কুলিক রোববার : গল্প : আঁধি

শৌভিক রায়

‘ সাজিং যাইমু সংমো তো জাদো
ইপাইদে ইউমা ইচুং ইপাইদে কে গাগো
ইউমাচুং কে জাগো, ইউমা দাজুং যাইমু।
লুই জুগো চুম্মে, নিংমে অজ্জাকো
নদা যাইপু লাইমো টেংকাইলে জাগো।’

লেতিগেহুয়ার কাছে শোনা গানটা বিড়বিড় করে শক্তি। আগানি মাসের রোদে চারদিক খাঁ খাঁ করছে। ছাগলগুলোও দূরের ওই বটগাছটার নিচে ভীড় জমিয়েছে। ওদেরও ছায়া দরকার আসলে। অন্যসময় হলে শক্তি হাতের লাঠিটা নিয়ে তদারক করত চারদিক। কিন্তু এই রোদে আর ইচ্ছে করছে না। সে খুব ভাল জানে যে, ছাগলগুলো অন্য কোথাও যাবে না। এই দূর থেকেই সে গুনেছে ইচে, ইসে, সংশে….। ওই তো, ওই পিঠে পাশুটে ছোপ…ওটাকে নিয়ে তার মোট ছাগলের সংখ্যা হল কুশে। এগুলো নিয়েই তার ঘর সংসার। এখনও বিয়ে করেনি শক্তি। এবার ডেমসাতে যখন চি-চি-পাওবা চলছিল তখন সুকা গাঁওয়ের জুমাকে দারুণ লেগেছিল শক্তির। বান্ধবী প্রভার সঙ্গে নাচ দেখতে এসেছিল সে। কিন্তু ভাল লাগলেই তো হল না! সবকিছু বুঝতে হয়, বিবেচনা করতে হয়। তার চেয়ে এই ভাল। নিজের মতো থাকা। বাপের রেখে যাওয়া অল্প জমিতে চাষ করা আর মোটামুটি যা জোটে তাতে নিজেরটুকু চালানো। ছাগলগুলোও কাজে লাগবে আর কয়েকদিন পর। তবে কয়েকটাকে বিক্রি করে দেবে শক্তি। নিয়ে যাবে হাটে। যা পয়সা পাবে তা দিয়ে ঘর সারাই করবে। ফুটো চাল দিয়ে আগানির এই কড়া রোদ মানা গেলেও, বাউই আর কাতি মাসের বৃষ্টির জল আর সহ্য হয় না!

দিমবুনের দিকে তাকায় শক্তি। একটুও মেঘ নেই। বরং তাদিং পাহাড়ের গা যেন ঝলসে যাচ্ছে। সুপুরি গাছগুলো কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। হাউরির বুক ঠনঠনে। দু’চারটে গাড়ি গেলে ধুলো উড়ছে দু’মানুষ সমান উঁচুতে। ওই দূরে ফুন্টশিলিং পাহাড়ে তিরতির করে কাঁপছে জল। ওটা অবশ্য বিজ্ঞানের বিষয়। জানে শক্তি। সে পড়েছে ক্লাস নাইন অবধি। তারপর আর ভাল লাগে নি। আসলে মোষের পিঠে চেপে চারপাশের এই বনেবাঁদাড়ে ঘুরে যে সুখ, বইয়ের পাতায় কোথায় সেটা! এখন অবশ্য আর সেভাবে ঘোরা হয় না। জঙ্গল কমছে ক্রমশ। বাড়ছে বাড়িঘর। তাছাড়াও আপাও গেছে, মোষও গেছে। কে আর দেখবে সেসব! আর আইয়ো তো সেই কবে থেকেই নেই!

ছোটবেলায় সে দেখেছ যে, আইয়ো আপার জন্য অপেক্ষা করত। তখন হুই ওপর পাহাড়ে কমলালেবু হত। আপা সকাল সকাল টুকরি নিয়ে বেরিয়ে যেত। ফিরত দুপুর গড়িয়ে। তাদের বাড়ির সামনে দিয়েই ওপর পাহাড় যাবার রাস্তা। শক্তি দেখত মাথায় টুকরিটা বেঁধে আপা অবলীলায় ওপরে, আরও ওপরে উঠে যাচ্ছে তরতর করে। নামবার সময় কমলালেবুর ওজনে আপাকে একটু কুঁজো দেখালেও, আপার ওই বলিষ্ঠ চেহারাটা দেখেই শক্তির মনে হত ভোটরাজার রাত-সৈন্য নেমে আসছে পাহাড় থেকে যুদ্ধ জয় করে। এখন ওপর পাহাড়ে কমলালেবু হয় না বললেই চলে।

আজা, আইয়ো, আপা কেউ নেই আর। আজার বয়স হয়েছিল। মরে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আইয়ো যে এভাবে চলে যাবে কোনদিন ভাবেনি সে। পাহাড় থেকে নামতেই পারল না তারা। সেবার প্রবল বৃষ্টিতে হাউড়ি, তিতি-সহ সব নদী ফুলেফেঁপে একাকার। এমনকি শুখা নদীতেও নাকি প্রবল বান। আইয়ো দুদিন থেকে জ্বরে ভুগছিল। সেদিন কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিল পেটের যন্ত্রণায়। আপা দৌড়ে গিয়ে একে তাকে ধরে এনেছিল আইয়োকে নিচে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু কিছুতেই সেটা সম্ভব হল না। কোনোভাবেই যাওয়া গেল না। কাইজি আর গাপ্পু যেসব ওষুধের কথা বলেছিল সেগুলিও দেওয়া হল। কিন্তু আইয়ো ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। সে চোখ আর খুলল না। আপা চলে গেল আইয়োর শোকেই। সেসময় শক্তি খুব ভেবেছিল যে, তাদের গ্রামে একটা হাসপাতাল থাকলে কি ভালটাই না হত! এখন অবশ্য আগের সে অবস্থা নেই। পাল্টে গেছে অনেককিছু। রাস্তা চকচকে হয়েছে। সব নদীর ওপর ব্রিজ না হলেও, অসুবিধে কমেছে। কিন্তু এখন সমানে লোক বাড়ছে। কেউ আসছে বেড়াতে, কেউ আসছে থাকতে।

পাল্লা দিয়ে কমে গেছে কমলালেবুর ফলন। এখন যা হয় তা ওই সুপুরি। তা বাদে নিজেরা চাষ করে যা ফলায়, সেটাই। আজা, আইয়ো চলে যাবার পর আপা আর কমলালেবু তুলতে যেত না। সকাল সকাল খেতির কাজ সেরে ঘুমিয়ে পড়ত। রাতে খাওয়া-টাওয়া সেরে লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়ত টহল দিতে চারপাশে। আপাকে কেউ বলে নি এভাবে গ্রাম টহল দিতে। কিন্তু আপা নিজেই সে কাজ বেছে নিয়েছিল। শক্তির তখনও মনে হয়েছিল ভোটরাজার রাত-সৈন্য এতদিনে সঠিক কাজ খুঁজে পেয়েছে। অবশ্য সংসারের জোয়াল ঠেলা সব মানুষগুলোই এক একজন সৈন্য আসলে!

হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় চমকে তাকায় শক্তি। কালো মেঘ পাহাড়ের ওপাশে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে শক্তি। ওদিকে ছাগলগুলোও নিজেরা ঠেলাঠেলি শুরু করেছে। ওদের দিকে তাকিয়ে শক্তি বলে ওঠে ‘হুররররররর’। মনিবের এই আওয়াজ পেলেই ছাগলগুলো দৌড়বে বাড়ির দিকে। তার ঘরের নিচেই ওদের আস্তানা। গাদাগাদি করে ঢুকে যাবে সব। গা এলিয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে চিবোবে নিজেদের মতো। আর মাঝে মাঝে ব্যা ব্যা ডাকবে।

ছাগলরা চলে যেতেই প্রবল বাতাসে ধুলো উড়ে এলো। অন্ধকার হল চারদিক। ঘরের দিকে পা চালাল শক্তি। নিমেষেই দিমবুনের চেহারা পাল্টে গেছে। শক্তির অভিজ্ঞতা বলছে যে, এই অবস্থা আজ আর পাল্টাবে না। এভাবেই রাত নেমে যাবে। একটু এগোতেই হোঁচট খেল শক্তি। ধুলোর অন্ধকারে তার সামনে জুমা দাঁড়িয়ে। হাঁফাচ্ছে। ভারী বুক উঠছে-নামছে। মুখে ত্রাস। শক্তিকে দেখেই চিৎকার করে উঠল জুমা,

  • শক্তি! বাঁচাও
  • তু..তুমি?
  • ওই ওরা।
  • কারা? কী হয়েছে?
  • তি..তিনজন ওরা! আ..আমাকে ধরতে আসছে!
  • ধরতে আসছে মানে?
  • ফো..ফোনে…
  • ফোন? বুঝলাম না।
  • ফোনে পরিচয় হয়েছিল একজনের সঙ্গে। ভাল ভাল কথা বলেছিল। আজ গ্রা..গ্রাম দেখতে এসে ওপর পাহাড়ে গিয়েছিল। আ..আমিও গেছিলাম। বি..বিশ্বাস কর বুঝি নি। এখানে তো এখন আঁধি আসছে। ওপর পাহাড়ে আগেই শুরু হয়েছে। আরও দুজন তখন বেরিয়ে আসে।
  • হুমম
  • আ..আমাকে…পালিয়ে এসেছি। অন্ধকার আর ওরা রাস্তা চেনে না বলে…আ..আমাকে…

হাত তুলে জুমাকে থামিয়ে দিল শক্তি। আর শুনবার দরকার নেই। তার ইচ্ছে করছিল জুমাকে এক হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল সে। শুধু চোয়ালটা শক্ত হল তার। অন্ধকারেই সে দেখতে পেল রানাদের মোষটা টংটং ঘন্টা বাজিয়ে তার দিকেই আসছে। এই মোষটা তার বড্ড ন্যাওটা। তাদের মোষটার বংশধর এটা। আপা চলে যাওয়ার পর রানাদেরকে দিয়ে দিয়েছিল নিজেদের মোষটা। এই আঁধিতে তাকে দেখেই মোষটা তার কাছে এসেছে। মোষের পাশে দাঁড়িয়ে শক্ত করে হাতের লাঠিটা ধরে দাঁড়ালো শক্তি।

তখনই আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠল। দুদ্দাড় নামল বৃষ্টি। চুপচুপে ভিজে গেল শক্তি। আর একবার বিদ্যুৎ চমকালে জুমার মনে হল ভোটরাজার রাত সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে তাদিং পাহাড়ের এই গ্রামে…

শব্দার্থ-
‘সাজিং যাইমু…টেংকাইলে জাগো’- আমরা আবার কাউন বুনতে যাচ্ছি। আমাদের শিশু কাউন গাছগুলি জল না পেয়ে মরে গেছে। আকাশ তুমি আমাদের দয়া করো। একটু বৃষ্টি দাও যাতে গাছগুলি বাঁচে।
লেতিগেহুয়া- স্বপ্নদ্রষ্টা
আগানি- ভাদ্র
ইচে, ইসে, সংশে- এক, দুই, তিন
কুশে- নয়
ডেমসা- প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান
চি-চি-পাওবা- মেয়েদের বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান
বাউই- আষাঢ়
কাতি- শ্রাবণ
দিমবুন- আকাশ
আইয়ো- মা
আপা- বাবা
আজা- ঠাকুমা
কাইজি- পুরোহিত
গাপ্পু- মোড়ল

পূর্বপ্রকাশিত: হেমন্তলোক (হরিদ্বার)

228