Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার গল্প : বিশুদার সাথে একটি কাল্পনিক সংলাপ

শ্রাবণী ভট্টাচার্য্য

সকালের চা টা আমি শিবুদার দোকানেই খাই।না,বরাবর নয়।এই সাত বছরের বেকার জীবনে সকালে ঘুম থেকে উঠে শিবুদার দোকানে চা খাওয়াটা আমার ভীষণ গুরুত্ব পূর্ন কাজে এসে দাঁড়িয়েছে।এখন আমি টোটাল ল্যাদখোর মাল।আমার সকাল ই হয় দশ টায়। এখন এই নিস্কর্মার জীবনে ফেস বুক ঘাটতে ঘাটতে ই রাত কাবার।তারপর সকাল হলেই বাবা র খ্যাচর খ্যাচোর। তার চেয়ে বরং শিবুদার চায়ের দোকান ঢের ভালো।তো সেদিন হয়েছে কি,বিশ্বকর্মা পুজো ছিল,আমি তো গেছি ১০ টার দিকে দোকানে।সবই চেনা মুখ।সব ফোন হাতে আমেরিকা,লন্ডন,মোদী ,মমতা,পেট্রোল ,গ্যাস,দুয়ারে,নুসরাত এই সব নিয়ে নিজ নিজ ভঙ্গিতে কপচাচ্ছে।আমি চা খেতে খেতে দোকানের ভেতরের দিকে উঁকি দিতে দেখি,টেবিলে বসে,খবরের কাগজে মুখ ঢেকে  এক সুপূত্তুর বসে আছে চা নিয়ে।সামনে আবার একটা হাতুড়ি। কেস টা কি?আমদানি তো নতুন লাগছে বস?কৌতূহল দমাতে না পেরে জল খাওয়ার অছিলায় লোকটার সাথে একটু পিরীত জমানোর চেষ্টা করি।খবরের কাগজ মুখের সামনে থেকে সরাতেই মুখটা যেন চেনা চেনা লাগে। অনুমানেই বলি,দাদা আপনি আমাদের বিশু দা না? মানে বিশ্বকর্মা?তা আজকে এই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে এমন ক্যালানে বদন নিয়ে চায়ের দোকানে বসে আছেন?বলি মণ্ডপে ভিসিট করবেন না?

তারপর আমাদের মধ্যে যা কথা হলো,তা আপনাদের জন্য যথাসম্ভব মেমোরি থেকে এনে টুকে দিচ্ছি।

বিশু দা: হ্যাঁ রে ভাই।বহুত খচে গিয়ে এখানে শেল্টার নিয়েছি বুঝলি?

আমি:তা এতো খচ লেন কেনো দাদা?বেশ তো প্যান্ডেল করে এই প্যান্ডেমিক এও আপনার পুজো করছে দেশের লোকজন,এতে তো আপনার খুশি হওয়ার কথা।

বিশু দা:(টেবিল এ জোর ঘুষি মেরে) শোন ,ওসব ন্যাকাপনা কথা,আমাকে শোনাতে আসিস না মাইরি। মট কা এমনিতেই গরম আছে, দেবো শালা হাতুড়ি দিয়ে এক ঘা।গোটা রাজ্যে কারখানায় বন্ধ,নতুন করে শিল্প নেই,আর শালা,মিস্ত্রি দের ঠাকুরের পুজো!

আমি: শিল্প নেই,এটা যেমন সত্যি দাদা,কিন্তু মানুষ কত খুশিতে আছে বলো,এই যে ধরো দুয়ারে

বিশু দা:চোপ,একদম কথা বলবি না। তোরা মাইরি এতো ভিখিরি সাজতে ভালো বাসিস জানলে এই দেশে পা ই রাখতাম না।

আমি:কিন্তু দাদা,আগেকার দিনে মুনি ঋষি রাও তো ভিক্ষা করতো,এটা একটা নোবেল প্রফেশন

বিশু দা:গুলি মারি তোর নোবেল প্রফেশন এর মুখে।আহা কিসে আর কিসে তুলনা! শোন আগেকার মুনি ঋষি রাও ভিক্ষা করতো,জ্ঞান দানের বিনিময়ে বুঝলি।ফ্রী অফ কষ্ট কিছু হয় না। ফ্রী তে কিছু পেলেই ওটা ভিক্ষা।কত আশা ছিল,তোদের নিয়ে। কল কারখানা হবে, বড় কারখানা কে ঘিরে ছোটো কারখানা,মানুষের কাজের সুযোগ, খেটে খাওয়া মানুষের মুখের হাসি।এই তো সেদিন ও তোদের শুদ্ধ বাবু চেষ্টা করেছিল বাই বাই দের একটা কারখানা ভঙ্গুর এ তৈরি করার।তোরা এমন কাণ্ড করলি,কি কিচাইন!

বাই বাই রা সেই যে পালালো,আর এ মুখো হয় নি।তোদের রানী তো বলেছিলো এই হবে,সেই হবে, বিউটি পার্লার হবে,এখন দেখ শালা।

দুয়ারে দরকার,কেটে পরে সরকার।উনি যাচ্ছেন,ঘুরছেন ফিরছেন,চ্যালা চামুণ্ডা নিয়ে,বিনিয়োগ আনতে।সেটা যে কোনদিকে আসছে সেটা আমি নিজেই দেবতা হয়েও দেখতে পাচ্ছি না। আহা,তোদের সেই সিঙ্গাপুরের কলা গাছ ফল দিচ্ছে,নাকি দুয়ারে ভাতের কলাপাতা হয়ে পাতা শিল্প হওয়ার অপেক্ষায় আছে?

আমি:ও বিশু দা,আমরা সাধারণ মানুষ ,আমরা কি করবো বলো

বিশু দা:(ধমকে) চোপ রও।একদম নেকু পুসু সাজবি না।সবদেশে ,সবকালে দেশের হাওয়া বেগতিক হলে ছাত্র ,যুব সমাজ গর্জে ওঠে।আর তোরা?ক্লাব এর টাকায় দু পেগ মেরে ,কি হবে ,কি হবে করে খানিক ধ্যাস্টামো করিস,তারপর বাপের হোটেল এ খেয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে সুরুৎ করে গর্তে ঢুকে গিয়ে যতসব অসভ্য মার্কা জোকস শেয়ার করিস,এটা ওটা সাইট খুলে রাত কাবার করিস।তোরা আবার মানুষ না কি।তোদের মান ও নেই,হুশ ও নেই।তোদের বিপ্লব ওই ডিজিটাল এই বন্দী।

যা যা তোরা চপ শিল্প, পকোড়া ইন্ডাস্ট্রি কর গিয়ে।আমাকে মেলা বিরক্ত করতে আসিস না।বিশ্বকর্মা র লোকেদের পেটে লাথি মেরে,ওদের জিনা হারাম করে দিয়ে আবার বিশ্বকর্মা কে পূজা করতে আসে?আরে বুঝি বুঝি।পূজা তো অছিলা।আমাকে একদিনের নামে এনে চারদিন মণ্ডপে বসিয়ে রেখে  ডি জে বাজানো,আর ফুর্তি করা।সব বুঝি বুঝলি।মিস্ত্রি হলে কি হবে।ওইটুকু টাওয়ার আছে আমার। দূর শালা,ভেবেছিলাম এখানে একটু শান্তিতে বসবো, তোর জ্বালায় তাও হলো না।

(এই বলে নিজের সাইকেলে চেপে সেই যে বিশু দা হাওয়া হলো আর তার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না).

86

Leave a Reply