Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি ৩৯

সাধন দাস

দাদু মদন

আশ্বিন মাস। মাঝ রাত। নিথর পাড়া। নিহর ঝরছে, টুপটাপ। টালির চাল ফুঁড়ে আলোর ছটা আর বিড়ির ধোঁয়া বেরুচ্ছে। মনে হচ্ছে শীতকাল। সবে গোঁফ, সবে কলেজ, মদন রাত জেগে ‘লাল বেনারসি’ উপন্যাসের কিস্তি লিখছে। দেওয়াল ম্যাগাজিন ‘মোনালিসায়’ ধারাবাহিক বেরুচ্ছে। সম্পাদক আমি। সঙ্গে অরুণ, জয়দেব। সরেজমিনে তদন্ত করতে এসেছি। পথের মাটি থেকে তুলে ঝুরঝুরে ধুলো বালি খাপরা মুঠো করে ছুঁড়ে মারলাম টালির চালে। বিড়ির ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেলো। এবার জয়দেব নাকি সুরে ডেকে উঠলো, – কী করছিস রে মদনা?

আলো নিভে গেলো। তারপরই অরুণ ওর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলো, ধপ ধপা ধপ ধপ। গোঁ গোঁ গোঙানি শুরু হয়ে গেছে। লাঠি ঢুকিয়ে দরজার হুড়কো খুলে ঢুকে পড়লাম। বিছানা বালিশ জড়িয়ে মদন গোল বাণ্ডিল হয়ে গেছে। বাণ্ডিলের ভিতর থেকে ভয়ার্ত কুঁই কুঁই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি – ভূত! ভূ…ত!

চারজনের দলে মদনই ছিলো ভীষণ ভীতু আর ভয়ংকর সাহসী। ওই বয়সে ধুতি পাঞ্জাবী পরে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার ছেলেপুলেরা পেছনে লাগে। মদন ডোন্টকেয়ার। হোক নবযৌবন, ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। ওর নাম হয়ে গেলো দাদুমদন। মুদি নেপালজ্যাঠা চোখে আতশ-কাচ লাগিয়ে নিয়মিত ‘লালা বেনারসি’ পড়ে। দোকানে খরিদ্দার এলে ঢোল পিটিয়ে বলে্ন- পদা হালদারের বড়ো ছেলে একটা জিনিয়াস। পাড়ার গৌরব।

মদন অমিত বিক্রমসাহসে ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ পড়ে ‘লাল বেনারসি’র ‘ফুলশয্যা’ পর্ব লিখলো। বাবার নাম করে মদন বিড়ি কিনতে গিয়েছিলো জ্যাঠার দোকানে। জ্যাঠা মালমশলা দেওয়ার লাঠিবাঁধা লম্বা হাতা নিয়ে আক্রমণ করলো প্রিয় লেখককে। পাড়ার মেয়ে খরিদ্দারদের সামনে কান টেনে লম্বা করে দিলো।

পদাকাকাকে নালিশ করলো- পদা, তোর এঁচোড়েপাকা ছেলে, বখে যাচ্ছে। বিয়ে দে দে। নইলে পস্তাবি।

নালিশ আমাদের দপ্তরেও জমা হয়েছে। আমরাও চড়াও হয়েছি, কোথায় তোর লেডি চ্যাটার্লির লাভার’? সিজ করে নিলাম।

বিদ্রোহী মদন কেঁদে ফেলে বললো- লেডি চ্যাটার্লির মতো ‘লাল বেনারসি’একদিন পৃথিবী বিখ্যাত হতো। তোরা হতে দিলিনে।

আমরাই ভিতুর ডিম। ওর ‘লাল বেনারসি’ প্রকাশ বন্ধ করে দিলাম।

অগত্যা মদন বেহালা বাদক হয়ে ভারত বিখ্যাত হতে চেয়েছিলো। বর্ষায় সারারাত মদনের বেহালা আর গুপি দত্তর ডোবায় ব্যাঙেদের গ্যাঁ-গোঁ বাজে। দুটো মিশে একাকার। বোঝা যায় না, কোনটা বেহালা, কোনটা ব্যাঙের ডাক। তারামামার মেয়ে দাদুমদনের নাম দিলো – ব্যাঙবাবাজী। কিশোরীমহলে দাদুমদন হয়ে গেলো, ব্যাঙবাবাজী। মদন আমাদের বন্ধু। আমাদেরও লজ্জার ব্যাপার। বেহালা বাজানো না ছাড়াতে পারলে আমাদের সম্মান বাঁচে না।

অগত্যা টর্চ জ্বেলে ব্যাঙ মারতে আসা বাগদীদের পাঠিয়ে দিলাম গুপি দত্তর ডোবায়। জানিয়ে দিলাম মদন ব্যাঙ ধরে বিক্রি করে। বেহালার বাজনাকে ব্যাঙের ডাক ভেবে ওরা ভুল করে মদনের ঘরে ঢুকে পড়লো। সেই অপমানে মদন বেহালা নিয়ে ওদের তাড়া করেছিলো। রাগে বেহালা ছুঁড়ে আমাদের সম্মান বাঁচিয়ে দিলো। বেহালাটা ভেঙে গেলো।

তবু মদন ছাড়ার পাত্র নয়। বাংলা বিখ্যাত হবেই। নিজের চেহারার সাথে মিল রেখে নায়ক তৈরি করিয়ে জয়দেবকে দিয়ে নাটক লেখালো। অভিনেতা হবে। পরিচালক অরুণ। মদনের বাবা মদ খেয়ে পরিচালককে টপকে রোজ রিহার্সেলে ঢুকে পড়ে। ছেলেকে ট্রেনিং দেয়- খোকা, অভিনয় হবে উত্তমকুমারের মতো।

ডায়ালগ ছিলো, ‘আমার বাবার সর্বাঙ্গ লালে লাল’।

মদনের বাবা জড়ানো গলায় পার্ট ভুলে গিয়ে শেখাতো – বাবা মদন, এই রকম পা তুলে হাত বাড়িয়ে বলতে হবে- মদের রক্তে বাবার চোখ লালে লাল।

বলে, নেশার ঘোরে উলটে পড়তো মেঝেতে। আমাদের রিহার্সেল ভণ্ডুল হয়ে যেতো। বাবার উপর অভিমানে মদন অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ালো।

1

Leave a Reply Cancel reply