Categories
কুলিক রোববার

কুলিকরোববার :গল্প :পিতৃত্ব

ভাস্কর দাস

এমনিতে খুব একটা পড়াশোনা করি না  । আজ পুরানো বই পত্র গুলো একটু ঝাড়া মোছা করছিলাম । হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো ।  ফোনটা রিসিভ করলাম । ফোনের ওপার থেকে একটা আওয়াজ ভেসে উঠলো , ” চিনতে পারছেন?” আমি শাকালু বলছি  ।” থতমত হয়ে গেলাম  । সত্যিই চিনতে পারিনি । কণ্ঠস্বর তো চেনা মনে হল না  । সে আবার বলল ” ও দিন রাতে আপনি যদি উপকারটা না করতেন, তাহলে হয়তো মেয়ের মুখটা দেখতে পেতাম না ।”  হঠাৎ সবকিছু মনে পড়ে গেল । আমি বললাম, ” হ্যাঁ, হ্যাঁ ,মনে পড়েছে  । মেয়ে এখন কেমন আছে ? ” বলল,  “বেশ ভালো আছে । ডাক্তারবাবু বলেছেন,  “চিন্তার কোন বিষয় নেই।”   কথা শেষ না হতে হতেই সে বারবার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছিল  । আমি বললাম, ” বেশ ভালো লাগলো খবরটা শুনে  । দরকার পড়লে আমার ফোন  করবে । কোন সংকোচ বোধ করবে না ।”  এই বলে ফোনটা রেখে দিলাম ।

এক আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য siliguri neotia থেকে বাড়ি ফিরছিলাম ।   ডাক্তার দেরি করে আসার জন্য অনেক রাত হয়েছিল  । প্রায় দুদিন মেয়েটাকে পাশে পাই নি  ।  private car  ড্রাইভারকে একটু জোরে চালিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অনুরোধ করলাম l বেশ জোরেই গাড়ি ছুটছিল l হঠাৎ  অঝোরে বৃষ্টি শুরু হল । চারিদিক অন্ধকার । জনশূন্য রাস্তা । রাত্রি প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে । kishanganj থেকে প্রচন্ড  জ্যাম শুরু হলো l বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি আর গাড়ির ভিতরে প্রচন্ড গরম । প্রায় এক ঘন্টা পর জ্যাম কাটিয়ে, চাকুলিয়া রাস্তা হয়ে ডালখোলা ফিরছিলাম  । ভীষণ ক্লান্ত অনুভব হচ্ছিলো । খিদের চোটে পেট চুই চুই করছে । সমস্ত ক্লান্তি ক্ষণিকের মধ্যে কেটে গেল, যখন ভাবলাম বাড়িতে গিয়ে মেয়েটার মুখ দেখতে পাব ।  রাত্রি প্রায় দেড়টা বাজে । হঠাৎ বালিগরা পার হয়ে দেখলাম অন্ধকার রাতে একটি লোক কম্বলে তাঁর বাচ্চাকে জড়িয়ে  জনশূন্য রাস্তায় দ্রুত বেগে ছুটে যাচ্ছে  । ঠিক তার পেছনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সম্ভবত তাঁর স্ত্রী দৌড়াতে শুরু করেছেন । হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো । ঠিক এই রকম ভাবেই আমি আমার অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে স্কুটারে করে প্রথমে ডালখোলা হসপিটাল , তারপরে করনদিঘী হসপিটাল ছুটেছিলাম । বুঝতে অসুবিধা হলো না ওরা মেয়েকে নিয়ে চাকুলিয়া হসপিটালের দিকে ছুটছে l প্রায় 6 কিলোমিটার দূরত্ব এই রাতে পায়ে হেঁটে যাবে। এই ভাবনা গুলো যখন মাথায় ঘুরপাক করছিল , ততক্ষণে আমাদের গাড়ি  প্রায় 500 মিটার অতিক্রম করেছে । আমি তৎক্ষণাৎ ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললাম  । সে কিছুটা অবাক হয়ে গেল । বললাম,” ভাই গাড়িটা ঘুরা। ওই মহিলা এবং লোকটাকে একটু চাকুলিয়া হসপিটালে পৌঁছে দেবো ।”  ড্রাইভার কিছুটা বিরক্ত বোধ করল কিন্তু আমার অনুরোধ সে প্রত্যাখ্যান করল না । গাড়িটা ঘোরালাম । বেশ কিছুটা দূরে সেই লোক এবং তার স্ত্রীর নাগাল পেলাম । তাদের পাশে যখন  গাড়ি থামল , ওরা কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো এবং কিছুটা ভয়ও পেয়েছিল । বললাম, ” আমি এলাকারই ছেলে l আপনাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছি ।” তৎক্ষণাৎ তারা গাড়িতে উঠে বসলো । মহিলাটি তখনও কান্নাকাটি করছে । আমি আশ্বাস দেওয়ার মত কিছু কথা খুঁজে পেলাম না । নিজের পরিচয় দিয়ে , শুধু জিজ্ঞাসা করলাম , ” কি হয়েছে ?” লোকটি উত্তর দিল ” তিন দিন ধরে মেয়ের জ্বর । হাতুড়ে ডাক্তার দেখিয়েছিল  , কিন্তু  কোন লাভ হয়নি । এখন এত রাতে বেশ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তাই রিক্স নিতে চাইনি ।” ইতিমধ্যে আমরা  চাকুলিয়া হসপিটালে পৌঁছে গেলাম  । কর্তব্যরত নার্সকে সবকিছু বুঝিয়ে,  তৎক্ষণাৎ ভর্তি করিয়ে দিলাম  । আসার সময় লোকটিকে বললাম, ” আমার ফোন নাম্বারটা রাখ । যদি কোন উপকার আসতে পারি, তাহলে ফোন করবে । আজ ফোন পেলাম । মেয়েটি  সুস্থ হয়ে উঠেছে । কিছুক্ষণ চোখ বুঝে থাকলাম আর ভাবতে লাগলাম,  বাবা হওয়ার দায়িত্ব টা বেশ কঠিন  । হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ  এল ” একটু এসোতো । মেয়ের মাথাটা  কেমন গরম  লাগছে । জ্বর এলো না কি আবার । ” 

ফোন রেখে দ্রুত ছুটে গেলাম……. ll

42

Leave a Reply