কুলিক রোববার :বালকের হায়দ্রাবাদ

শৌভিক রায়

(১ম পর্ব)

(ভাগমতীর কাছে)

শহরের কি জেন্ডার থাকে? ম্যাস্কুইলিন বা ফেমিনিন? ঠিক জানা নেই তা।
তবে এটা জানি যে, নবাব বা সম্রাট বা মহারাজার কীর্তিকে অক্ষয় করতে চেয়ে, তাঁর নামে কোনও স্থান বা শহরের নাম রাখা রীতিমত একটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই দেশে! দস্তুর ছিল এটাই।

তাই কবি যতই শহরকে কল্লোলিনী তিলোত্তমা ভাবুন, মহিলাদের নামে শহর বা স্থাননামের সেরকম উদাহরণ নেই বললেই চলে! এটাই জানতাম। ভুল ভাঙল এই শহরে এসে। একই সঙ্গে জানলাম, শাজাহান বাদেও এদেশে আর এক প্রবল প্রেমিক ছিলেন। কুতুব শাহি বংশের সেই রোমান্টিক প্রেমিকের সেদিনের ভাবনাটা ঠিক কতটা বৈপ্লবিক ছিল সেটা কিন্তু রীতিমত গবেষণার বিষয় হতে পারে!

বলছি কুলি কুতুব শাহের কথা। বানজারা হিলসের সেদিনের নর্তকী, ভাগমতীর প্রেমে পড়েছিলেন মানুষটি। শাহি প্রেম! হতেই পারত অন্যরকম। কিন্তু না, ভাগমতীকে যথার্থ সম্মান দিয়ে বিয়ে করলেন সুলতান। যতটুকু জেনেছি তাতে দেখতে পাচ্ছি যে, একটিবারও ভাগমতীর ধর্ম পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করেন নি তিনি, জোরজার করা তো অনেক দূরের ব্যাপার! উল্টে সবাইকে চমক দিয়ে, নিজের প্রেমের নিদর্শন হিসেবে ভাগমতীর নামে শহরের নাম দিয়ে দিলেন ভাগ্যনগর! কিন্তু ওই যে, মেয়েদের মন…. দেবা না জানন্তি… ভাগমতী নিজেই বেছে নিলেন স্বামীর ধর্ম। নিলেন নতুন নাম- হায়দার মহল। কালক্রমে সেই নাম প্রতিষ্ঠা পেল। ভাগ্যনগর ধীরে ধীরে হয়ে উঠল হায়দ্রাবাদ, ভারতের একমাত্র শহর যার নাম এলো এক নারীর নাম থেকে।

দাঁড়ান দাঁড়ান, তর্কে আসবার আগে আরও কিছু কথা বলে রাখি। চারদিকে ‘বাগ’ বা বাগান ছিল বলে শহরের নাম ভাগনগর (বাগনগর) সে তত্ব জানি। জানি নবাব পুত্র হায়দারের থেকেও নাম হতে পারে হায়দ্রাবাদ। ঐতিহাসিক পাণ্ডুরঙা রেড্ডির কথাও জানি যে, তিনি ভাগমতীর গল্পটি মানেনই না। নামকরণের এরকম আরও দুই-চারটে তত্ব আমিও বলে দিতে পারব। কিন্তু সব তর্কের শেষেও বেছে নেব হায়দার মহলকে। বেছে নেব কুলি কুতুব শাহ আর ভাগমতীর ভালবাসাকে। কেননা আমার কাছে হায়দ্রাবাদ মানে তুফানি প্রেমের এমন এক স্থান, যা মানে না ধর্মের ভীরু প্রাচীর। যেখানে হাতে হাত ধরে চলে ইতিহাস আর আধুনিকতা, যেখানে চারমিনারের পাশের মক্কা মসজিদের আজান ছড়িয়ে পড়ে হাইটেক সিটির হাইরাইজে, যেখানে রেঞ্জ রোভার ০৬৬৬ নিয়ে গভীর রাতে আল্লু অর্জুন শহর শাসন করেন, যেখানে হুসেন সাগরের জলে ভেসে আসে প্যারাডাইসের বিরিয়ানির গন্ধ, যেখানে সালার জং মিউজিয়ামে গভীর বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনও এক বালক…..
(ক্রমশ)

101