Categories
রাজনীতি

তিন কৃষি বিষয়ক আইন প্রত্যাহার করা সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি আন্দোলন নিয়ে একটি আলোচনা

  • উৎপল দাস, আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মী

রাঁচি থেকে গত রাতে রওনা দিয়ে হাওড়া হয়ে আজ সকাল পৌনে আটটায় বাড়িতে ঢুকেছি । রোজ কার অভ্যেস মত সুতপার বাবা টিভিতে খবরের একটা চ্যানেল চালিয়ে চা খাচ্ছেন । স্নান করে বেড়িয়ে কানে এল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কিছু বলছেন । যদিও দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা গুরুত্ব দিয়েই শোনা উচিত কিন্তু মিথ্যেবাদী নরেন্দ্র মোদীর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনার কোন তাগিদ আমি কোন সময়ই অনুভব করি না । আজও করি নি । কিন্তু অধ্যাপক সৌগত রায় [ ওনার নামের আগে অধ্যাপক লিখতে কষ্ট হয় কিন্তু কি আর করা যাবে] লেনিনের নাম উল্লেখ করে কিছু বলছেন এটা কানে যাওয়ার পরেই টিভির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । কেন্দ্র সরকার কৃষি বিষয়ক তিন আইন বাতিল করবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে জানিয়েছেন । এবার আর নিঃস্পৃহ থাকতে পারলাম না । বিজেপি এত তাড়াতাড়ি এই তিন আইন বাতিল করার দাবি মেনে নেবে এটা একবারও ভাবি নি । সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠল অক্টোবরের ২৮ তারিখ সকালে টিকরি বর্ডারে এক ডাম্পারে পিষে দলা পাকিয়ে যাওয়া তিন মহিলার দেহ । সাথে সাথেই মনে পরে গেল ২০২২ এ উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাব, উত্তরাখণ্ডে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন আছে ।

সিঙ্ঘু টিকরিতে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার মঞ্চে একাধিক বার বলেছি এটা শুধু মাত্র কৃষকদের আন্দোলন নয় । এই তিন আইন হলে কৃষকেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে তেমনি যারা কৃষক নয় তারাও প্রচণ্ড ভাবে ক্ষতি গ্রস্থ হবে । এই তিন কালো আইন বাতিল করার জন্য দেশের সমস্ত অংশের মানুষকে সামিল করে সংসদীয় পদ্ধতিতেই আন্দোলন করতে হবে । বিজেপি এবং তার ঘোষিত ও অঘোষিত সমস্ত রাজনৈতিক দলকে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচন এবং তার আগে যেখানে যত নির্বাচন হবে সেই প্রতিটি নির্বাচনে হারাতে হবে । রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি ও তার ঘোষিত ও অঘোষিত সঙ্গী সাথীরা দুর্বল হলে রাজ্যসভার তাদের সাংসদ সংখ্যা কমে যাবে । এর ফলে এখন যত সহজে তারা সংখ্যার জোরে যে কোন বিল কোন আলোচনা না করেই এক দুই মিনিটে আইনে পরিণত করছে তা বন্ধ হবে । চূড়ান্ত লড়াই হবে ২০২৪ এ । তাতে বিজেপিকে সমূলে কেন্দ্র থেকে উৎখাত করতে হবে । কৃষকদের নেতৃত্বে দেশের মানুষের সমর্থনে নতুন সরকার এসে প্রথমেই কৃষি বিষয়ক এই তিন কালো আইন বাতিল করবে ।

সিঙ্ঘু ও টিকরিতে কয়েকদিন থাকায় এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের যে সমস্ত নেতৃত্বের সাথে পরিচয় হয়ে ছিল তাদের নিয়মিত বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠিয়েছি । তার একটা ছিল কেন এই তিন কৃষি আইন কৃষক তথা দেশের মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর তা সব ভাষায় ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে দেওয়া । কারণ এই তিন কৃষি আইন কেন কৃষক তথা দেশের মানুষের জন্য ভয়ানক তা দেশির ভাগ দেশবাসীই এখনও জানে না । গতকাল ডাঃ সোয়াইমান সিং এই তিন আইন হিন্দিতে ব্যাখ্যা করে ইউটিউবে দিয়েছেন । আমাকে তার লিঙ্ক পাঠিয়ে বাংলায় একই রকম ভিডিও করতে অনুরোধ করেছেন । একটা বিষয়ে মত ঐক্য না হওয়ায় আমি এখনও তা করি নি । তাদের মতে The Farmers’ Produce Trade and Commerce (Promotion and Facilitation) Act, 2020 এর Section ১৩ কৃষকদের কারও বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছে । আমার মতে দেশের কোন নাগরিককের আদালতে যাওয়ার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না; এমন কি আদালতও নয় । Section ১৩ সত্বেও কেন্দ্র সরকার রাজ্য সরকার বা এই দুই সরকারের কোন আধিকারিকের বিরুদ্ধে বা যে কোন সম্পর্কিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়া যাবে তবে প্রথমে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে good faith এ নয়, with malafide intension সিদ্ধান্ত নিয়েছে । Section ১৩ কৃষকের আদালতে যাওয়া কঠিন করে দিয়েছে । বন্ধ করে দেয় নি ।

এই আন্দোলনকে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যে আগামী ২৬শে নভেম্বর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষকে নিয়ে এই আন্দোলনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভা, সমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম যা কৃষক নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে ।

সিঙ্ঘু, টিকরিতে যে দুটো প্রশ্নের মুখোমুখি সব চেয়ে বেশি হয়েছি তা হল “বাঙ্গাল মে হামারা হালত ইতনা খারাব ক্যায়সে হো গ্যায়া কি অ্যাসেম্বিলি মে এক ভি সিট নেহি মিলা” আর “বাঙ্গাল সে ইস আন্দোলন মে লোগ কিউ নেহি আ রহে হ্যা”। তাই বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে দিল্লি ও তার আশে পাশে থাকা বাঙ্গালীদের ২৬ তারিখ কাছাকাছি অবস্থান আন্দোলনে গিয়ে অংশ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানাতে বলেছিলাম । নিজেও ফেসবুক, ট্যুইটারের মাধ্যমে অনুরোধ করব ভেবে রেখেছিলাম । ২৭ তারিখ পার্টির ইটাহার আঞ্চলিক পরিষদের সম্মেলন আছে । এর আগে দুর্গাপূর যেতে হবে । ঠিক করে ছিলাম ২৬ তারিখ দুর্গাপূর লাইন বাজারে কৃষক আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটা পথসভা করব ।

কেন্দ্র সরকার তিন আইন ফিরিয়ে নেবার কথা ঘোষণা করলেও এগুলি করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে । কারণ বিজেপি কৃষকদের কথা ভেবে এই তিন আইন ফিরিয়ে নিচ্ছে না । সাময়িক ভাবে এই তিন আইন বাতিল করছে নিজের স্বার্থে । উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাব ও উত্তরাখন্ডের বিধানসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে । যদি এখন বিজেপি বিরোধী আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে বিজেপি এই তিন রাজ্যের নির্বাচনে ভালো ফল করার সম্ভবনা বেড়ে যাবে । যদি বিজেপি এই তিন রাজ্য ভালো ফল করে তবে এই তিন কালো আইন নিশ্চিত ভাবে আবার ফিরে আসবে । আর তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শুধু তিন আইন ফিরিয়ে নেবার কথা ঘোষণা করেছেন । স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে কৃষিজ পণ্যের ন্যুনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করার জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়ে কিছু বলে নি । এই পৃথিবীতে বোধ হয় আমাদের দেশের কৃষকরাই একমাত্র যারা নিজেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের দাম ঠিক করতে পারেন না এবং যাদের পণ্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করে হয় ।

সিঙ্ঘু টিকরিতে প্রায় প্রত্যেককে বলেছিলাম বিজেপি, আর এস এস কি এর বেতনভুক কর্মীরা কি পঞ্জাব হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে কৃষকদের এই তিন আইন সম্পর্কে তাদের মত করে বোঝাবার চেষ্টা করছে না ? সবাই বলেছিল অবশ্যই করছে । কিন্তু ওদের কথা আর কেউ শুনছে না, বিশ্বাস করছে না ।

আমাদের নিজের নিজের এলাকায়, রাজ্যে, দেশের সর্বত্র ঠিক এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে বিজেপি, আর এস এস এবং তাদের ঘোষিত ও অঘোষিত সঙ্গী সাথীদের কথা আর কেউ না শোনে, কেউ বিশ্বাস না করে । যে আন্দোলন পঞ্জাব হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশের কৃষকেরা শুরু করেছেন সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাত্রা বিন্দুমাত্র কমানো যাবে না । একে আরও উস্কে দিতে হবে যাতে এর প্রভাব দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পরে । যাতে এর রেশ ২০২৪ পর্যন্ত থাকে । যাতে এই আন্দোলনের ধাক্কার বিজেপিকে সমূলে কেন্দ্র থেকে উচ্ছেদ করা যেতে পারে এটাই এখন এই আন্দোলনের অভিমুখ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি । একমাত্র এর মাধ্যমেই আমাদের দেশ এই ফ্যাসিস্ট সরকারের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারে । ভুলে গেলে চলবে না শুধু কৃষি বিষয়ক এই তিন কালো আইন নয়, আর এস এস বিজেপি পরিচালিত এই ফ্যাসিস্ট, পুঁজির দালান সরকার দেশের প্রায় সমস্ত আইনকে পুঁজিপতিদের স্বার্থে পাল্টে দিয়েছে বা পাল্টাবার পরিকল্পনা করেছে ।

ভেবেছিলাম আজ লিখব ২৬ তারিখ আন্দোলনের বর্ষ পূর্তি অবস্থানকে সফল করার জন্য কিভাবে পঞ্জাবের কৃষক নেতৃত্ব গ্রামে গ্রামে গিয়ে নিবিড় প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন । কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে লেখার বিষয়টা পাল্টাতে হল ।

The opinions expressed within this article are the personal opinions of the author. The facts and opinions appearing in the article do not reflect the views of kulikinfoline.com and kulikinfoline.com does not assume any responsibility or liability for the same.

35

Leave a Reply