Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : মুক্তগদ্য : বয়ঃসন্ধির সিনেস্কেপ

অনির্বাণ বসু

হিন্দমোটর স্টেশন থেকে হাওড়াগামী যে-কোনও একটা ট্রেন ধরলেই টুক করে নেমে পড়া যায় লিলুয়ায়। বিনা টিকিটে। পিচবোর্ডের টিকিট জমানোর নেশা বয়ঃসন্ধি দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চোখ তুলে তাকালে চন্দন, আর পশ্চিমের রাস্তা ধরে খানিক এগিয়ে ডান দিক নিলেই বাঁ হাতে লিলুয়া সিনেমা। ট্রেন চলে গেলে পর উঠে যায় রেলগেট—লেভেল ক্রসিং। তারপর মানুষজনের গুঁতো আর সাইকেলের চাকার আলতো ছোঁয়ায় একেবারে লিলুয়া সিনেমার সামনে। সিনেমাহলের মাথায় বড়ো পোস্টারে শাহরুখ খান আর মনীষা কৈরালা, এক কোণে টোল-পড়া গালের ক্যাডবেরিজ পার্ক—প্রীতি জিন্টা : ‘দিল সে’। শাহরুখ খানের পাগল ফ্যান ছেলেটি, ফলত বুধ এবং বৃহস্পতি—পরপর দু’ দিন বাড়িতে মিথ্যা বলে ওই এক সিনেমা। সিনেমাকে ‘ফিল্‌ম্‌’ বলার কেতাদুরস্ত ফিনিশিং তখনও বহু দূরে; ঘরের সান্ধ্য আড্ডায় সদ্য আসা কেব্‌ল চ্যানেলে ‘বই’-এর রমরমা। চলন্ত ট্রেনের উপর শাহরুখের নাচ দেখবে বলে শুক্রবার, সে আবারও, লিলুয়া সিনেমায়। সিনেমাহল সম্পর্কে তখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ছেলেটি জানত না, প্রতি শুক্রবারে আগের সিনেমা বদলে যায়, এক সপ্তাহের জন্য নতুন সিনেমা আসে।

মামাতো দাদার সঙ্গে সিনেমাহলের সামনে এসে সে দেখেছিল, সবার উপরে-থাকা পোস্টারে কোথাও শাহরুখ খান নেই, তার বদলে ধর্মেন্দ্র আর শত্রুঘ্ন-র—হিন্দি উচ্চারণে ‘শত্রুঘণ’—বয়স্ক মুখ। ওই দিনের পর আর কখনওই নাম না-শোনা একটা সিনেমা—‘জুমোস্তান’। শাহরুখকে দেখতে এসে কিনা শেষমেশ ধর্মেন্দ্র আর শত্রুঘ্নকে দেখবে পয়সা দিয়ে! নৈব নৈব চ! অতএব, চন্দন। বাইরে থেকে দেখে চন্দনকে সিনেমাহল বলে ঠাহর হয় না; অনেকটা উত্তরপাড়ার গৌরী সিনেমার মতো। চন্দনের বাইরের দেওয়ালে তখন ভূতের ছবি : শুকিয়ে-যাওয়া মাটির ফাটা দাগওয়ালা ভূতের মাথা। ইংরেজি আর হিন্দিতে লেখা সিনেমার নাম। ‘লাশ’। পাশে লেখা, ‘এ’। তখনও সে ‘এ’ আর ‘ইউ’ বলতে ইংরেজি অ্যালফাবেটের পাশাপাশি ভাওয়েল বোঝে; অ্যাডাল্ট বোঝে না। ভূতের সিনেমা দেখে দশ টাকার দুটো টিকিট কেটে সিনেমাহলে ঢুকে পড়েছিল দুই ভাই। তারপর সিনেমা শুরু হওয়ার কিছু পর তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল, জীবনে প্রথমবারের জন্য, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর উদোম ভরাট স্তন এবং তার উপর পুরুষের হাতের উন্মাদ ঘুরে বেড়ানো, আর হল জুড়ে তুমুল সিটি, সমানতালে খিস্তি।

সিনেমাহলে গিয়ে ছেলেটির দেখা প্রথম সিনেমা ছিল ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’। সে এক ভাইফোঁটা ছিল! হৈমন্তী সেই রাতে ছাদ জুড়ে আড্ডা ছিল, গানের লড়াই ছিল। হাবড়ার রূপকথা সিনেমাহল খুলে দিয়েছিল সিনেমা দেখার নতুন উপায়। একে-একে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছিল ভাড়া করে-আনা রঙিন টিভি, ভিডিয়ো ক্যাসেট আর ভিসিআর। সরষেখেতের মাঝে ম্যান্ডোলিনের আবহ। তখন থেকেই ওই পাগলামো, ওই খ্যাপামোর ফ্যান ছেলেটি। ধীরে-ধীরে বুঝে ফেলেছিল সে, পাগলামি ছাড়া প্রেম হয় না। তারপর থেকে শাহরুখ খান মাঝে-মধ্যেই দেখা দিতে থাকে তাকে : রবিবার সকালে ‘রঙ্গোলি’, রাতে ‘সুপারহিট মুকাবিলা’, বুধবার ‘চিত্রহার’। রেডিয়োতে শোনা যেত গান, তা বাদে শুধুমাত্র ওই অনুষ্ঠানগুলোতেই শোনার পাশাপাশি দেখাও যেত শাহরুখকে : ‘লভ্‌ লভ্‌ লভ্‌ লভেরিয়া হুয়া’, ‘বড়ি মুশকিল হ্যায়’, ‘ইস্‌ প্যায়ার সে মেরি তরফ না দেখো’, ‘দিল হ্যায় মেরা দিওয়ানা’—আরও কত! এমন-কি, টেপফ্রক পরে সমুদ্রের ঢেউ ভাঙতে-থাকা ঊর্মিলা মাতণ্ডকর : ‘তন্‌হা তন্‌হা ইহাঁ পে জিনা, ইয়ে কোই বাত হ্যায়’! ‘চিত্রহার’ তাকে দেখিয়েছিল অদ্ভুতদর্শন এক মোটরবাইক আর তার উপর চড়ে গুরুর নাচ : ‘কোই না কোই চাহিয়ে প্যায়ার করনেওয়ালা’। আর-পাঁচটা সুদর্শন নায়কের মতো দেখতে নয় এমন একটা মানুষ, অথচ কী মারাত্মক উন্মাদনা! এর অনেক পরে সে শুনেছিল, ভারতে সেক্স আর শাহরুখ খান—প্রশ্নাতীতভাবে—বিক্রি হয়।

‘দিল সে’ দিয়ে বাড়িতে মিথ্যা বলার যে-সূচনা হয়েছিল, সেই পথ বেয়েই দুই ভাই—মামাতো-পিসতুতো—দেখে ফেলেছিল ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’। ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। তারপর স্টেশন রোডের দোকান—রংমহল—থেকে বার তিনেকের চেষ্টায় কিনে ফেলেছিল গলার সেই হারখানা, সিনেমায় যেটা শাহরুখ পরেছিল। চল্লিশ টাকা দামের সেই হার পরে বাজেয়াপ্ত করে নেয় হস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মহারাজ; সে ‘খণ্ডন ভব-বন্ধন’ বোঝে, ‘তুম পাশ আয়ে’ কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে না তার।

ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো কিন্তু চলতেই থাকে। দিওয়ালি মানেই তখন শাহরুখ খান। বিপুল অংকের দেনা থেকে অমিতাভ বচ্চনকে সবে উদ্ধার করেছে সোনি-র জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো : ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’। ভদ্রলোকও ততদিনে বুঝেছেন, বয়স বেড়ে গেছে; মাঝের ‘লাল বাদশা’, ‘সূর্যবংশম্‌’, ‘মৃত্যুদাতা’, ‘বড়ে মিঞা ছোটে মিঞা’-র পালাও ফুরোল অবশেষে, যখন কালীপুজোর পরদিন, দিওয়ালিতে, মুক্তি পেল ‘মহব্বতে’। জীবনে প্রথম কলকাতায় এসে সিনেমা দেখল ছেলেটি। মেট্রোয় এত হাততালি আর সিটি ছিল সেদিন, শাহরুখের ডায়লগের পর শোনা যায়নি বচ্চনের সংলাপ, আবার বচ্চনের বলার পর দেখা গিয়েছিল শুধুই শাহরুখের ঠোঁট-নড়া।

‘মহব্বতে’-র অডিয়ো ক্যাসেটের সঙ্গে আরও-একটি ক্যাসেট বাজারে এনেছিল এইচএমভি; ‘মহব্বতে’-র বাছাই সংলাপে ভরা সেই ক্যাসেট প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিল ছেলেটি। মাধ্যমিকের অংক পরীক্ষার আগের দিনের ছুটিতে হস্টেলের গেটম্যানের প্রশ্রয়ে একছুট্টে জয়ন্তী সিনেমাহলে। সেই একই সিনেমা আবার : ‘মহব্বতে’। ছুটিতে বাড়ি এলে সাইকেলে সওয়ার; পিঠের উপর দু’ দিক দিয়ে ঝুলিয়ে-দেওয়া ফুলস্লিভ্‌ টি-শার্ট বা সোয়েটার : মফস্‌সলের রাজ আরিয়ান মালহোত্রা। ‘মহব্বতে’-তে গুরু যেমন চশমা পড়েছে, অমন একখানা তারও চাই। মাধ্যমিকের পর ছুটিতে বাড়ি এসে একদিন তাই বাবাকে অবিকল বলে ফেলেছিল, চোখে ঝাপসা দেখছে, মাথাও ঘুরছে মাঝে-মধ্যে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে ইচ্ছে করে চোখের পাওয়ার বেশি দেখিয়ে হুবহু ওই ফ্রেমের চশমা বাগিয়েছিল সে। ওই বয়সে লোকজনের সাধারণত মাইনাস পাওয়ার হয়, তার হয়েছিল উলটো : প্লাস পয়েন্ট ফাইভ। ইলেভ্‌নে নতুন হস্টেল—বেলুড়মঠ। সেই হস্টেলের ঘরের দরজায় চক দিয়ে ছেলেটি ‘মহব্বতে’-র আদলে লিখে রেখেছিল ‘গুরুcool’। ক্লাস টুয়েল্‌ভের হস্টেল-সুপারকে প্রথম দর্শনে তার মনে হয়েছিল চশমা-পরা শাহরুখ খান, গুরুকুলের গেটপাস—রাজ আরিয়ান মালহোত্রা।

43

Leave a Reply Cancel reply