কেন এই ব্যাঙ্ক ধর্মঘট ???

কৃশানু ভট্টাচার্য

আজ দুই দিন ব্যাপী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন। এই সুযোগে প্রাইভেট বা ফরেন ব্যাংক এর কোনো প্রান্তিক শাখা তে গিয়ে জিরো ব্যালেন্স বা সামান্য টাকা ডিপোজিট করে একাউন্ট খুলে KCC টা অ্যাপ্লাই করে নিন।

সাধারণত এই ব্যাংক ধর্মঘটের দিন ফেবু/হোয়াটসঅ্যাপ তে কিছু মেসেজ ঘুরে বেড়ায় যেগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাপার একবারেই বালখিল্য নিতান্তই কপি পেস্ট ,আর কিছু আবদার যা একেবারেই হয়তো ফেলে দেওয়া যায়না।
সেই আবদার গুলোর মোটামুটি মৌলিক বক্তব্য হলো
“Basarkare hala parasaba vala haba!!”
প্রশ্ন হলো এই সব ফেসবুক বা অন্য সোশ্যাল মিডিয়া তে এই ভালো পরিষেবার দাবী করেন কোন শ্রেণীর মানুষ? সিংহভাগ দাবিদার কিন্তু শহুরে নাগরিক! এই দাবী একেবারেই গ্রহণ যোগ্য নয় সেটা ও নয়। তবে তার দায় শুধু মাত্র কর্মী দের উপর চাপিয়ে দিয়ে যে দুটো মূল প্রশ্ন কে ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে সেটা হলো পরিকাঠামো এবং মানব সম্পদের অভাব। শাখা প্রতি কর্মী সংখ্যার বিচারে ও প্রাইভেট ব্যাংক আমাদের থেকে অনেক খানি এগিয়ে। যদিও সেটা গ্রাহক দের না জানার কথা, তাদের কোনো দায় নেই জানবার।পরিষেবা পাওয়া গ্রাহক দের অধিকার। গ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বহু শাখা আছে যেখানে দুজন মাত্রই কর্মী।সাধারনত তাদের ইমিউনিটি সিস্টেম খুব ভালো হতে হয় কারণ অসুস্থ হলেও ছুটি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না! আর ছুটি নিলে আরেক গেরো শহরের শাখার থেকে কাউকে ডেপুটেশন এ পাঠাতে হবে! একে মা মনসা তার উপর ধুনোর গন্ধ!
বহুদিন প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করে দেখেছি গ্রামের মানুষ রেগে যায়,ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে খিস্তি খেউড় পর্যন্ত করে, কিন্তু পরের দিন ওই গ্রামের একমাত্র শাখা তে সকাল সকাল চলে আসে কারণ জানে এখানেই ওই রেগা র টাকা,চাষের লোন ,স্বনির্ভর গোষ্ঠীর লোন নিতে আসতে হবে। সে নিজেকে না হলেও বাড়ীর কেউ পাড়ার কেউ!! ব্যাংকের ম্যানেজার ও জানে গ্রাহক এরাই,ওনার ব্রাঞ্চে কোনো ডেরিভেটিভ মার্কেট বা ট্রেড ফাইন্যান্স এর গ্রাহক আসবে না। কাল হয়তো ম্যানেজার কে ওনার পাড়াতেই যেতে হবে কোনো লোনের রিকভারি করতে!সেই মানুষ টা কে সঙ্গে করেই যেতে হবে হয়তো ! আবার সেই মানুষ টা ই এসে হয়তো পারিবারিক কোনো সমস্যার কথা ও ম্যানেজার এর সঙ্গে আলোচনা করে নেবে। এই বিশ্বাস শুধু ম্যানেজার এর উপর নয় তার প্রতিষ্ঠানের উপর ও বটে।সে তার পাশের লোকটা কে নির্দ্বিধায় বলতে পারে অন্য কোথাও টাকা রাখিস না সরকারী ব্যাংকে রাখ। আমি নিজে বহুবার বলেছি আমরা সরকারী না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।কিন্তু প্রান্তিক গ্রামের এই বুড়ো গুলো বিশ্বাস করে সরকার পড়ে যেতে পারে সে কংগ্রেস হোক বিজেপি হোক কিন্তু এই সরকারী ব্যাংক পড়বে না।
এই পারস্পরিক প্রয়োজনীয়তা ,বিশ্বাস একটা বাস্তুতন্ত্রের সৃষ্টি করেছে যার ভরকেন্দ্র জুড়ে আছে এই ব্যাংক – গ্রাহক সম্পর্ক। এ তৈরী করতে বহু দিন সময় লেগেছে। এটাই ক্লাস ব্যাংকিং এর সঙ্গে মাস ব্যাংকিং এর পার্থক্য। ব্যাংকে এই শ্রেণী বৈষম্য দুর করতে বহু দিন লড়তে হয়েছে।

এখন একটা সতেরো বা আঠেরো বছরের ছেলে দুম করে গুগল পে করে দিচ্ছে।নিমেষে টাকা চলে যাচ্ছে। সবাই আবার পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে এই নতুন ব্যাবস্থা কি দারুন।
কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন! সবার তো একটা একাউন্ট লাগবে রে বাবা!!
আপনি যদি কংগ্রেস সমর্থক হয়ে থাকেন তাহলে বলবেন “No frill account” আর বিজেপি সমর্থক হয়ে থাকেন “প্রধানমন্ত্রী জনধন ” বলবেন!
দুটোই সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য!
ব্যাংকের পরিষেবা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই সাম্যবাদী ব্যাবস্থা তৈরী করার প্রথম পদক্ষেপ ফেলাটাই বা কি খুব সহজ ছিলো?

যেটা দিয়ে আলোচনা টা শুরু হয়েছিল…চাষের লোন,প্রান্তিক চাষী দের লোন,ক্ষুদ্র শিল্পের লোন,স্বনির্ভর গোষ্ঠীর লোন ইত্যাদি।
এই লোন গুলো এবং এডুকেশন লোন,হাউস বিল্ডিং লোন(একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত) ব্যাংকিং এ Priority Sector Lending বলে পরিচিত। Annual Net Bank Credit( মোটা দাগে ব্যাংকের মোট বার্ষিক লোন) এর ৪০(চল্লিশ) শতাংশ লোন একটা ব্যাংক কে এই সেক্টর গুলো তে বণ্টন করতে হয়!
এই বিষয় টা আমদের মতো একটা দেশে প্রতিটা ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়ে করা উচিত নইলে এই ব্যবস্থার মূল প্রয়োজনীয়তা টা ই চরিতার্থ হবেনা । স্বভাবতই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলোর প্রায় প্রতিটিই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে কিছুক্ষেত্রে তার চাইতে খানেক বেশীই হয়তো বণ্টন করে।উল্টো দিকে অন্যছবি প্রাইভেট আর বিদেশী ব্যাংকের ক্ষেত্রে আর তার জন্য ব্যাবস্থা হলো.…..PSLC (Priority Sector Lending Certificate) এর মাধ্যমে প্রাইভেট এবং বিদেশী ব্যাংকগুলো এই সেক্টর এ নিজেদের ঘাটতির পরিমাণ এর সমমানের সার্টিফিকেট সরকারী ব্যাংকের থেকে কিনে নিচ্ছে যার দাম মার্কেট এ ওঠানামা করে! মানে টা দাড়ালো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিজের শাখা খুলে নিজের মানব সম্পদ ব্যবহার করে গ্রামে লোন দেবে গ্রামীণ অর্থনীতি কে চাঙ্গা করবে আর সেসময় প্রাইভেট আর বিদেশী ব্যাংক বড় শহরে ব্র্যাঞ্চ খুলে সেখানে নিজেদের সব স্টাফেদের কেন্দ্রীভূত করে মুনাফা কামানোর ব্যাবসা তেই কনসেন্ট্রেশন করবে শুধু !

পুঁজির চরিত্র কেন্দ্রীভূত হওয়া! রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই বেসরকারিকরণ বিল সেটাকেই আরো উৎসাহিত করবে। ধনী এবং গরীবের ফারাক আরো আরো স্পষ্ট হবে।
এর বিরুদ্ধেই আমাদের স্ট্রাইক।
দুদিনের পারিশ্রমিক কাটিয়ে এই স্ট্রাইক।

(লেখক নামএকজন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মী)

240