Categories
কুলিক রোববার

পাঠ প্রতিক্রিয়া : হয় নাই ফেরা ( উপন্যাস)

ভাস্কর ঝা

১৯৪৭ সালে দেশভাগ হল এবং স্বাধীনতা পেলাম। নতুন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল পাকিস্তান।শুরু থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ পশ্চিম-পাকিস্তানের দ্বারা শোষিত, নির্যাতিত হতে থাকলো। বছরের পর বছর পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলতে থাকে।পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও বঙ্গবন্ধুকে সরকার গড়তে না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র করবার জন্য আন্দোলনের ডাক দেন।

‘হয় নাই ফেরা’ উপন্যাসে লেখক প্রিয়রঞ্জন পাল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সহায়-সম্বলহীন উদ্বাস্তুতে পরিণত হবার করুন কাহিনী এঁকেছেন। উপন্যাসটির মুখ্য চরিত্র পালসার কুন্ডু পরিবারের মা-মরা মেয়ে বুলবুলি। তার বাবা প্রমোদ তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। অকৃতদার কাকা বিনোদের আদরে সে বড় হতে থাকে। পাশের বাড়ির ‘নতুন বৌদি’র ভাই মৃগাঙ্কের সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই বাড়ি থেকে তাদের বিয়ের কথাবার্তাও পাকা হয়ে যায়। কিন্তু সেই সময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং মৃগাঙ্ক মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে। সে জানায় যে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে বিয়ে করবে।

খান সেনারা গোটা পূর্ব-পাকিস্তানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের সাহায্য করে রাজাকার বাহিনী এবং আলবদর। তারা বেছে- বেছে মালাউনদের এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের খুন করে এবং মেয়ে-বউদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায়। এরকম ভয়ের পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রায় এক বস্ত্রে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয় বুলবুলিরা।

এখানে উপন্যাসটির প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। ‘হয় নাই ফেরা’র আসল গল্প এবার শুরু হবে।

উপন্যাসটিতে লেখক প্রিয়রঞ্জন পাল অতি সুন্দর ভাবে বিভিন্ন চরিত্রগুলি নির্মাণ করেছেন এবং চরিত্রগুলিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঘটনাবলীর খুবই চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। ভাষা সহজবোধ্য এবং প্রতিটি অনুচ্ছেদ আকর্ষণীয়।হিন্দু-মুসলমানরা যে বহুদিন ধরে পূর্ব-পাকিস্তানে মিলেমিশে বাস করছিল তার বহু নিদর্শন উপন্যাসটিতে আছে। কেয়ামত শেখের মত লোকেরা বারবার নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই পরিবেশ নষ্ট করতে উদ্যোগী হয়। বিধবা-বিবাহ আইন সিদ্ধ হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুসমাজ যে তা মেনে নেয়নি তার নিদর্শন পাই শম্ভুর চায়নাকে বিয়ে করার ইচ্ছে তার পরিবারের কেউ মেনে না নেওয়ার ঘটনায়। এ প্রসঙ্গে বুলবুলির খেদোক্তি স্মরণীয়- “পুরুষ মানুষ বউ মরলে বিয়া করতে পারে, বাইচে থাকতেও পারে। কুনও দোষ নাই, যত দোষ সব মেয়েদের।” ভোলাপীরের জবানীতে লেখকের আত্ম-উপলব্ধির আভাস পাই: “যাগরে জমি ছিল তারাই না আবার পাইল”, “বিরোধীপক্ষরে মাথা তুলবার না দেওয়া সারা পৃথিবীর অসুখ।”

কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ এড়ানো গেলে ভালো হতো।পূর্ব -পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ সভায় কি বলেছিলেন তা জানা গেল না।

পরিশেষে বলবো- ‘হয় নাই ফেরা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকবে। গল্পের বাঁধুনি খুব সুন্দর। লেখক একের পর এক প্রসঙ্গে গিয়েছেন, কিন্তু কোনো প্রসঙ্গই বিরক্তির উদ্রেক করে না। উপন্যাসটি পড়তে শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত পাঠক থামতে পারে না। দেশভাগের পর পূর্ব-পাকিস্তানে থেকে যাওয়া সংখ্যালঘু হিন্দুদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে হলে উপন্যাসটি অবশ্যই পড়তে হবে। দীর্ঘদিন মিলে-মিশে থাকলেও কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ এই সম্প্রীতি নষ্ট করে দেয়। পরিণতিস্বরূপ মাতৃভূমি ছেড়ে যাদের উদ্বাস্তু হতে হয়, তাদের মনে বিদ্বেষের বীজ রোপিত হয়। বিভিন্ন মানুষ এই বীজকে বিভিন্নভাবে লালন করে এবং কখনো- কখনো তা বিষবৃক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ভাস্কর ঝা

120

Leave a Reply Cancel reply