Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার :নর্দান আয়ারল্যান্ড : ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সুন্দর-বৈচিত্র্যময় দ্বীপভূমি

উৎপল ঝা

পঞ্চম পর্ব

নর্থ আয়ারল্যান্ডের ডার্ক হেজেস থেকে রাজধানী বেলফাস্ট-এ।

বিকেল বিকেল ডার্ক হেজেস থেকে রওনা দিয়ে প্রায় ৮০ কিমি দূরে নর্থ আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট-এ পৌঁছালাম বিকেল সাড়ে ছ’টা কী সাতটা নাগাদ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, কখনও কখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টিও পড়ছে , রাস্তা বৃষ্টিস্নাত কিন্তু সন্ধের দেখা নেই । মনোরম বিকেলের আলো । ডাবলিন রোডে ( ডাবলিনগামী বলে সম্ভবত ) ETAP Hotel – এ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে । নিচের তলায় কিচেন এবং ছোট ছোট দুটি ডাইনিং রুম ভিড়ে ঠাসা । রিসেপশন কাউন্টারের গা-ঘেঁসে সঙ্কীর্ণ খাড়া সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেস্টদের বসবার ব্যবস্থা। এখানে এই প্রথম ছোট একটি টিভি চলছে দেখলাম। অল্পবয়সী কিছু যুবক-যুবতীও চোখে পড়ল , বোঝা যায় দূরদেশ থেকে এসেছেন । সেসব ছাড়িয়ে বাঁদিকের প্যাসেজের দু’পাশে পর পর ডরমিটরি ধরনের বেশ কয়েকটি ঘর । আমাদের জন্য দুটি ঘরে জিনিসপত্র রেখে একটু হাতমুখ ধুয়েই আমরা নিচে নেমে এলাম।

আজকের প্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত Black Cab – এ করে বেলফাস্ট শহরের Peace Walls বা শান্তি-প্রাচীর ঘুরে দেখা । শৌভিক আমাদের জন্য দুটি ক্যাবের ব্যবস্থা করেছিল ,সেই প্রশস্ত ক্যাবে বা ট্যাক্সিতে স্বচ্ছন্দে আমাদের সকলের ঠাঁই হয়ে গেল । দুই ক্যাব- চালকই খুব হাসিখুশি এবং ট্যুরিস্টদের প্রতি যত্নবান মনে হল ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগে নর্দান আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের জটিল রাজনৈতিক অবস্থার কথা সংক্ষেপে বলা দরকার, নচেৎ বিষয়টি পরিষ্কার হবে না । ইংল্যান্ডের প্রটেস্ট্যান্ট-শাসক উইলিয়াম থ্রি ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী- শাসক জেমসকে বয়নোর যুদ্ধে পরাজিত করে আয়ারল্যান্ড দখল করে । সামরিক শক্তিতে বলীয়ান প্রটেস্ট্যান্টরা জয়লাভ করলেও তারা ছিল সংখ্যালঘু, আইরিশ ক্যাথলিকরা সংখ্যাগুরু। ফলে শাসনব্যবস্থার স্বার্থে ব্রিটেন থেকে প্রটেস্ট্যান্টদের আগমন শুরু হয় এবং অনুগত প্রজার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতে থাকে, বা ব্রিটেনের উপনিবেশ গড়ে ওঠে । কিন্তু তারপরও ক্যাথলিকরাই সংখ্যাগুরু এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরোধীই থেকে যায় । এবং স্বাধীনতাকামী আইরিশ নাগরিকরা ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হওয়ার জন্য রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে ।

অবশেষে ১৯২০ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট-এর সিদ্ধান্ত অনুসারে আয়ারল্যান্ড-এর বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় উত্তরাংশে ব্রিটেনের অধিকারভুক্ত নর্দান আয়ারল্যান্ড এবং দ্বীপভূমির দক্ষিণ অংশে স্বাধীন স্বতন্ত্র দেশ আয়ারল্যান্ড । নর্দান আয়ারল্যান্ডের অধিকারে আসে ৬ টি কাউন্টি এবং আয়ারল্যান্ডের অধিকারে যায় ২৬ টি কাউন্টি । কিন্তু এই বিভাজনের পরেও নর্দান আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী সংখ্যাগুরু ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি থেকেই যায় । এবং প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী , আর্থিকভাবে সম্পন্ন, ব্রিটেনের অনুগত নাগরিকদের সঙ্গে এই অপেক্ষাকৃত অবহেলিত স্থানীয় অধিবাসীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ বজায় থাকে ।
ফলে দুই ধর্মাবলম্বী বিরোধী গোষ্ঠীর বসবাসস্থলের মাঝখানে গড়ে ওঠে প্রায় ২০ মাইল দীর্ঘ এক প্রাচীর ।

১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই প্রাচীর নির্মাণের পরে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে ঠিকই কিন্ত বিরোধের পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি । বরং এই প্রাচীর ক্ষোভের নানা চিহ্ন ফুটিয়ে রেখেছে , যদিও শুধুই ক্ষোভ নয়, নানা দেশের শিল্পকৃতির নানা উজ্জ্বল নিদর্শন দেখবার এবং আন্দোলনের ইতিহাস জানবার জন্য সারা পৃথিবীর ট্যুরিস্টদের অবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় উঠে এসেছে এই শান্তি- প্রাচীর। সেই প্রাচীরে নানা দেশের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের সমর্থনেও দেওয়াল লিখন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিহত শহীদদের কথাও ।

এই ক্লান্তিকর বর্ণনা আজ এখানেই থামানো যাক , বাকি কথা পরে ..

47

Leave a Reply