—— জানি।
—— তবে রানওয়েকে রানওয়ে হিসেবে দেখ।
—— দেখলে?
—— দেখলে এর শেষও দেখবে।
—— আর শুরু?
—— শুরুও দেখতে পাবে।
সে জন্য রানওয়ের মধ্যিখানে আমরা এসে দাঁড়িয়েছিলাম। আমরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম এটাই মধ্যিখান আর ঠিকই দাঁড়িয়েছিলাম আর দেখলাম দূর আর বহু দূরে এক পথ চলে গেছে রানওয়ের ওপর দিয়ে। এটা পথ তা বুঝতে পারা যাচ্ছে, এটা যে রানওয়ের বহু দূরত্ব জুড়ে পড়ে থাকা তাও বোঝা যাচ্ছে কারণ উদ্ভিদরা রানওয়ের ওপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে এসে ঠিক তাদের বিস্তার করে নিয়েছিল। এ সব দেখে বুঝলাম রানওয়ের রঙ যা প্রাচীন সিমেন্ট আর স্টোন চিপস আর প্রাচীনতর বালি মিশিয়ে বানানো বলে উদ্ভিদের ঝোপের থেকে আলাদা। এও বুঝলাম উদ্ভিদের রঙ সবুজ হয় কারণ রানওয়েদের রঙ ধূসর সিমেন্টের মতো, শক্তপোক্ত সে ঢালাই যা দিয়ে চুঁইয়ে জল পড়বে না ঠিক করেছে কারণ তার ওপর দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের বিমানেরা ওড়াওড়ি করত।
এই সময় আনোয়ার টমেটোর চারা দিয়েছিল দশটি, তাতে মাটি লাগানো ছিল না। সে মাটিও লাগিয়ে দেয়। যে বীজতলা থেকে ওটা একটা একটা করে তুলে দশখানা টমেটোর চারা হল সেটাও বেশ জোর দিয়ে দিয়ে রানওয়ে উপড়ে বানানো। আনোয়ার বলল,“ চাতাল মাটির ওপর এক ফুট দেড় ফুট জুড়ে থাকে। ওরা সে খুঁড়ে খুঁড়ে খেত বানিয়েছে।” আমি বললাম,“ মাটির আরো তলায় আরো রানওয়ে নেই তো?” আনোয়ার বলল,“ রানওয়ে?” আমি বললাম,“ যাকে চাতাল বলে।” শুনে সে যত্ন করে গাড়ির ডিকির ভেতর টমেটোর চারাগুলো ঢুকিয়ে দেয়।

103