কুলিক রোববার কবিতা : আর্শিনগর

রা জা

ধরা যাক লোকটা আপনার মায়ের সঙ্গে শুতো। আপনি জানতেন, মনে মনে বহুবার ধারালো ছুরি গেঁথেছেন ওঁর বুকে। বাস্তবে সাহসে কুলোয়নি। পিতৃপরম্পরায় আপনি অসহ্যকর ভদ্র, ভীতু,লেজগুটোনো কুত্তার মতন পালিয়ে গেছেন বারবার। এতবছর পর সেই লোকটার পচে পচে মরার খবর পেয়ে খুশি হলেন খুব। খুনি হয়ে উঠতে না পারার জন্য আনন্দ হলো ভীষণ। আপনি স্যার,ঝানু খিলাড়ি। ঠিক বুঝে গেছেন কোন গুটি কোথায় চালতে হয়। কতটা মাতলামি আর কতখানি সভ্যতায় নিজেকে বদলে নিতে হয় পরিস্থিতি অনুসারে।

আপনি কিন্তু পরিষ্কার দেখতে পারছেন,বাবা অন্য দলে বিশ্বাসী ছিলেন বলে আপনার বাড়িতে চিঠি পর্যন্ত আসা বন্ধ করে দিয়েছিল যে প্রভাবশালী হোলটাইমার,ধর্মনিরপেক্ষ সেই নেতা এখন বয়সের ভার সামলে,কেমন বিচি চুলকোতে চুলকোতে ঢুকে পড়ছে লোকনাথ মন্দিরে। কিন্তু এই দৃশ্যের দিকে সামান্য থুতুও ছুঁড়ে দিচ্ছেন না। আপনি দেখতে পাচ্ছেন দুয়ারে দুয়ারে পৌছে যাচ্ছে ভিক্ষাপাত্র। ভ্রষ্ট ধর্মের পতাকা উড়িয়ে আপনার বৈধ চিৎকারকে দেশদ্রোহিতার তকমা দিচ্ছে একদল বিধর্মী।  আপনি আর প্রশ্ন ছুঁড়ছেন না, বিপ্লবে আস্থা হারিয়েছে আপনার। সুসজ্জিত এক জম্বি হয়ে শুধু ঘুরে বেরাচ্ছেন শহরের আলো আঁধারে।

ধরা যাক,আপনার বাবার মরদেহের পাশে বসে এক অনাত্মীয়র সঙ্গে ঝারি মারছে আপনার স্ত্রী।  কিংবা টিউশন ফেরত  সন্তান আপনার মুখোমুখি হতেই,তীব্র ঘৃণায় ধরেছে অনিশ্চয়তার বাইলেন। আপনি নির্লিপ্ত কোনো সাড় নেই শরীরে।  মাঝরাতে পুরুষাঙ্গ ঘেটে খুঁজে চলেছেন সুখী শুক্রাণুদের উৎস। নিতু বৌদির ঝুলে পড়া বুকের দিকে ঝোঁক আছে আপনার।কিন্তু নিজের প্রতি সামান্য ভালোবাসা বা প্রতিশোধের অনুভূতি বাকি নেই আর। 

হয়তোবা বইমেলা,আলুথালু শাড়ি পরে, সমস্ত খ্যাতির লোভ, ঈর্ষাকে তুচ্ছ করে আপনার সঙ্গে হাঁটছে এই সময়ের অন্যতম বলিষ্ঠ কবি।সে তার মাতৃস্নেহের হাত রাখছে  আপনার মাথায়। এই ছবির বিপরীতে আপনি দেখছেন বিশাল মঞ্চে গলায় উত্তরীয় পরে বসে আছে একদল আগাছা। অথচ আপনার এতটুকুও বমি পাচ্ছে না। ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছে না একদম। আপনি স্যার পাক্কা ধান্দাবাজ। বুঝে গেছেন উপরে উঠতে হলে ওপরওয়ালাদের চটাতে নেই। টিকে থাকতে হলে একটু আধটু পা ও ডান্ডা চাটারও দরকার। 

ধরা যেতে পারে, একটা আত্মহননের চেষ্টা রুখে দিয়ে আপনি ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টায় আছেন। এর মাঝে মাঝে নিখুঁত হিসেব করছেন,মাত্র ত্রিশটা ঘুমের ওষুধ আপনার মতো কদকাঠি মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। আরও অন্তত পাঁচ সাতটা বেশি দরকার। অথবা, একলা ঘরে বসে অনুভব করার চেষ্টা করছেন একটা সামান্য সস্তার রশি কত সহজেই আপনাকে মুক্তি দিতে পারে। আপনার মৃত্যু ভয় কেটে গেছে,জীবনের প্রতি সামান্য আকর্ষণ বেঁচে নেই আপনার। তবু, রোজ সকালে ফেরিওয়ালার পোশাকে বেরিয়ে পড়েন জীবিতদের ভন্ড ভিড়ে। আবালের মতো দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন প্রতিটি মুখের ছায়ায়। জীবিতরা মাস শেষে আপনার দিকে করুণার পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে যায়। আপনি সেই খুচরো কুড়োতে কুড়োতে ভাবলেশহীন কী যেন ভাবেন…

এমন এক ধোঁয়াশে যে আপনিটাকে আমি বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করছি আজকাল,শুনেছি সে সাতে পাঁচে রঙে রাজনীতিতে কোথাও নেই। আবার ডালে ভাতে বেশ্যার টিটকারিতে যথেষ্ট সাবলীল। আড়চোখে মেপে নিচ্ছে পাড়াতুতো বোনের রসায়ন। কখনও রিক্সাওয়ালাকে সপাট বাইঞ্চোদ বলার বীরত্ব দেখিয়ে সায়ার গীট খুলছে। অনায়াসে এড়িয়ে যাচ্ছে খিদে, ঘুম, বাবার মৃতদেহ ও মায়ের প্রেমিক। 

আপনাকে আমি কিছুটা হয়তো চিনি। কথা হয় রোজ। অথচ, দেখা হয়নি এখনও। 

     সম্ভবত দেখা হওয়ার সুযোগও হবে না কখনও

194