Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : মধুবন্তীর শরীর

বিপুল দাস

এক

 

মধুবন্তীর সঙ্গে আমার এখনো শরীরের সম্পর্ক হয়নি। মধুবন্তী আমার মন্ত্রপড়ে বিয়ে করা বউ। তবু আমি জোর করিনি। জোর করে, ভয় দেখিয়ে ডাকাত কিংবা ওপরওয়ালা অনেক কিছু কেড়ে নেয়। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল জোর দেখালে আমি ভিখারি হয়ে যাব।  ইচ্ছে হয়, কোনও কোনও রাতে এমন প্রবল রতিবাসনা জাগে, ভিখারির চেয়েও ভিখারি হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এই শরীর, বেইমান শরীর, সঙ্গমকাতর কুকুরেরও অধম হয়ে যায়। বেডরুমের লাগোয়া আমার স্টাডি থেকে উঠে বিছানায় মধুবন্তীর শরীরের কাছে যেতে ইচ্ছে করে। স্টাডিতে পেতেরাখা ছোট্ট ডিভানের বিছানা ছেড়ে উঠি। জল খাই একগ্লাস, বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাই। শহরের স্কাইলাইন দেখি। নতুন টাউনশিপের আলো আকাশের ধুলোবালিতে লেগে একরকম হলুদ আলো হয়ে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসে। এ শহরের ওপরে যে আকাশ, সেখানে কালপুরুষ বা লুব্ধক দেখা যায় না। মলিন একটা আবরণ দিনরাত আকাশকে ঢেকে রাখে। ব্যালকনি থেকে নিচে তাকিয়ে দেখতে পাই তারকের মোটর ট্রেনিং স্কুল, পিয়ালির বিউটি পার্লার, হাজি মিট শপ, তপনের বই-এর দোকান। পুবে, আকাশ যেখানে নতুন টাউনশিপের দিকে নেমে গেছে – দিগন্তে মৃদু আলোকবিন্দু দেখা যায়। বুঝতে পারি ওগুলো অনেক উঁচু উঁচু বিল্ডিং-এর রাতজাগা কোনও ফ্ল্যাটের আলো। সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে ছড়িয়ে পড়ছে। আমার চোখের সামনে ক্রিস্টালের মত মণির ভেতর দিয়ে রেটিনা হয়ে মাথার পেছনে অপটিক সেন্টারে উত্তেজনা তৈরি করছে। আমি দেখি নতুন শহরের আলো।

মধুবন্তীর মুখের কশ গড়িয়ে লালা নেমে বালিশ ভিজে উঠেছে। আমি কি সাবধানে বালিশ পালটে দেব। তখন যদি সেদিনের মত মধুবন্তী চমকে জেগে ওঠে, আমার দিকে নিষেধের আঙুল তুলে হিসহিস করে ওঠে।

 

এ কী! কেন এসেছেন এ ঘরে ? এই বিছানার পাশে। আমি পারব না,  প্লিজ…

 

তুমি ঘুমোও। আমি দেশলাই খুঁজতে এসেছি।

 

          মধুবন্তী অবিশ্বাস নিয়ে আমার চোখের দিকে তাকাল। ম্যাক্সি টেনে পায়ের গোছ ঢাকল। চাদর টেনে বুক ঢাকতে চেষ্টা করল। ঘরের হালকা নীল আলোয় ওর মুখের পাশে গড়িয়ে আসা লালা অস্পষ্ট বোঝা যায়। আমি মিথ্যে দেশলাই-এর কথা বলি আমার নতুন বউকে। একটা কাঠির মাথায় মিথ্যে আগুনের কথা ভাবি। মধুবন্তী আমার নতুন বউ, যার সঙ্গে আমার গত একমাসেও কোনও শরীরের সম্পর্ক হয়নি। ফুলশয্যার রাতে মধুবন্তী আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করলে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল ও খুব লাজুক, মনে হয়েছিল স্বাভাবিক আড়ষ্টতা, এখনই ঘুঁচে যাবে।

 

আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি চেঞ্জ করে একটু বাদে শোব।

 

ডানদিক থেকে দ্বিতীয়টা বাথরুমের সুইচ। আমি বলেছিলাম।

 

আমার একটু দেরি হবে। আর … একটা কথা। আপনি ইচ্ছে করলেই জোর করে আমার শরীরটা পেতে পারেন। আইনত আপনার অধিকার আছে। কিন্তু, প্লিজ, আপনাকে আমার ভালোমানুষ বলেই মনে হচ্ছে, আমাকে ক’টা দিন সময় দিন। আসলে আমি ঠিক তৈরি নই, আমার একটু অসুবিধা আছে।

 

                আমি থমকে গেছিলাম। একটা ঠান্ডা বাতাসের স্রোত আমার হাড়মজ্জা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই যেবার শোভন আর গীতাংশুর সঙ্গে রায়মাটাং-এর বনবাংলোতে ডিসেম্বরের ছুটিতে গিয়েছিলাম,  কালচিনি থেকে গাড়ি ভাড়া করে যখন রিসর্টের সামনে নামলাম – কনকনে একটা ছুরির মত হাওয়া এসে আমাদের সোয়েটার, উইন্ডচিটার ভেদ করে হাড় কাঁপিয়ে দিয়েছিল – তেমন একটা ডিসেম্বরের হিম বাতাস আমার সব শুকনো পাতা ঝরিয়ে দিল। সেই হিমেল স্রোত আমার মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল। নেমে যাওয়ার সময় আমার জেনিটাল এরিয়া গ্রস্ত হয়। ফুলশয্যার রাতে আমার নতুন বউ-এর পাশে দাঁড়িয়ে আমি শিথিল হতে থাকি। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারি না মধুবন্তীর পিরিয়ড চলছে কিনা, না কি এই বিবাহে তার আপত্তি ছিল, তীব্র প্রতিবাদ ছিল। হয়তো আমাকে কোনও কারণে অপছন্দ হলেও চিরজীবনের সঙ্গী করতে বাধ্য হয়েছে। মধুবন্তীর জীবনে কি অন্য পুরুষ আছে। কিন্তু পিরিয়ড হলে আমাকে ‘আপনি’ বলবে কেন। আমার জীবনে প্রথম সঙ্গমের অভিজ্ঞতা হতে পারত – সেই সম্ভবনা নষ্ট হয়ে গেলে আমার মনে হয়েছিল – ঠিক আছে, জোর করলে ভিখারি হয়ে যাব। তার পরেই মনে হল– যদি বলি, মধুবন্তী কি বিশ্বাস করবে আমার কোনও এক্সপিরিয়েন্স নেই। আমার বন্ধুদের ভেতর একমাত্র আমারই নেই।

 

দুদিনের জন্য ডুয়ার্সের ফরেস্টে একটা ট্রিপ করব, যাবে ? মধুবন্তীকে একদিন বলেছিলাম।

 

কোথায় ? আমার দিকে ভুরু কূচকে তাকিয়েছিল মধুবন্তী।

 

রায়মাটাং। ভুটান বর্ডারের কাছে। কালচিনি থেকে মাত্র সতেরো কিলোমিটার। ভীষণ নির্জন। ইলেক্‌ট্রিসিটি নেই, সোলার ল্যাম্প। আমরা যেবার গিয়েছিলাম, সোলার ল্যাম্পও জ্বালাইনি। দুটো লন্ঠন দিয়েছিল পুষ্পরাজ ছেত্রী। সেগুলো ঘরে রেখে অন্ধকারে বারান্দায় বসে থাকতাম।

 

আপনার সঙ্গে আর কে ছিল ?

 

আমরা তিন বন্ধু। আমি, শোভন আর গীতাংশু। রিসেপশনের দিন আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম, তোমার মনে নেই। ধুতিপাঞ্জাবিশালদাড়ি – গীতাংশু, শোভনের জ্যাকেট ছিল। খুব কম ট্যুরিস্ট যায় ওখানে। নিরিবিলি জায়গা, হইহট্টগোল নেই। চারপাশে পাহাড়ি উপত্যকা, এখানে ওখানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটা ঘর। বনবস্তির লোকজন থাকে। জায়গাটা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। একটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের, একটা প্রাইভেট রিসর্ট, ব্যস। আমার কাছে পুষ্পরাজের নাম্বার আছে। বুকিং করব, তুমি বললে। হানিমুন করতেই সবাই যায়। আর যায়, মস্তি … ইয়ে, মানে ফুর্তি করতে যায় অনেকে। পার্টনার নিয়ে যায়।

 

দুটো আলাদা রুম, সিংগল বেডেড … যদি হয়, দেখুন। আচ্ছা, আপনি জানেন ওখান থেকে আলিপুরদুয়ার কাছে ?

 

হ্যাঁ, কালচিনি থেকে দুটো বা তিনটে স্টেশন বাদেই। তুমি কি করে জানলে ?

 

আমার বন্ধু রিখিয়া আছে ওখানকার কলেজে। অনেকবার যেতে বলেছে। আমি কোনও দিন নর্থবেঙ্গলে যাইনি। ওখানকার গ্রীনারি …

 

          কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মধুবন্তী রাজি হয়েছিল। হয়তো প্রথমে ভেবেছিল নির্জন কোনও জায়গায় ওকে নিয়ে যাওয়ার পেছনে আমার কোনও উদ্দেশ্য আছে। এই শহর থেকে, ওর চেনাজানা নিরাপদ সীমানার বাইরে গিয়ে আমি ওর শরীর অধিকার করতে চাইব। আমার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে শেষে বলেছিল সিংগল বেডেড দুটো আলাদা কামরা হলে যাবে। ওর চোখে এখন কোনও অবিশ্বাস ছিল না, কিন্তু এক ধরণের সতর্কতা ছিল। নিষেধের তর্জনীসংকেত ছিল ওর চোখের তারায়।

দেখো, খুব ভালো লাগবে তোমার। বাংলোর বারান্দায় বসলে চারপাশে শুধু ঘন সবুজ। পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বাংলোর সামনের সরু পাহাড়ি পথ বেয়ে গরুছাগল চরাতে নিয়ে যায় নেপালি ছেলে। টুং টাং করে ওদের গলায় ঘন্টা বাজে। অনেক দূর থেকে সেই শব্দ শোনা যায়। ভুটান পাহাড়ের ওদিক থেকে একঝাঁক পাহাড়ি ময়না এসে তোমার সামনের শিমুলগাছে বসবে।

 

          বাইরে মধুবন্তী আমাকে ‘আপনি’ বা ‘তুমি’ কিছুই বলে না। না বলে যতটা সম্ভব কাজ চালিয়ে দেয়। একান্তে নিস্পৃহ, নিরাসক্ত উচ্চারণে এখনও ‘আপনি’ বলে। কিন্তু আমার মনে হয় এখন আর আমাকে আগের মত ভয় পায় না। বিছানায় কখনও ওর পাশে গিয়ে বসলে শিঁটিয়ে যায় না। এমন কী, অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে আমাকে খুব সুন্দর একটা লাইটার উপহার দিয়েছে। বলেছে – এটা রাখুন। দেশলাই খুঁজতে যখন তখন আমার ঘরে গিয়ে এখানে ওখানে হাতড়াতে হবে না। দেখলেই বোঝা যায় দামি লাইটার। সোনালী রং-এর। আমিও আজকাল মাঝে মাঝে কখনও রজনীগন্ধা, কখনও গ্ল্যাডিওলা বা গোলাপ এনে ওর ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজিয়ে রাখি। আমার স্টাডি আর ওর বেডরুমের মাঝের দরজা ইদানীং আর মধুবন্তী বন্ধ রাখছে না। কিন্তু আমি জানি, তার মানে এই নয় যে, নিষেধ শিথিল হয়েছে। মধুবন্তী হয়তো বুঝতে পেরেছে আমি জোর করে ওকে, মানে ওর শরীর অধিকার করতে চাইব না। আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা মধুবন্তীর নিজেরও কি শরীরের কামনাবাসনা নেই। ও কি ফ্রিজিড। কিন্তু এ বিষয়ে আমি কেমন করে ওর সঙ্গে কথা বলব। বরং একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা দরকার। আমি শুনেছি সুস্থসবল, স্বাভাবিক যৌনচাহিদা – সে রকম মানুষ হঠাৎ কোনও শক পেলে ফ্রিজিড হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য প্রথম থেকেই ঠান্ডা হয়। আমার মাথায় অন্য একটি সম্ভাবনার কথা হঠাৎ চিড়িক্‌ করে উঠল। মধুবন্তী কি পুরুষদের পছন্দ করে না। লেসবিয়ান নাকি। তা হলে এ বিয়েতে রাজি হল কেন। স্বকামী যখন, নিজের পছন্দসই সঙ্গী বেছে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিলেই পারত। এই সংকট তৈরি হত না আমাদের সংসারে।

          রায়মাটাং-এর কথা বলতে বলতে আমি একটু বেশি আবেগপ্রবণ, মানে, যাকে বলে ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। আমার চোখে সেই কতকাল আগে দেখা ভুটান পাহাড়ের ঘন সবুজ ভেসে উঠছিল। পুষ্পরাজের লজ ‘অরণ্যমহল’, শোভনের মাতাল হয়ে মোবাইল খুলে দীপার মেসেজ দেখানো, ডায়ামন্ড নামের একটা সাদা পাহাড়ি কুকুরের কথা, গীতাংশুর ‘শিপ্রা, শিপ্রা’ বলে কান্না – সব মনে পড়ছিল।

          হঠাৎ থেমে গিয়ে মধুমন্তীর দিকে তাকিয়েছি। দেখি ওর ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ভাঙছে। নিশ্চয় আমার প্রকৃতিবর্ণনা শুনে মনে মনে হাসছে। চুপ করে গেলাম।

 

কবে যাওয়া হবে ? ওরা তো কম্বল দেবে ?

 

সব দেবে। রাইশাক খেয়েছ কোনও দিন ? কিন্তু মোবাইলের সিগন্যাল পাওয়া মুশকিল। চারপাশে পাহাড়, মাঝখানে একটুখানি টেবল্‌ল্যান্ড। মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গেলে কিছু করার নেই।

 

যাব।  

 

দুই

 

        আমি কি ভেবেছিলাম রায়মাটাং-এর নির্জনতায় মধুবন্তীর হিম আমি গলিয়ে দিতে পারব ? উঁহু, আমি শুধু একটা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। জানতাম পাশাপাশি দুটো কাঠের ঘরে আমাদের রাত কাটবে। কাঞ্ছা এসে দুটো ঘরে দুটো লন্ঠন  জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে। বারান্দায় বেতের চেয়ারে পাশাপাশি বসে অল্প কিছু কথা হবে আমাদের। বিকেল যত গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে যাবে, সামনের পাহাড়ে ততই রং-এর শেড পালটে যেতে থাকবে। হালকা সবুজ থেকে ঘন সবুজ, শেষে কালচে সবুজ হয়ে যাবে ভুটান পাহাড়। এস এস বি’র জওয়ানরা টহল দিয়ে ফিরবে। বিট অফিসার ফিরে আসবে রুটিনমাফিক রাউন্ড দিয়ে। পুষ্পরাজ বলবে চিতা এদিকে এলে কুকুরগুলো কুঁই কুঁই করে লুকোতে চায়, কিন্তু হাতি বেরোলে খুব ঘেউ ঘেউ করে ওরা। আর আমি অপেক্ষা করে থাকব কখন সমস্ত আকাশজুড়ে কোটি কোটি নক্ষত্র জ্বলে উঠবে। এখানকার বাতাসে ধুলো নেই, ধোঁয়া নেই, কী অসম্ভব উজ্জ্বল দেখায় তারাগুলো।

 

          গাড়ি থেকে নেমে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই কাঞ্ছা এসে আমাদের ব্যাগ ঘরে রেখে দিল। আমি মধুবন্তীর ব্যাগ দেখিয়ে অন্য ঘরে রাখতে বললাম। একটা বাইক নিয়ে পুষ্পরাজ এল। আড়চোখে মধুবন্তীকে দেখল একবার। সানগ্লাস পরে মধুবন্তী সামনের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি ফুল সোয়েটার পরে আছি, মধুবন্তীর শুধু একটা শিফন শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ। বার্গান্ডি ডাই চুল, শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছিল।

 

সর, একটা ঘর নিলেই পারতেন। এখানে কেউ কিছু দেখতে আসবে না। আর কিছু দোরকার হলে আগে বোলবেন। সোনধার পোরে কিন্তু কুছু পাবেন না।

 

          আমি চমকে উঠলাম। পুষ্পরাজ কি বুঝতে পেরেছে আমাদের ভেতর স্বামীস্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই। ও কি ভাবছে এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি জাস্ট ফুর্তি করতে এসেছি। মধুবন্তী আমার বিয়ে করা বউ নয় – ও কি তাই মনে করল ? শুধু লোকদেখানো আলাদা ঘর নিয়েছি।

          গরমজল দিয়ে গেছে। আমরা স্নান করে নিয়েছি। আর কোনও ট্যুরিস্ট নেই। এখানে এই একটাই প্রাইভেট রিসর্ট। কাঠের দোতলা, পাশাপাশি দুটো কামরা, মাঝে কোনও দরজা নেই। সিঁড়ির মুখে একটা বোগেনভিলিয়া। ফুলে ভরে আছে এখন। একপাশে অনেকটা খোলা বারান্দা। বেশ বড় ডাইনিং টেবল পাতা রয়েছে। আমরা দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। মধুবন্তী ওর ঘরে গিয়ে সম্ভবত শুয়ে পড়েছে। অনেকটা জার্নি। কালচিনির পরে দুটো চাবাগান পেরনোর পর শুরু হয়েছে উঁচুনিচু, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। তিনটে নদী পার হয়েছি। এখন শুকনো বালিখাত, বর্ষাকালে রায়মাটাং একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে যায়। বাইরে হাঁটতে বেরোবে কিনা আমি মধুবন্তীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। সন্ধের পর তো বাইরে যাওয়া বারণ। এই বারান্দায় বসে সময় কাটাতে হবে। মধুবন্তী বলেছিল বিশ্রাম নেবে।

 

          সন্ধ্যা নামছে। আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে গোরুছাগলের পাল নিয়ে বনবস্তির দিকে ফিরে গেল একটা বাচ্চা ছেলে। সামনে পাহাড়ের রঙ প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। অনেকদূরে কোথাও জঙ্গলের ভেতর থেকে নীল ধোঁয়া উঠছে। ডায়ামন্ড এসে আমার পায়ের কাছে বসল। দুপুরে ওকে দু’টুকরো চিকেন দিয়েছি। একটুখানি মর মর কমলাহলুদ আলো এসে পড়েছে বাঁদিকের পাহাড়চূড়ায়। ডায়ামন্ড লেজ নাড়ল। পেছন ফিরে দেখলাম মধুবন্তী জিনস্‌ আর একটা টকটকে লাল সোয়েটার পরেছে। আমার পাশের চেয়ারে এসে বসল।

 

একটু আগে এলে দেখতে পেতে কীভাবে পাহাড়ের কালার পালটে যাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া আছে, একটা টুপি পরলে পারতে।

 

তখন লোকটা ঘরের কথা কী বলছিল ?

 

কে, পুষ্পরাজ ? ও কিছু নয়। একটা মজার কথা বলছিল। অন্য রকম ভেবেছে।

 

কী, কী ভেবেছে ? কী বলছিল পুষ্পরাজ ? অন্য রকম মানে ?

 

বাদ দাও। তোমার শুনলে খারাপ লাগবে।  অস্পষ্ট একটা টুং টাং শব্দ শুনতে পাচ্ছ ? দলছুট কোনও গোরু জঙ্গল থেকে একা ফিরে আসছে। আসলে এখানে অনেকেই তো বান্ধবী নিয়ে আসে। দু’দিন নিরিবিলি ফুর্তি করে যায়। ঘর থেকে বাইরেই আসে না। বুঝতে পারেনি। তোমাকেও খারাপ মেয়ে ভেবেছে।

 

কী বললে ? মানে কলগার্ল টাইপের… মধুবন্তীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম অন্ধকারে ওর চোখদুটো জ্বলছে। দু’সেকেন্ড বাদেই উঠে দাঁড়াল। কিছু না বলে ওর ঘরে ঢুকে পড়ল। আকাশ হালকা অন্ধকার, সামনের পাহাড় ঘন অন্ধকার। আমার বাঁদিকের পাহাড়চূড়া দেখলে মনে হয় একটা ঈগলের সিল্যুয়েট। এখনই আকাশজুড়ে ঝলমল করে উঠবে অনন্ত নক্ষত্র।

 

একটু দরকার ছিল। মধুবন্তীর ঘরের দরজা একটু ফাঁক, মধুবন্তী আমাকে ডাকলে আমি বেশ অবাক হলাম। উঠে ওর ঘরে ঢুকে দেখি কম পাওয়ারের সোলার ল্যাম্প বন্ধ করে দিয়েছে। কাঞ্ছা লন্ঠন দিয়ে গেছিল। সেটা খুব কমিয়ে রেখেছে। জিনস্‌ খুলে একটা খাটো স্কার্ট পরেছে।

 

সোয়েটারটা খুলতে পারছি না, কোথায় যেন আটকে গেছে। তাকিয়ে দেখলাম সোয়েটার টেনে বুক পর্যন্ত তোলা। বাকিটা কি আমাকে টেনে খুলতে হবে – বুঝতে পারলাম না। গলাটা ছাড়িয়ে দাও। আমার গলা বন্ধ হয়ে এল। মধুবন্তী এই প্রথম আমাকে ‘তুমি’ সম্বোধনে কথা বলল। আমার ঠোঁট-চোঁয়ানো হাসি নিশ্চয় ও বুঝতে পারবে না। ওর পেছনে দাঁড়িয়ে গলা ছাড়াতে গেলে খ্যাস খ্যাস করে ও হাসল। ওভাবে নয়, সামনে থেকে খোলো। আমি ওর সামনে এসে সোয়েটার খুলে দিলে বুঝতে পারলাম ও প্রস্তুত হয়ে ছিল। কোনও অন্তর্বাস নেই মধুবন্তীর শরীরে। রাতে আমি একা শুতে পারব না। ভয় করবে। আজ আমি তোমার সঙ্গে শোবো। চিতার মত মধুবন্তী আমার ওপর ঝঁপ দিল। ফিসফিস করে বলল – মস্তি করব।

 

          না মধুবন্তী, আমি সারারাত তারা দেখব। লুব্ধক, কালপুরুষ, লঘুসপ্তর্ষিমন্ডলও স্পষ্ট দেখা যায় এখানকার আকাশে। আমি ঘেউ ঘেউ করে বলতে চাইছিলাম, যেন অন্ধকার ঘরে হাতির মত এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু শোনালো যেন কুঁই কুঁই করে বলছি – ও ডিয়ার, এমন পশ্চার কোথায় শিখলে গো। ফিরে গিয়ে গিয়ে তোমাকে একটা নেকলেশ দেব। আবার গর্জন হয় – না মধুবন্তী, আমাকে ভিখারির চেয়েও ভিখারি হতে বোলো না। আমি জঙ্গলের  সরু পথ বেয়ে অন্ধকারে একটা ঝোরার পাশে গিয়ে বসব। আমি উত্তরের আকাশে আলোয় গাঁথা প্রশ্নবোধক চিহ্নের শেষে অরুন্ধতিকে খুঁজব। চল, আমরা এখন বাইরে গিয়ে তারা দেখি। কী পরিষ্কার এখানকার আকাশ। মনে হয় কোনও পরমকিষাণ আকাশে মনিমুক্তার চাষ করে রেখেছে।

 

কী হল, এসো। আলো জ্বালিয়ে দেব ? ডু ইউ লাইক ইট ? কিছু নেই তোমার ব্যাগে ? সন্ধের পর কিন্তু কিছু পাওয়া যায় না।

 

          ফালতু দুটো ঘর নিয়েছি। এখানে ওসব কেউ খেয়ালই করে না। ভুল হয়ে গেছে, একটা হাফ-পাঁইট নিলে আমার দু’দিন হয়ে যেত। মনে হচ্ছে মধুবন্তী নামের এই মেয়েছেলেটাকে অফার করলে রিফিউজ করত না। তারপর ওকে আমি ইচ্ছেমত ব্যবহার করতাম।

কিন্তু আজ হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, উষ্ণ হয়ে উঠল ফ্রিজিড একটা মেয়ে।  আগ্রাসী কামুকতায়, নির্লজ্জ যৌনতায় যেন নগরের নটি হয়েছে মেয়েটা। যাক, লেসবিয়ান তো নয়।

 

 

 

89

Leave a Reply Cancel reply