Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: স্মৃতি ৩৪

সাধন দাস

কমলের বিয়ে 

বসন্তের অভ্যেস ফুল ফোটানো। কমল ভ্রমরের জাত। অভ্যেস ফুলে বসা। হিঁদু মোছলমান জ্ঞান নেই। দুর্গাপুর থেকে বহরমপুরে মেসোমশায় (কমলের বাবা, ওস্তাদ দাউদ খাঁ)এর কাছে গান শিখতে আসে ছবি। ফিরতে না পারলে রাতে কমলদের বাড়িতেই থেকে যায়। সেই চান্সে কমল পিরিতির মধুতে গেঁথে ফেলেলো ছবিকে। ছবিও ফুলের সৌরভ নিশ্চয় ছড়িয়েছে। কমলদের বাড়ি ফুলদানি হতে পারে, সমাজ তো ভ্রমর ভ্রমরার ফুলবাগান নয়। যমকাঁটা হয়ে উঠলো ছবির বাড়ি।   

রৌরবে বসন্ত একা আসে না। অকালে মিটিং ডাকা হলো। কম্‌লার বাড়ি মুখে কুলুপ এঁটেছে। মিটিংয়ে বলা হলো- কিবা হাড়ি কিবা ডোম যার সাথে যার মজে মন। কমলা ছবি পালা। চাঁদু সঙ্গে যাক। 

রৌরবের হাতে পড়ে বসন্ত লুট। ওরা তিনজন হাওয়া। ছবির বাড়ি থানায় ডায়রি করলো। পুলিশ ঝড়ের বেগে ধাওয়া করলো হাওয়ার পিছনে। শহরে কালবৈশাখী শুরু হলো। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাঁধে আরকি! কাণাঘুঁষো শোনাগেলো, ‘অন্ধকারে চাঁদুর বাড়ি গ্যাস ঢুকিয়ে চাঁদুর বোন চম্পাকে পাল্টা লুট করা হবে।’ খবর পেয়ে বাবুয়া- চম্পা, মাসিমাকে তুলে নিয়ে গেলো নিরাপদ জায়গায়।  রৌরবিয়ানরা আণ্ডারগ্রাউণ্ডে। 

পালানোর পরে আমার আর অরুণের সাথে চাঁদুর দেখা হলো কোলকাতা পুস্তকমেলার মাঠে। সেবার টেবিলের বদলে কান্তি(ময় ভট্টাচার্য)দা-দের সাথে শেয়ারে রৌরবের স্টল নেওয়া হয়েছে। চাঁদু স্টল সাজাচ্ছিলো। হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো- ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। দিয়েছেন জেনারেল জে এন চৌধুরী। পাশপোর্ট ভিসা হয়ে গেছে। এতক্ষণ ভ্রমর ভ্রমরীর গুনগুন ফুড়ুৎ। সোজা বাংলাদেশ। দু হাত তুলে একপাক নেচে নিলো- সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসা-রে…   

আমরাও নাচতে নাচতে বাথরুম গেলাম। ফিরে শুনি, চাঁদুকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে, খোঁজ খোঁজ কোথায়, হ্যাঁ, হেস্টিংস থানায়।   

থাকলো পড়ে পুস্তকমেলা। পার্কস্ট্রিটে শান্তি (লাহিড়ি, কবি)দার অফিস। আমি আর অরুণ ছুটলাম। আমাদের সংগে নিয়ে শান্তিদা ছুটলো হেস্টিংস। শান্তিদার চোখে চাঁদু তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির হিরো। আর ট্যাক্সির জানালায় শান্তিদা একটু বেশি গম্ভীর অনেকটা হিরোর দাদা। আমরা ভয়ে দুরুদুরু, গর্বে উড়ুউড়ু। ভ্রমরের হুল আর বসন্তের হাওয়াই বুকে শৈত্যপ্রবাহ। অন্ধকার লকআপে, কনকনে ঠান্ডায় বুকে হাঁটু জড়িয়ে, জুবুথুবু চাঁদু বসে আছে। চোখদুটো ব্লেডের মতো তীক্ষ্ণ, কান দুটো শেয়ালের মতো। সর্বনাশ! এ কী চেহারা হয়েছে! কয়েক ঘন্টায় ছ’ফুট লম্বা, উঁচু মাথা, লিডারকে পুলিশ ছিঁচকে চোর বানিয়ে দিয়েছে! কান্না পাচ্ছিলো। শান্তিদা বললেন– ধূস! ও চাঁদু নয়। একটা শেয়াল মানুষ। চাঁদুকে ওরা  বহরমপুর থানায় চালান করেছে। চল্‌ বহরমপুর।  

48

Leave a Reply Cancel reply