কুলিক রোববার : বালকের হায়দ্রাবাদ : পর্ব ৪

শৌভিক রায়

লুম্বিনির গৌতম হুসেনের সঙ্গে

বানজারা হিলস থেকে কখন যে নেমে এসেছি বুঝতেই পারিনি। বুঝব কীভাবে? ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালে যারা এসে হাত পাতছে, তাদেরকেই খাবারের প্যাকেট বিলোচ্ছে সন্তোষ। ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে পড়াশোনা করা সন্তোষ এয়ার পোর্ট আর কর্পোরেট সেক্টরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন ক্যাব চালায়। মিতভাষী, অত্যন্ত ভদ্র, বছর বত্রিশের ছেলেটির আজ উপোষ। সোমবার ও শংকরজীর পুজো করে। সকাল সকাল ওর স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে তিরিশজনের মতো রান্না করে প্যাকেট বানিয়ে দেয়। সারাদিন ধরে গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে, নিরন্ন মানুষকে সন্তোষ সেই প্যাকেট বিলি করে। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার ফিল্মের প্রতি আমার দুর্বলতা জেনে সন্তোষ এতক্ষন ধরে আমাকে আল্লু অর্জুন, মহেশবাবু, বালাকৃষ্ণ প্রমুখের বাড়ি, পূজা হেগড়ে, অনুষ্কা শেঠি, রশ্মিকা মান্দানার এপার্টমেন্ট দেখিয়েছে। আল্লু অর্জুনের অফিস দেখানোর ফাঁকে ওঁর রেঞ্জ রোভার ৬৬৬ নম্বরের গাড়িটিও চিনিয়েছে। সব মিলে তাই সন্তোষে বুঁদ হয়েছিলাম। ঘোর কাটল নেকলেস রোডে এসে।

সামনেই পেল্লায় হুসেন সাগর। এশিয়া মহাদেশের, মনুষ্যসৃষ্ট, অন্যতম বৃহৎ এই লেক দেখে চোখ সত্যিই ট্যারা হয়ে গেল!

ইতিহাস বলছে যে, এই লেক তৈরি হয়েছিল ১৫৬২ সালে। অসুস্থ হয়েছিলেন ইব্রাহিম কুলী কুতুব শাহ। আরোগ্য লাভের পর হুসেন শাহ ওয়ালির প্রতি কৃতজ্ঞতা বশত এই লেকের নির্মাণ হয়। হৃদপিণ্ডের আকারের এই বিরাট জলাশয়টি ৫.৭ বর্গকিমি বিস্তৃত। সর্বোচ্চ গভীরতা ৩২ফিট। মুসির উপনদীতে সৃষ্ট এই লেক সে আমল থেকে শুরু করে ১৯৩০ অবধি কৃষি ও পানীয় জলের কাজে লাগত। হায়দ্রাবাদ আর সেকেন্দ্রাবাদ- যমজ দুই শহরের মাঝে হুসেন সাগর যেন বেশ বড় একটি হাইফেন। আজ লেককে ঘিরে পূর্বে রয়েছে ইন্দিরা গান্ধি পার্ক, উত্তরে সানজিভাইয়া পার্ক, দক্ষিণে লুম্বিনী পার্ক আর পশ্চিমে সবুজের সমারোহে রাজভবন রোড ও নেকলেস রোড। লেকের মাঝে জিব্রাল্টার রকে ১৯৯২ সালে স্থাপিত হয়েছে ১৬ মিটার উচ্চতার ও ৩৫০ টন ওজনের গৌতম বুদ্ধের সুবিশাল মনোলিথিক মূর্তি। এই লেকের তীরেই মুঘল আর গোলকুন্ডার মধ্যে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। লেককে ঘিরে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণ, তেলেগু মহাভারত স্রষ্টা নান্নায়া, তেলেগু মহাভারতের অন্যতম কবি টিকান্না, তেলেগু রামায়ণ রচয়িতা মোল্লা, কবি শ্রী শ্রী, শিক্ষাবিদ সি আর রেড্ডি, কাকতীয়া বংশের রানি রুদ্রাম্মা, সংগীতজ্ঞ ও অভিনেতা বল্লরী রাঘব প্রমুখ সহ আরও বহু ঐতিহাসিক চরিত্রের মূর্তিগুলিও দৃষ্টিনন্দন। লেকের বোটিং যেমন মনকাড়া, তেমনি লুম্বিনী পার্কে ড্যানসিং ফাউন্টেনটি অনবদ্য। খুব কাছেই নীতিশ রায়ের নকশায়, এ হুডার হাতে তৈরি এন টি আর বাগানটিও চমৎকার। রয়েছে বিড়লা মন্দির। খানিকটা উঁচুতে বলে সেখান থেকে লেকের শোভা মন কেড়ে নেয়। অন্যদিকে প্রাচীন কাট্টা মাইসাম্মা মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বিশ্বের বৃহত্তম হৃদপিণ্ডাকার লেকের তকমা পাওয়া হুসেন সাগর নিজের রাজ্যপাট নিয়ে আট থেকে আশি সবারই বড্ড প্রিয়।

সন্ধে নামল হুসেন সাগরে। ভারতের বিরাট পতাকা ধীরে ধীরে নেমে এল নিচে। জিব্রাল্টার রকে বুদ্ধ মূর্তিতে শুরু হল আলোর খেলা। একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠল লেকের চারধারে। দূরের বানজারা হিলস, জুবিলি হিলসও সেজে উঠল আলোর মালায়।

চা নিয়ে দেখি, প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘ডুয়ার্স টি’….কোইন্সিডেন্স? হয়ত বা!আর সেই সমাপতনেই আমি, রীনা আর সন্তোষ এক হয়ে গেলাম হুসেন সাগর তীরে, কুতুব শাহির হায়দ্রাবাদে, বৈচিত্রের ভারতের এক প্রান্তে ….

134