Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি : ২২

সাধন দাস

গঙ্গা, নিঃশব্দ এক শব্দ   

ইন্টারভিউ-ক্যান্ডিডেটের দল, রাজধানী শহরের চূড়ো, ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের ষোলোতলায় দাঁড়িয়ে, দেশের দীর্ঘতম নদী গঙ্গা দেখছি, ইট কাঠ পাথরের ঘরবাড়ি, ধূসর গাছপালার ফাঁকে অস্পষ্ট, সরু জলরেখা; রোদ্দুরে চিকচিক করছে। সাততলায় পারসোনাল ডিপার্টমেন্টের গলিতে দাঁড়ানো গঙ্গার চোখের জলের মতো। 

দোষ, ও গঙ্গা! ঝাড়া এক ঘন্টা স্রেফ গঙ্গা বিষয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্নে ওকে রগড়ানো হয়েছে। বুঝে গেছে, চাকরি হবে না। 

ওরা খুব গরিব। অজগ্রামে মাটির বাড়ি। বন্যায় ভেসে গেছে। চেয়ে আছে নিজের নামের ধারার দিকে। নিঃশব্দ এক শব্দ। সান্তনা দিতে দল বেঁধে ওকে ছাদে এনেছি। 

এক দিদি, তাঁর নামও গঙ্গা, ছোটবেলায় এককোলে বই, এককোলে জড়িয়ে বেঁকে কাত হয়ে আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতো, কিছুতেই পালাতে দিতো না। তাঁকে কিলিয়ে, খামচে, চুল ছিঁড়ে চোখের জল বের করে দিতাম। তবুও সোনা ভাইয়ের গায়ে চুলের আঁচড় কাটতো না, কাউকে কাটতে দিতো না। স্কুলশেষে খেলতে খেলতে দু’জন বাড়ি ফিরলে দিদি আমাদের বাড়ি দু’মুঠো খেতে পেতো। 

বলতো- আমাদের পড়তে হয় না। তুই পড়বি, অনেক বড়ো চাকরি করবি।   

দিদির বিয়ে হলো অনেক দূরে, হরিহরপাড়ায়। গরিব না হলে অতোদূর বিয়ে হয় না। দিদি হারিয়ে গেলো। স্কুল থেকে ফিরি, একা। নদী পাড়ের পথে এলে দিদির কথা মনে পড়ে। কেঁদে ফেলি। চোখের জল ইছামতির জলে দিয়ে বলি- যা নদী, দিদির কাছে নিয়ে যা। 

কান্না- ইছামতি, জলঙ্গি, পদ্মা, হয়ে ভৈরবের দিকে ভেসে যেতো। 

হরিহরপাড়ায় জয়েন করেই দেখা করতে গেছি। 

উমনো ঝুমনো চুল। উলুঝুলু আধভেজা চেহারা, অকাল বৃদ্ধা দিদিকে দেখলাম, ভৈরবনদের ঘাট থেকে পাহাড় উঁচু পাড়ে উঠে আসছে। আমার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থমকে গেলো। চিনতে পেরে হাউমাউ করে কেঁদে হাঁচড়ে পাঁচড়ে মাটি আঁকড়ে উঠে এসে জড়িয়ে ধরলো। – সোনাভাই, তুই এসেছিস!  

দিদির ভিজে কাপড় বেয়ে চোখের জল নিঃশব্দে মিশে যাচ্ছিলো নদীতে। অনেক গল্পের শেষে বলেছিলো- আমাদের মাটির বাড়ি, মোটা চালের ভাত। তুই ব্যাঙ্কের দালানকোঠাতেই থাকিস। মাঝে মধ্যে একটু দেখা করে যাস। 

সাধন দাস,      

58

Leave a Reply