Categories
প্রতিবেদন

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সংবাদপত্রের গুরুত্ব

আভা সরকার মন্ডল


মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে হাতে লেখা সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল এবং তাতে শুধু রাজনৈতিক বিষয়ই স্থান পেতো।
সংবাদপত্রের মুদ্রিত বাংলা সংস্করণ মানুষের হাতে এসেছে ১৮১৮ সালে। সেই থেকে সংবাদপত্র বা খবরের কাগজ ছাড়া আমাদের এক দিনও চলে না।
ভালো হোক বা মন্দ, সমৃদ্ধ কোন ঘটনা হোক বা দুর্ঘটনা,আজকে যা ঘটে, কাল তাই ইতিহাস ।
আমরা অভ্যাস মতো নিউজ চ্যানেল বা সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন অনেক খবর শুনি বা পড়ি । খবরগুলো প্রতিনিয়তই ইতিহাসের পাতায় চলে যেতে থাকে। যে ঘটনাগুলো মানুষের মনে বেশি দাগ কাটে, সেগুলোই ইতিহাসের শক্ত ঘাঁটি । রাজনীতির ডামাডোলে অনেক সময় সাংবাদিকরাও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের অক্ষম হন ।এমন অনেক খবর থাকে যা আপামর জনসাধারণের চোখ কান পর্যন্ত পৌঁছায় না ।অথচ তেমন কিছু খবরই হয়তবা ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিতে পারত অনয়াসেই ।খবরকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে জায়গা করে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম।

ভালো বা মন্দ ঘটনাটির সত্য সংস্করণ দেশবাসীর জানার অধিকার আছে । সংবাদ বিকৃত না করে পরিবেশন করা, সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রগুলোর নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এটা দেশ সেবারই একটি অংশ।কারণ তাদের হাত ধরেই তৈরি হয় ইতিহাস । মানুষ সবসময়ই সঠিক ইতিহাস জানার জন্যই উৎসুক থাকে।
কোন একটি ঘটনার ধারাবাহিক প্রকাশ, সময়ের দলিল হয়ে, ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সংরক্ষিত থাকে সংবাদপত্রের পাতায়। সেই অতীত হওয়া সময়ে মানুষের মনে সামাজিক,ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ‌ প্রভাব এবং তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও আমরা একটা ধারণা পাই সংবাদপত্র থেকেই। এক কথায় সামাজিক,রাজনৈতিক বা যে কোন বিষয়ে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের যে ধারাবাহিকতা তার সাক্ষ্য বহন করে সংবাদপত্র।

আমরা যে এত খবর পড়ি প্রতিদিন ,তার সবটাই কি ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় ? —পায় না। কিছু আনন্দদায়ক খবর, কিছু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কাহিনী, হৃদয় বিদারক কিছু ঘটনা কিংবা জনসাধারণের চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত বা ভয়ংকর কিছু ঘটনা যা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও উৎসাহী ও নির্ভীক চিত্তের সাংবাদিকরা টেনে বের করে আনেন বিপদসংকুল পথ থেকে, সেগুলো ই একদিন সংবাদপত্রকে মাধ্যম করে স্থান করে নেয় ইতিহাসে ।

আজকের করোনা মহামারীকে উদাহরণ হিসেবে ধরলেই দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং বেঁচে থাকার যুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক খবরই উঠে এসেছে সংবাদপত্রের পাতায় । পরিযায়ীদের মৃত্যু এবং সে সম্পর্কিত মর্মান্তিক কিছু ছবি আমাদের মনকে নাড়া দিয়ে গেছে গভীর ভাবে। এবং নিশ্চিত ভাবেই এটাও সত্যি যে, যতটা খবর আমরা দেখেছি বা পড়েছি তার থেকে হাজার গুণ বেশি খবর আমাদের চোখ কানের আড়ালেই থেকে গেছে । সেই খবর গুলোতে মানুষের বেঁচে থাকার যুদ্ধ, মৃত্যুকে জয় করার যুদ্ধ, এবং বেঁচে থেকেও হেরে যাওয়ার কত কাহিনী ,আমাদের অজানাই থেকে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই খবরগুলো ইতিহাসে স্থান পাবে না। এর কিছুটা অবশ্য আমরা দেখতে পাই নানান ধরনের পত্র পত্রিকা ও সংবাদপত্রের সাহিত্যের পাতায় কবিদের লেখা গল্প ,কবিতার মধ্যে।তবে সেখানেও ধরা থাকে
খন্ড চিত্র। আসলে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বেশিরভাগটাই মানুষের আজানা। কিছুটা ঘটনা দেখে,এবং বাকিটা অনুমান করে নিয়েই অপারগ মানুষকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

দৈনিক প্রকাশিত খবর গুলোই, সংবাদপত্রে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সংরক্ষিত হয়। আজকের এই ডিজিটাল যুগে, উপাদান সংরক্ষণের কাজটি আরও সহজ হয়ে উঠেছে, সংবাদপত্রগুলো অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করার ফলে।আমরা সন তারিখ এবং সংবাদপত্রের নাম লিখেই, গুগলের পাতায় ইচ্ছে মতো ঘোরাঘুরি করতে পারি। ছুঁয়ে আসতে পারি সেই সমস্ত ইতিহাস, যা কিনা কিছুদিন পূর্বেও শুধুমাত্র খবর ছিল ।
কিছু সংবাদপত্রও ইতিহাস ঝালিয়ে নিতে— বহু বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া বিখ্যাত দিনের, বিখ্যাত ঘটনায় তাদের পরিবেশিত সংবাদ এবং ছবি নতুন করে ছাপিয়ে, তাদের দক্ষতা তুলে ধরেন জনসাধারণের সম্মুখে । মানুষ ও অবাক হয় কয়েক যুগ পূর্বে ঘটে যাওয়া সেই সমস্ত খবরের(যা কিনা আজ ইতিহাস) ঝলক দেখে।

খবরের কাগজ গুলোর প্রতি পাতায় ছড়ানো ছিটানো থাকে কত হাহাকার, কত মৃত্যু , কত আনন্দ,সুখ-দুঃখের চিত্র । এর কোনো কোনোটা সার্বজনীনভাবে ইতিহাস।আবার ভেতরের পাতায় এক কোণে ছাপা হওয়া কোন কোন খবর একান্তই ব্যক্তিগত ইতিহাস ,যা সাধারন মানুষ একদিন ভুলে যায় । শুধু যারা সেই ঘটনার সাথে জড়িত, তারাই তা মনে রাখে আজীবন। সেই পরিবার গুলোর কয়েক প্রজন্মের মুখে মুখে ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে সেই আনন্দ বা দুঃখের স্মৃতি। হতে পারে সেটা স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জড়িত কোন ঘটনা কিংবা সমাজে পিছিয়ে থাকা তথাকথিত নিম্নশ্রেণির, নিষ্পেষিত হওয়ার কোন অভিজ্ঞতা, অথবা নির্ভয়ার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো নির্মম, নৃশংস কোন ঘটনা, যা ইতিহাস হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলোর মতো প্রচারের আলো পায়নি।

প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া হাজার হাজার ঘটনা-দুর্ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়, যা কিনা সঠিক প্রচার পেলে এবং সংবাদপত্রের পাতায় উঠে এলে ইতিহাসের উপাদান হয়ে উঠতে পারতো কিন্তু সঙ্গত কারণেই এত ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় তুলে আনা সম্ভব নয় তবে যেটুকু উঠে আসে সেখানেই সংরক্ষিত থেকে যায় ইতিহাসের উপাদান, ভবিষ্যৎ সময়
সেখানেই খুঁজে পায় ইতিহাসের গোড়াপত্তনের চিহ্ন ।


70

Leave a Reply