Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি : ২৭

সাধন দাস

ভালোবাসি  

বোঁটায় আধফোটা কুঁড়ির মতো ঝুঁকে। পিঠে এক ঢাল চুল। একরোখা মনোযোগ। অঙ্কে একশো। ভোরের পাশবালিশ জড়িয়ে ভাবছি। দূরে কোথাও বেহালা বাজছে। অপূর্ব স্মৃতিশক্তি। নির্ভুল – ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, দাঁড়ি, কমা, ড্যাস পর্যন্ত অনর্গল। ক্লাশ ওয়ান থেকেই ফার্স্ট, ফার্স্ট। নিরবিচ্ছিন্ন ফার্স্ট …। টিউশন ছেড়ে এসেছি, তবু তাকেই ভাবছি। সারাদিন পবিত্র, সুখি লাগছে। কেনো?   

লাফ মেরে উঠি বিছানায়, ইউরেকা! ভালোবাসি তাকে। সে রূপা, শ্রীরূপা, ধীরূপা, অপরূপা, ক্লাশনাইনের ফার্স্টগার্ল রূপশ্রীকে, আমি ভালোবাসি।

লিখতেই উত্তর এলো। উত্তরে সারাচিঠিজুড়ে পুবে পশ্চিমে দক্ষিণে অদৃশ্য অক্ষরে খোদাই করা ভালোবাসি। দুরুদুরু বুকে ফের লিখলাম। তোমার একটা ছবি আর দীর্ঘতম চুলটি পাঠিও। 

বাড়িঘর দোকান পাট ধ্বংস করে যশোর রোড মহাসম্পদগামী হলো। আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাড়ানোর সরকারি কোপে রোডের ধারে রূপাদের কাপড়ের ছোট্ট দোকান গুটিয়ে বোঁচকা হয়ে গেলো। খাওয়া জোটে না। খিদের জ্বালা ভুলতে রূপা শরৎচন্দ্রের ‘পরিনীতা’ পড়ে। প’ড়ে প’ড়ে-  প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, শেষ থেকে প্রথম মুখস্থ করে ফেললো। ‘পথের দাবী’ শুরু করেছে। খেতে দিতে না পেরে মা পাগল হয়ে গেলো। বললাম- আমাদের বাড়িতে, জানিও না। মাকে নিয়ে বহরমপুর চলে এসো। এখানে ডাঃ হাসানকে দেখালে ভালো হয়ে যাবেন।

মা আর মেয়েকে রাখা হলো চাঁদুদের ( রৌরবের সম্পাদক) বাড়ি। সে রাতে আমিও থাকলাম। প্রথম এক ছাদের স্বাধীন ছায়ায় দু’জন। সারারাত বাইরের সিঁড়িতে, কথা আর কথা, সরকারি অত্যাচারের কুকথা, খেতে না পাওয়ার আকথা, নিঃশব্দ রক্তপাতের কান্নাভেজা কথা ওর বুক থেকে জমা হলো আমার বুকে। সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলাম। ছলছল চোখ, তবু শাসন ভরা দৃষ্টি। শক্ত মুঠোয় সরিয়ে দিলো আমার হাত। ভোর হয়ে আসছে। 

আগেরদিন সূর্য সিনেমা হলে অশ্লীল সিনেমা দেখানোর প্রতিবাদে ‘রৌরব’ (আমাদের শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন) আন্দোলন করেছে। সেখানে দু’জনেই ছিলাম। রূপা বললো- এই হাত উঁচু করে কাল অশ্লীলতার বিরূদ্ধে লড়াই করেছেন। ছিঃ! 

মেয়েরা বুঝতে পারে। লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। রূপা বললো- মাকে ডাক্তার দেখিয়ে কী লাভ, বলুন? বাড়ি ফিরে সেই, ‘খেতে না দিতে পারার’ অসুখ। আবার পাগল হওয়া। এ কোন ডাক্তারবাবু সারাবেন? 

54

Leave a Reply