Categories
জেলার খবর

রায়গঞ্জের অদূরে বিন্দোলের ভৈরবী মন্দির-
এখনো জাগ্রত

ডাঃ দেবব্রত  রায়

উত্তর দিনাজপুরের জেলা সদর রায়গঞ্জ শহর থেকে সড়ক পথে দূরত্ব ২২ কিলোমিটার । সীমান্তবর্তী বিন্দোল অঞ্চলের একটি গ্রাম ‘বাজে বিন্দোল’।প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসতিপূর্ণ এই  গ্রামটি বিখ্যাত তার ‘ভৈরবী মন্দির’ এর জন্য ।
কথিত আছে কয়েক দশক আগে কোন এক বিপর্যয়ের সময় আকাশ থেকে বাজ পরে এই গ্রামটির প্রচুর ক্ষতি সাধন করে  সেই থেকে গ্রামটি বাজে বিন্দোল নামেই পরিচিত। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিন্দোল অঞ্চল এবং রায়গঞ্জ শহরের সংযোগকারী রাজ্য সড়কের একেবারে গাঁ ঘেঁসে এই অঞ্চলের সবচেয়ে জাগ্রত ‘ভৈরবী মন্দির’।কথিত আছে ভাতুরিয়ার মহারাজ গণেশ নারায়নের উদ্যোগে এই মন্দিরটি নির্মিত। আবার অন্য মতে এই মন্দিরের নির্মাতা ছিলেন দেবী চৌধুরানীর সময়কার কয়েকজন ডাকাত।প্রথম মতটি ধরলে এই মন্দিরের বয়স প্রায় পাঁচশো বছর আর দ্বিতীয়টিকে ধরে নিলে আড়াইশো বছর ।কথিত আছে সেই সময়ে কোন বড় ধরনের ডাকাতি করতে যাবার আগে সিদ্ধি লাভের আশায় ডাকাতরা এই মন্দিরে পুজো দিয়ে তবে বের হতেন কাজে।

নির্মাণের সময় নিয়ে ধোঁয়াশা যাই  থাকুক না কেন এই মন্দির যে দীর্ঘ কয়েক শতকের পুরনো এর গঠনশৈলী দেখেই তা’ অনুমান করা যায়। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে প্রায় ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল এই ইতিহাস প্রসিদ্ধ মন্দিরটি। সারা মন্দির জুড়ে ঝুড়ি নামিয়েছিল অসংখ্য গাছ গাছরা ।এই মন্দিরটির ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে কয়েক বছর আগে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে  অধিগ্রহণ করে এবং মূল কাঠামো এবং জায়গা অপরিবর্তিত রেখে নতুনভাবে সংস্কার করে।


মন্দিরের গায়ে রয়েছে টেরাকোটার অপূর্ব কারুকার্য মন্দিরের থাম থেকে  গর্ভগৃহের দেয়াল সজ্জা পুরোটাই সূক্ষ্ম টেরাকোটার তৈরি যার আভাস এখনো পাওয়া যায়। যদিও এটি একটি হিন্দু মন্দির কিন্তু মন্দিরের মাথায় গম্বুজের ধরণ দেখে অনেকে একে হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতির বলে অনুমান করেন । অসমর্থিত লোককথা হ’ল এর নির্মাতা পরবর্তীতে কোনো কারণে মুসলিম ধর্মাবলম্বী হয়েছিলেন। মন্দিরের মধ্যে রয়েছে কষ্টি পাথরের তৈরি মূর্তি। উচ্চতা  ৩ ফুটের কাছাকাছি। এখনো সেবাইতের হাতে নিত্যপুজা পান এই দেবতা । একসময় এই মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যেত একটি নদী যার নাম ছিল কাঞ্চন নদী এবং মূলত শোনা যায় এই নদীপথে পূর্ববঙ্গ থেকে সাধারণ মানুষেরা যেমন এখানে আসতেন  পুজো দিতে তেমনি ডাকাতদল নদী পথে এসে পুজো দিয়ে আবার নদী পথেই চলে যেতেন দূর-দূরান্তে ডাকাতি করতে।এখন আর এই নদীর অস্তিত্ব নেই।


তাহলে ‘ভৈরবী মন্দির’ নামকরণের রহস্য কোথায়? লোককথা আছে সেই শুরু থেকেই একজন অতি নিষ্ঠাবান শৈব সন্ন্যাসীনি এই মার্তন্ড দেবতার  উপাসক হিসেবে ছিলেন যিনি ভৈরবী নামে খ্যাত ছিলেন। কিছু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এই সাধিকা।সেই থেকেই মন্দিরটি ভৈরবী মন্দির নামে লোকমুখে পরিচিত। কথিত আছে এই মন্দিরের পূজার ফুল পাশের সুড়ঙ্গে ফেলে দিলে তা নাকি এক কিলোমিটার দূরের দীঘিতে ভেসে ওঠে পরের দিন। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এখন আর পাওয়া কাউকে পাওয়া যায় না আশেপাশে।

এখনো প্রতিবছর শ্রাবণী পূর্ণিমা রাতে মন্দিরে ধুমধাম করে পূজার্চণা  হয় । মেলা বসে । দূর দূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন পুজো দিতে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে যতটা প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল তা নেওয়া হচ্ছে না।
এই অভিযোগের খানিকটা সারবত্তা পাওয়া গেল মেলার পরপরই মন্দির দর্শনে গিয়ে। যত্রতত্র ছড়ানো পূঁতিগন্ধময় নোংরা পরিবেশ দূষণ করলেও পরিস্কারের কোন উদ্যোগই নেই।

170

Leave a Reply