
সাধন দাস
সন্দীপকে
সন্দীপ, সন্দীপ মুখোপাধ্যায়, কলেজের বন্ধু। কবি। ওর ফার্স্ট ইয়ার, আমার সেকেণ্ড। কলেজ মাঠের গোল আড্ডায় পরিচয়। গোবরডাঙা থেকে হঠাৎ আমাদের বাড়ি বনগাঁ এসে হাজির। সুনীল গাঙ্গুলি আসছেন টাউন হলে। চল, কবিতা পড়বো। ফিরতে কতো দেরি হবে ঠিক নেই। মা দু’জনকে ডাল ভাত তরকারি মাছের ঝোল খাইয়ে দিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পছন্দ করি, কিন্তু মানুষ সুনীল আমায় ততো টানেন না। সন্দীপের টানে গেলাম। সন্দীপের খাতায় লিখে দিলেন, সাধন, ভালো থেকো।
সবার কবিতা শুনছেন। সন্দীপের কবিতা শুনে হঠাৎ বলে উঠলেন – বাঃ!
মানে সন্দীপ বড়ো কবি। গর্বে আমার বুক ভরে গেলো। সন্দীপ আমার মনের নরম ঘরে বাস নিলো।
প্রায় চল্লিশ বছর পর ফেসবুকের পাতায় সন্দীপকে খুঁজে পেলাম। ফেসবুকে আমার এলেবেলে লেখায় যখন পড়ুয়া অমিল, ওর মণিমুক্তোর মতো মন্তব্যগুলো ঝলসে উঠতে লাগলো। বুঝতে পারছিলাম, ও একজন বিরল বিদগ্ধ পণ্ডিত। এই পাণ্ডিত্য গত চল্লিশ বছরে ও অর্জন করেছে। এখনও কবিতা লেখে। বিরল শব্দের বিরল ব্যবহারে বিরল বাক্যবন্ধের কবি। সুধী বৌদ্ধিক মহলে ওর শ্রদ্ধা। পড়ুয়ার যতোখানি সাড়া আশা করেছিলো পায়নি। ফেসবুকে মাঝে মাঝেই ফুটে উঠতো সে কষ্টের কথা। আমাকেও জানাতো। আন্তরিকতায়, প্রিয়তায় এতোটুকু খাদ জমেনি। সময়ের দীর্ঘতা আমাদের বন্ধুত্ব আরো নিবিড় করেছে। ওর পাণ্ডিত্যের স্নিগ্ধতায় আমার মনের নরম ঘর ফের আলোময় হয়ে উঠলো। যত কমন বন্ধুর ফেসবুক ওয়ালে যাই, দেখি, ও সবার মনের ঘর আলো করে মতামত দেয়। ও একজন এথিক্যাল বন্ধুত্বের পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো। বললাম, একবার আয়। হোয়াটস এ্যাপে ভিডিও করে একদিন ওর লাইব্রেরি, ঘর, বাড়ি দেখালো। কলেজ বয়সে আড্ডা দেওয়ার সেই বারান্দা, যেখানে চেয়ার ছড়ানো থাকতো। আমরা বসতাম। অনর্গল গল্পের ফোয়ারা ছুটতো। চেয়ার তেমনি ছড়ানো আছে। সেই ঘর। ইচ্ছে করে ট্রেন ফেল করতাম। এক স্বপ্ন দু’জন দেখবো ঠিক করে রাত কাটানোর সেই খাট, বিছানা।
বললাম- করোনা যাক, একদিন তোর বাড়ি যাবো।
– চলে আয়। তুই কি বলে আসতিস? না আসবি?
ক’দিন ফেসবুকে ওর লাভ চিহ্ন পাচ্ছিনে। লেখা আলো করা মন্তব্য পাচ্ছিনে। মেসেঞ্জারে লিখলাম- খবর কী রে? সবাই ভালো আছিস তো? কোনো উত্তর নেই। একদিন হঠাৎ বাসু (বাসুদেব মালাকর, লেখক) জানালো সন্দীপ নেই। রাতের মেসেঞ্জারে কেউ একটা কাচের গাড়ির ছবি পাঠিয়েছেন। তার মধ্যে শুয়ে, চল্লিশ বছর পর ফিরে পাওয়া আমার সেই সন্দীপ, অপঠিত রয়ে যাওয়া বিরল শব্দের বিরল ব্যবহারে বিরল বাক্যবন্ধের কবি। কাচের বাক্সে চাপা তুই আছিস, বড়ো করোনাকালীন অবহেলায়। জীবনের অচিন অবহেলায়।
সন্দীপ, আমি জানি, তোর জীবন গৌরবের। মৃত্যু সে গৌরব ছিনিয়ে নিতে পারে না। তোর বন্ধুত্বে আমি অহংকারী। পঠন পাঠন দরিদ্র সমাজ, এই সংসার, এই সরকার না দিক, আমি তোকে গান স্যালুট দিচ্ছি, সন্দীপ, আমার স্মৃতিতে তুই অমর রহেগা, অমর রহেগা।
