কুলিক রোববার : বালকের হায়দ্রাবাদ : পর্ব ৩

শৌভিক রায়

‘কাল খেল মে হাম হো না হো
গর্দিস মে সিতারে রহেঙ্গে সদা…’

নির্বাক রাতের ওই নক্ষত্ররা সেদিন সাক্ষী ছিল। আজও সঙ্গী তারাই… মাটির ভেতরে শুয়ে যাঁরা, তাঁরাও ছিলেন নক্ষত্র। ধরিত্রী বুকে! কিন্তু আকাশের নক্ষত্রদের মতো সিতারা হতে পারেন বলেই মিশে গেছেন ধুলোর সঙ্গে। আর আজও সেই ধুলোতে মিশে যাচ্ছে সিতারাদের স্নিগ্ধ আলো।

দাঁড়িয়ে আছি কুতুব শাহি সমাধিক্ষেত্রে। আগ্রার তাজমহল, ঔরঙ্গাবাদের বিবি কে মকবারা, দিল্লির হুমায়ূনের সমাধি সহ বেশ কিছু নামীদামী সমাধি দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আগেই। কিন্তু এখানে এসে এবার সত্যি বড্ড বিষন্ন লাগছে। নিজের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে? নাকি পরপর প্রিয়জনের চলে যাওয়ার অভিঘাত মনের গভীরে কোথাও প্রবল ক্ষত সৃষ্টি করেছে! জানিনা।

ফোন বেজে ওঠে। ওপারে রীনা, ‘কোথায় ঘুরছ একা একা? এসো তাড়াতাড়ি!`ওর মন বুঝি। চকিতে ফিরে আসি বর্তমানে। দেখি সামনে সুলতান আব্দুল্লার দুই প্রিয় হাকিম নিজামুদ্দিন আহমেদ গিলানি আর আব্দুল জব্বার গিলানির স্মৃতি সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ১৬৫১ সালে নির্মিত এই সৌধ দুটি কুতুব শাহি সমাধিতে স্থান পেলেও, মৃত ব্যক্তিরা কুতুব শাহি বংশের কেউ ছিলেন না। এই রাজকীয় সমাধিতে কুতুব শাহি বংশের সদস্য ছাড়া খুব সামান্য কয়েকজন স্থান পেয়েছেন।

একশ ছয় একর জমিতে কুতুব শাহি বংশের এই সমাধি ক্ষেত্রে রয়েছে ৪০টি সমাধি, ২৩টি মসজিদ, ৫টি সিঁড়ি বাঁধানো জলাশয়, একটি হামাম (স্নানক্ষেত্র), বাগান ইত্যাদি। ২০১৩ সালে আর্কিওলজিকাল বিভাগ, কুলী কুতুব শাহ আরবান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও আগা খান ট্রাস্ট মাইল সম্মিলিতভাবে এই বিরাট সমাধিক্ষেত্রের পুনরুদ্ধার ও সাজসজ্জার দায়িত্ব নিয়েছে। স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্টও এই কাজে তাদের সহযোগী। গোলকুন্ডা দুর্গ থেকে এর দূরত্ব মাত্র এক কিমি। একসময় দুর্গের ভেতরের ছিল ক্ষেত্রটি। সময়ের দাবি মেনে এখন দুর্গ আর সমাধি আলাদা হয়ে গেছে।

সমাধিক্ষেত্রের বেশিরভাগ সমাধিই কুতুব শাহি বংশের সদস্যরা নিজেদের জীবদ্দশায় তৈরী করেছিলেন। ইন্দো-পার্সিয়ান ও ইন্দো-ইসলামিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক কুতুব শাহিদের সমাধিতেও রয়েছে সেই প্রতিফলন। তবে সমাধি গাত্রের জ্যামিতিক নকশায় বিদারের বাহমনি বংশের সমাধির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় গ্রানাইটে নির্মিত সমাধিগুলির অলংকরণ অসাধারণ। সৌধের আর্চ বারান্দা দিয়ে মূল কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায় সমাধি। সমাধিতেও রয়েছে নানা ধরণের নকশা। কুতুব শাহি বংশের সদস্যদের সমাধিগুলিকে আলাদা করে চেনা যায়, কেননা সেগুলির কিছু অংশ সোনার পাতে মোড়ানো।

সুলতান কুলী কুতুব মুলকের সমাধি ৩০মিটার উঁচু। ১৫৪৩ সালে নির্মিত এই সমাধিতে তাঁকে বড়ে মালিক বলে সম্বোধন করা হয়েছে। রয়েছে ‘ছোটে মালিক’ সুভানের সমাধিও। সুভান ছিলেন সুলতান কুলীর নাতি। তিনিও শায়িত বাবা জামশেদের কাছেই। তাঁদের দুজনের সমাধিতে অন্যান্য সমাধির মতো কোনও লেখা চোখে পড়ে না। ইব্রাহিমের সমাধি অসামান্য হলেও ৬৫মিটার টেরেস নিয়ে মহম্মদের সমাধিটি বোধহয় এখানকার সবচেয়ে নজরকাড়া সমাধি। রয়েছেন হায়াৎ বক্শি বেগম (মা সাহেবা বলে পরিচিত হায়াৎ ছিলেন আব্দুল্লার মা)। এখানেই চির নিদ্রায় শুয়ে আছেন প্রখ্যাত সুফি সাধক হুসেন শা ওয়ালি।

রীনা আবার তাগাদা দেয়। বেরিয়ে আসি সমাধিক্ষেত্র থেকে…হালকা হাওয়ায় বিরাট গাছগুলি থেকে শীতের শুকনো পাতা ঝরে পড়ে। মনে পড়ে ঔরঙ্গজেবের কথা। ইলোরার কাছে শায়িত মুঘল সাম্রাজ্যের বলদর্পী সেই মানুষটির সমাধিতে কোনও আচ্ছাদন নেই। সমাধির ওপর রয়েছে বনতুলসির গাছ।

ঔরঙ্গজেব আসতেন কুতুব শাহি সমাধিতে, নামাজ পড়তে। নিজের সমাধিতে আচ্ছাদন না রাখবার সিদ্ধান্ত কি তিনি এই বিরাট বিরাট সৌধ দেখেই নিয়েছিলেন সেদিন? বুঝেছিলেন প্রকৃতির চাইতে বড় আশ্রয় আর নেই? কে জানে!

আসলে দুনিয়া ফনি হ্যায় ইসমে এক কাহানি হ্যায়...আর এই ‘কাহানি’ যে বুঝেছে সে-ই ফকির হয়েছে…

(ক্রমশ)

109