Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : প্রবন্ধ : কী এই রেইকি

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

The world is not only queerer than we imagine; it is queerer than we can imagine.

– JBS Haldane

সোনার হরিণ চাই। অসম্ভবের পিছনে ছুটছি আমরা। একসময় দাঁড়িয়ে পড়ছি কোমরে হাত দিয়ে। ততদিনে হারিয়ে গেছে আমাদের নিজস্ব অনুভবের জগৎ। পার্থিব ভোগসুখের উপকরণ খুঁজতে গিয়ে হতাশার ঘুণপোকা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা কেড়ে নিচ্ছে রাতের ঘুম। অথচ আমাদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনন্ত সম্ভাবনা। সেই উপলব্ধি এলেই মনোজগৎ আলোকিত হয়ে উঠতে পারে। কর্মব্যস্ত জীবন থেকে খানিকটা সময় বাঁচিয়ে মেডিটেশন করতে পারলে মনের সহনশীলতা বাড়ে। কেউ কেউ বলেন, নিয়মিত রেইকি অনুশীলনেও নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে পৌঁছে যাওয়া যায় অসীমের কাছাকাছি। যোগাভ্যাস বা মেডিটেশন কী সেটা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু হালফিল কানে আসা ‘রেইকি’ নিয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। এই চমকপ্রদ বিষয়টির ওপর আলো ফেলাই এই লেখাটির উদ্দেশ্য।

রেইকি কী

রেইকি একটি জাপানি কথা। ‘রে’ ও ‘কি’ এই দুটি শব্দ নিয়ে তৈরি। জাপানি ভাষায় ‘রে’ শব্দের মানে হল সার্বভৌমিকতা। এর গূঢ় অর্থ হল আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা এবং ‘কি’ শব্দের অর্থ হল জীবন শক্তি বা জৈব শক্তি। সহজ করে বললে রেইকি হল আধ্যাত্মিক স্পর্শ চিকিৎসা। আধ্যাত্মিক ভাবনা, শরীরের জ্ঞান, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস এই পদ্ধতির মূলকথা। এর আবিস্কার করেছিলেন ডক্টর মিকাও উসুই, যিনি জন্মসূত্রে ছিলেন একজন জাপানি। প্রাচীনকালে জাপানে আধ্যাত্মিক স্পর্শ চিকিৎসার প্রচলন ছিল। কালের নিয়মে তা একসময় হারিয়ে যায়। ডক্টর উসুইয়ের সৌজন্যে তা আবার জনসমক্ষে ফিরে আসে। এখন সারা পৃথিবীতেই রেইকি নিয়ে চর্চা চলছে।

তিব্বতের বৌদ্ধধর্মের ‘ঔষধি-বুদ্ধ’ নামে উপচার মার্গের একটি সূত্রের ওপর আধারিত এই বৌদ্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রাচীন এক বৌদ্ধগ্রন্থে এই বিশেষ সূত্রের উল্লেখ ডক্টর উসুই পুনরাবিস্কার করেন। কিন্তু রেইকি চিকিৎসার সঙ্গে বৌদ্ধদর্শনের মিল নেই। বুদ্ধদেব কোথাও শিব বা শক্তির ব্যাখ্যা করেননি। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নের ব্যাপারে তিনি ছিলেন নীরব। তিনি বলতেন, অসহায় পাখি তিরবিদ্ধ হলে মানুষের প্রথম কর্তব্য সেই তিরটি তুলে পাখিটির প্রাণ রক্ষা করা। কে কতদূর থেকে শর নিক্ষেপ করেছে সেই ভাবনা অনেক পরের।

ডক্টর উসুই বলেছেন যে, রেইকি হল এক প্রবল ইচ্ছাশক্তির তরঙ্গ যা মানুষের হাত ও করতলের মধ্যে দিয়ে বিচ্ছুরিত হয়, যা যে কোনও রোগকেই দূর করতে সক্ষম। ঠিক এই জায়গাতে এসেই আধ্যাত্মিক ভাবনার জন্ম। হাজার বছর আগে আমাদের দেশের মুনি-ঋষিরা এই পদ্ধতিতেই মানুষের রোগ নিরাময় করেছেন। শুধু তাই নয়, দূরে থাকা রুগিকেও তাঁরা শুশ্রূষা দিয়েছেন। ম্যাজিক মনে হলেও এ হল আধ্যাত্মিক শক্তি। এই তরঙ্গ রুগির সূক্ষ্ম শরীরের ওপর হালকা প্রভাব ফেলতে পারে।

বৌদ্ধদর্শনরেইকি

বুদ্ধদেব ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা বলেননি। কিন্তু রেইকি চিকিৎসা পদ্ধতিতে বলা হয় শিব ও শক্তির মিলন থেকেই উৎপত্তি হয় রেইকি শক্তির। এর সঙ্গে বৌদ্ধদর্শনের বিশেষ সম্পর্ক নেই। রেইকির চিহ্ন, শিব ও শক্তির বিবরণ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শরীরের চক্রের ব্যাখ্যা শক্তিতন্ত্রেরই ব্যাখ্যা। বৌদ্ধ সাধুদের কারও কারও মধ্যে গূঢ় সাধনার প্রতি আকর্ষণ জন্মাবার ফলে তাঁরা শাক্ততন্ত্রের অনেক বিধির প্রতি প্রভাবিত হন। ডক্টর উসুই এই বিদ্যা অর্জন করেছিলেন সম্ভবত কোনও এক বৌদ্ধ সাধকের কাছ থেকে। কিন্তু সাধন মার্গের কোনও সাধকের সঙ্গে জাগতিক বা সাংসারিক বিষয় আশয়ের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকে না। ডক্টর উসুই এই বিদ্যাকে কাজে লাগিয়েছিলেন জাগতিক প্রয়োজনে, রোগ নিরাময়ের কাজে। তাঁকেই এর পুরোধা বলে প্রচার করা হয়।

মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে রোগব্যাধির জন্ম। রোগকে দূর করার ক্ষমতা মানুষের মধ্যেই থাকে। মানুষ যখন সুস্থ থাকতে চায় তখন বাইরের উপচার তাকে সুস্থ ও নিরোগ থাকতে সাহায্য করে। আবার রুগি যদি নিরোগ হয়ে ওঠার চেষ্টা না করে তাকে সুস্থ করে তোলা চিকিৎসকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, রোগ নিরাময়ে ইচ্ছাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা আছে।

আমরা আধুনিক হয়েছি। আমাদের জীবনে জটিলতা বেড়েছে। সেই জটিলতা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। অব্যক্ত সত্ত্বাকে আরও বেশি করে অনুভব করার জন্য মানুষ সাধনা করেছে, পুজো করেছে, তপস্যা করেছে। প্রাচীনকালের ঋষিরাও এই প্রাণশক্তিকেই বিকশিত করেছেন। একই কাজ করেছেন বুদ্ধদেবও। জীবশক্তিকেই তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য প্রয়োগ করেছেন। শোনা যায়, আজও তিব্বতের বিভিন্ন বৌদ্ধ মঠে বুদ্ধ কথিত বা প্রবর্তিত এমন কিছু পবিত্র, রহস্যময় ও গুপ্তবিদ্যার প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে নানা রোগ ও সমস্যার সঠিক নির্ধারণ সম্ভব হয়।

রেইকি এমনই এক বিধি, যা দিয়ে বিভিন্ন রোগের উপচার ও জীবনের জটিলতম সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়। এই শক্তির মধ্যে আছে অনেক গূঢ তত্ত্ব। রেইকি পুরোপুরি মনোবিজ্ঞান নির্ভর। মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে রেইকি চিকিৎসা করতে হয়। রেইকি প্রশিক্ষকরা তাঁদের পূর্বসূরী বা গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছ থেকে বিশেষ ধরনের শক্তি হস্তান্তর পদ্ধতি শিখে নেন। মনের ইচ্ছাশক্তিকে বৃদ্ধি করে তাকে অন্যের দেহে সমাবিষ্ট করে তাঁকে সুস্থ করে তোলাই রেইকির কাজ।

ডক্টরমিকাও উসুই

৭ ফেব্রুয়ারি ১৮০২ সালে জন্ম। ১১ অক্টোবর, ১৮৮৩ সালে মহাপ্রয়াণ। কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন এই খ্রিস্টধর্ম নেওয়া আদর্শবান মানুষটি। একদিন বাইবেল পড়াবার সময় জনৈক ছাত্র তাঁকে প্রশ্ন করেন, যিশু যেভাবে হাতের স্পর্শ দিয়ে রুগির রোগ নিরাময় করতেন তা কি সত্যি ? আপনিও কি পারেন আমাদের এই বিদ্যা শেখাতে যাতে আমরাও রুগিদের সুস্থ করে তুলতে পারি ? ডক্টর উসুই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁর অক্ষমতার কথা স্বীকার করে নেন। কিন্তু ছাত্রটির এই প্রশ্ন তাঁর মধ্যে আলোড়ন তুলে দেয়।

পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্তফা দিয়ে ডক্টর উসুই বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যিশু ও খ্রিস্টধর্ম সংক্রান্ত সমস্ত বই তিনি পড়ে ফেলেন। কিন্তু সেই বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তির সন্ধান তিনি পেলেন না। তখন তাঁর মনে হল খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের মধ্যে কোথাও একটা সাযুজ্য আছে। কারণ ভগবান বুদ্ধও বৃদ্ধ ও রুগিদের নিরাময় করে তোলার অলৌকিক শক্তি অর্জন করেছিলেন। এই ভাবনা থেকে বৌদ্ধধর্মের পীঠস্থান জাপানেই তিনি ফিরে আসেন। জেন মঠে এক প্রবীণ বৌদ্ধ ধর্মাচার্যের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেই সন্ন্যাসী তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, ভগবান বুদ্ধ যে অদ্ভুত ক্ষমতার প্রয়োগ করেছেন তা সত্য। আজও তার প্রয়োগ নিশ্চয়ই করা সম্ভব। তুমি অনুসন্ধান চালিয়ে যাও।

নতুন করে পথে নামেন ডক্টর উসুই। এভাবেই একদিন উত্তর ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে এসে পড়লেন তিনি। এই অলৌকিক শক্তি সম্বন্ধে তার জানার স্পৃহা এতটাই ছিল যে, তিনি সংস্কৃত ভাষাও শিখে নিয়েছিলেন। কোনও কোনও পন্ডিতের মতে তিনি এরপর চলে আসেন তিব্বতে। সেখানে তিব্বতি কমলসূত্রের মতো মূল্যবান প্রাচীন পুঁথির সন্ধান পান। সাধনার এই পদ্ধতি জানার পর তিনি ফিরে যান জাপানের সেই জেন মঠে। সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে জানান তাঁর ফললাভের কথা।

এবার কিয়োতো শহর থেকে ষোলো কিমি দূরে কুরিয়ামা পাহাড়ে গিয়ে তিনি নির্জনে সাধনা করতে থাকেন। একুশ দিন ধরে উপবাস করে সাধনা করার পর একদিন ভোরবেলা তিনি অনুভব করেন দূরে পুব আকাশে এক শুভ্র আলোর জ্যোতি। রামধনু রঙের আলোর বুদবুদ যেন তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে। তাঁর মনে হল, সেই আলোর দ্যূতি ক্রমশ এগিয়ে এসে তাঁর দুই ভ্রূ-র মধ্যে তাঁর আজ্ঞাচক্রে এসে মিলিয়ে গেল। তিনি বিদ্যুতের মতো শিহরন অনুভব করলেন। তখনই তাঁর ভেতর থেকে কেউ তাঁকে বলল, আজ তোর সাধনা সম্পূর্ণ হল। এই সাধনা ও উপলব্ধি যেন মানুষের কাজে লাগে।

বেশ খানিকক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকার পর ডক্টর উসুই যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন অনুভব করলেন দীর্ঘ উপবাস ও সাধনার ধকল তাঁর দেহমন থেকে চলে গেছে। তাঁর শরীরে এখন অমিত শক্তি। খুশিতে আপ্লুত হয়ে তরতর করে পাহাড় থেকে নেমে আসছিলেন তিনি। তখন পাথরে লেগে তাঁর পায়ের আঙুল থেকে রক্ত বেরোতে লাগল। তিনি হাত দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরলেন। তাঁর রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। ব্যথাও সেরে গেল।

এবার তিনি পথের ধারের এক সরাইখানায় গেলেন। একটি বাচ্চা মেয়ে তাঁর জন্য খাবার নিয়ে এল। মেয়েটির গাল বেশ ফোলা। ডক্টর উসুই জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন মেয়েটি দাঁতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে। তিনি মেয়েটির গালে স্নেহের হাত রেখে একটু পরে হাত সরিয়ে নিলেন। লক্ষ্য করলেন, মেয়েটির দাঁতের ব্যথা পুরোপুরি কমে গেছে। গালের ফোলাটাও আর নেই।

পরপর ঘটে যাওয়া এই আশ্চর্য ঘটনাগুলি থেকে তিনি নিশ্চিত হলেন যে তিনি এক দিব্য শক্তি অর্জন করেছেন। তাঁর কাজ এই শক্তিকে মানুষের কাজে লাগানো।

রেইকির তত্ত্ব

গড়িয়ার বাসিন্দা পিনাকীরঞ্জন চৌধুরী একজন রেইকি গ্র্যান্ডমাস্টার। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। কিন্তু ঐহিক জগত নয়, তাঁর ধ্যান জ্ঞান সাধনার জায়গা নিয়েছে রেইকি। কলকাতার একটি রেইকি সেন্টারের সঙ্গে তিনি যুক্ত। মনোবিজ্ঞানীরা যা বলেন, তাঁর কথাও সেটাই। অবচেতন মনের অবদমিত কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ভয়, ঘৃণা ইত্যাদি আমাদের অজান্তেই চেতন মনে চলে আসে। এভাবেই আমাদের মধ্যে রোগ জন্ম নেয়। নেগেটিভ থট বা মনের প্রতিকূল ভাবনাই আমাদের সত্তর শতাংশ রোগের জন্য দায়ী।

আমাদের পঞ্চতত্ত্ব দিয়ে গড়া স্থূল শরীরের চারদিকে তিন থেকে আট ইঞ্চি ক্ষেত্রের মধ্যে আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের অবস্থান। এই সূক্ষ্ম শরীরকে বলা হয় এনার্জি বডি। এনার্জি বডি আমাদের স্থূল শরীরের কবচ। এই কবচ আমাদের স্থূল শরীরকে বাইরের বিকৃতি থেকে রক্ষা করে। এই এনার্জি বডির মধ্যে রয়েছে সাতটি শক্তি কেন্দ্র। একে বলে এনার্জি সেন্টার। এই শক্তি কেন্দ্র আমরা দেখতে পাই না। এই সাতটি এনার্জি সেন্টার বা চক্র নিয়ে আমাদের দেশের যোগীপুরুষরা তাঁদের নিজস্ব শাস্ত্রে ব্যাখ্যা করেছেন। এই সাত শক্তি কেন্দ্রকে শাস্ত্রীয় ভাষায় বলে ষটচক্র। এদের মধ্যে দুটি ঈশ্বরীয় চক্র। বাকি পাঁচ চক্রে আমাদের শরীরে নিহিত পাঁচটি তত্ত্বের পোষণের কাজ করে। আমাদের স্থূল শরীর আকাশ, বায়ু, জল, অগ্নি, ও পৃথিবী এই পাঁচটি তত্ত্ব নিয়ে গড়া।

আমাদের স্থূল শরীর ও সূক্ষ্ম শরীরের সাড়ে তিন ফুট পরিমান ক্ষেত্রের মধ্যে আর একটা বায়বীয় শরীর থাকে। শাস্ত্রের ভাষায় তাকে মনোময় শরীর বলে। মনোময় শরীর ভাবনার উৎপাদন করে আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের মাধ্যমে স্থূল শরীরে প্রবেশ করায়। একজন সাধারণ মানুষের মস্তিস্কে একদিনে গড়ে ষাট হাজার ভাবনার উদ্রেক হয়ে থাকে। আমরা তা জানতেও পারি না। তার কারণ আমাদের মনের মধ্যে অসংখ্য ভাবনার জন্ম হয়, আবার আপনা আপনিই তা লোপ পেয়ে যায়। কিন্তু মনের ওপর ভাবনার অনাবশ্যক চাপ বেশি হয়ে গেলে সূক্ষ্ম শরীর তা বহন করতে পারে না। তখন যে অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে সেখানে শুরু হয় যন্ত্রণা। পেনকিলার কিছু সময়ের জন্য আমাদের মস্তিস্কের ব্যথার কথা ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু ওষুধের প্রভাব শেষ হতেই আবার শুরু হয় ব্যথা। রোগের স্থায়ী সমাধান আর হয় না।

আমাদের তিনটি মূল শত্রু। ভাবনার অতিরিক্ত চাপ, অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া আর দূষিত পরিবেশ। এই তিনের আক্রমণ আমাদের শরীরের পঞ্চতত্ত্বকে ভেঙে দেয়। তখন ব্যায়াম, যোগাসন, ভক্তিসাধনা করে সুস্থ থাকার চেষ্টা করি আমরা। রেইকি অনুশীলনেও শরীর ও মন সুস্থ রাখা যায়। রেইকির সুবিধে হল এর অনুশীলন ও প্রয়োগ সহজ। এর কোনও ক্ষতিকর দিক নেই। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। রেইকি শক্তি প্রয়োগ করলে আমাদের সূক্ষ্ম শরীরে স্থিত চক্রগুলো গতি ও শক্তি ফিরে পায়। ফলে শরীরের পঞ্চতত্ত্ব সক্রিয় হয়। রোগাক্রান্ত মানুষটি রোগযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়।

ভারতীয়যোগশাস্ত্রও রেইকি

আমাদের মেরুদন্ডের ভেতর তিনটি নাড়ির অবস্থান। ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না। সুষুম্না নাড়ির সবচেয়ে নিচের অংশে মূলাধার চক্র। তার পর স্বাধিষ্ঠান চক্র, মণিপুর চক্র, অনাহত চক্র, বিশুদ্ধ চক্র, আজ্ঞা চক্র, এবং সবচেয়ে ওপরে মস্তিস্কে সহস্রার বা সহস্রদলপদ্ম স্থিত। সবচেয়ে নিচের চক্রতেই সমস্ত শক্তির সমাবেশ। সেই শক্তিকেই ওই জায়গা থেকে মস্তিস্কে স্থিত সর্বোচ্চ চক্রের ওপর নিয়ে যেতে হয়। ভারতীয় যোগশাস্ত্র অনুসারে মূলাধার চক্রতে কুন্ডলিনী শক্তি বিদ্যমান থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই শক্তি সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। একজন যোগী কুন্ডলিনী শক্তির সাধনা করে তাকে জাগ্রত করে সুষুম্না নাড়ির মাধ্যম করে ওপরের দিকে তোলেন। তিনি এই কুন্ডলিনী শক্তিকে ধ্যানযোগে ধীরে ধীরে উপরে স্থিত চক্রগুলিতে প্রবেশ করাতে করাতে সহস্রার পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে যান। সেখানে কুন্ডলিনী পৌছবার পর সাধকেরা পূর্ণ সমাধির অবস্থায় পৌঁছে যান। তখন শরীর ও মনের ওপর পূর্ণ অধিকার জন্মে যায়। সেই সঙ্গে তিনি আত্মদর্শন লাভ করে পরমাত্মার অনুভব করতে শুরু করেন। এই অবস্থা দিব্য ও উচ্চতর আধ্যাত্মিক স্তরের।

মনে করা হয়, রেইকির মূল সাধনা ভারত থেকেই কোনও এক সময় জাপানে গিয়েছিল। তাই শরীরস্থিত চক্রগুলির গুরুত্ব আছে। হাজার বছর আগে আমাদের দেশের যোগীপুরুষেরা আমাদের শরীরের যে সমস্ত জায়গায় অন্তঃস্রাবী চক্রগুলির উপস্থিতি সম্পর্কে বলেছিলেন, আজকের শরীরতত্ত্বের বিজ্ঞানীরা ঠিক সেখানেই এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড বা অন্তঃস্রাবী গ্রন্থিগুলির অবস্থান বলে মেনে নিয়েছেন। এই অন্তঃস্রাবী গ্রন্থিগুলিই আমাদের রক্তের মধ্যে বিভিন্ন হর্মোনের মিশ্রন ঘটায়।

রেইকি শাস্ত্রে চক্র হল আমাদের সূক্ষ্ম শরীরে স্থিত শক্তি কেন্দ্র বা এনার্জি সেন্টার। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যেমন নিজস্ব কাজ আছে তেমনি এই চক্রগুলিরও নিজস্ব কাজ আছে। মণিপুর চক্র থেকে নিচের দিকের চক্র শারীরিক প্রয়োজনীয়তা ও ভাবনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। ওপরের চক্র মানসিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনা ও কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এই চক্রগুলোর শক্তিপ্রবাহ ও ভারসাম্যের ওপর শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থান নির্ভর করে। চক্রগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড বা অন্তঃস্রাবী গ্রন্থি গুলির ওপর পড়ে। এবং এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড থেকে নির্গত হওয়া হরমোনের প্রভাব পড়ে মানুষের শরীরের রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে।

রেইকি এক নজরে

যে কোনও বয়সের স্ত্রী-পুরুষ রেইকি শিখতে পারেন। এর সঙ্গে প্রথাগত শিক্ষার কোনও সম্বন্ধ নেই। রেইকি শেখার জন্য শুধুমাত্র ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। রেইকি একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি। কোনও ভাবেই ওষুধের বিকল্প নয়। বরং বলা হয়, যে সব রুগি ওষুধ খাচ্ছেন তাঁরা এর পাশাপাশি রেইকি-র সাহায্য নিয়ে আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। কোনও রকম জ্বালাযন্ত্রণা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য রেইকির জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে।

যেহেতু মানুশের দেহ মন আত্মা নিয়েই রেইকির কাজ তাই এতে কারও কোনও ক্ষতি হবার আশংকা নেই।

যিনি রেইকি শক্তি বা তরঙ্গ প্রদান করেন তাঁকে বলা হয় রেইকি চ্যানেল। ফার্স্ট ডিগ্রি রেইকির ক্ষেত্রে দু’দিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে রেইকি প্রশিক্ষক চারটি কোর্স করান। একে বলে শক্তিপাত বা অ্যাটিউনমেন্ট। কোনও শিক্ষার্থীকে শক্তিপাত করে রেইকি চ্যানেল তৈরি করে দেওয়ার পর সেই শিক্ষার্থী নিজের ইচ্ছানুসারে রেইকি শক্তি নিজেকে বা অন্য কাউকে প্রদান করতে পারেন।

ডক্টর উসুইয়ের মতে ‘রে’ হল ব্রহ্মান্ডীয় বা ঐশী শক্তি আর ‘কি’ হল জীবনী শক্তি। রেইকি শিক্ষার্থীরা দাবী করেন, রেইকি হল একটি সুসংগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন রেইকি চ্যানেল জগতের যে কোনও জায়গায় থাকা যে কোনও মানুষের ওপর রেইকি প্রয়োগ করতে পারেন। যদি বিশেষ স্তরে বৈদ্যুতিক আবেশ বিসর্জিত করা যায় তাহলে তা আলোর থেকেও দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সে কারণে দূরে থাকা রোগাক্রান্ত মানুষকেও রেইকি শক্তি দিয়ে হিলিং করা সম্ভব।

এ কারণেই ডক্টর উসুই রেইকি শক্তিকে স্বয়ংচেতন, স্বনির্দেশিত ও স্ববিবেকী বলেছেন। তাই রেইকি মানে শুধুই স্পর্শ চিকিৎসা নয়। এর কাজ আরো ব্যাপক। প্রথাগত চিকিৎসার সঙ্গে এর কোনও বিরোধ নেই। স্বতন্ত্রভাবে রেইকি একজন মানুষকে সুস্থ করে তুলতে সক্ষম। আবার যে মানুষটি ওষুধ খাচ্ছেন তিনি তার পাশাপাশি রেইকি অনুশীলনও করতে পারেন, তাতে তিনি আরও দ্রুত সুস্থ হবেন। এতে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও দুটো হাতের করতল ছাড়া অন্য কোনও কিছুরই প্রয়োজন হয় না।

(উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এ পূর্বপ্রকাশিত)

37

Leave a Reply