Categories
Special occasion

বিশ্বকর্মা পূজা : একটি স্মৃতিচারণ

দীপাঞ্জন ঘটক

আমার মতো যাদের স্কুল আর কলেজ জীবন রায়গঞ্জ এনবিএসটিসি বা উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার আশেপাশে কেটেছে, তাদের কাছে বিশ্বকর্মা পুজো কোনো উৎসবের থেকে কম ছিল না। বাবা পোস্ট অফিসে কর্মরত ছিল বলে আমার পড়াশুনা জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে পোস্ট অফিস কোয়ার্টারে। ঠিক উল্টোদিকেই হত এনবিএসটিসি-র বিশ্বকর্মা পুজোর বিশাল আয়োজন। কী ছিল না তাতে? সাজানো থাকত নানা যন্ত্রচালিত মডেল। উঠে আসত পুরাণের কাহিনি। দেখা মিলত পল্লীসমাজের চালচিত্রের। দেখা পাওয়া যেত ডাইনোসরেরও৷ সবটাই যন্ত্রচালিত। সবটাই সচল।

উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহনের বিশ্বকর্মা পুজোকে ঘিরে একটা বাড়তি উন্মাদনা ছিল রায়গঞ্জের বাতাসে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসতেন পুজো দেখতে। দুপুর গড়াতে গড়াতেই গ্রাম থেকে পিলপিল করে মানুষ এসে হাজির হতেন জেলা সদরের বুকে। যারা পূর্ব বা দক্ষিণের গ্রামগুলি থেকে আসতেন, তাদের প্রথম গন্তব্য ছিল উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন বা এনবিএসটিসি গ্যারেজ। কেউ আসতেন সাইকেলে। কেউ ভ্যান রিক্সায়। কেউ বা মোটর সাইকেলে।

ঠান্ডা জিলিপিরও একটা অন্য স্বাদ থাকে। স্বাদ থাকে মফস্বলের শরতের রাতের ঠান্ডা বাতাসের। কোথাও যেন আশেপাশে শিউলি ফুটেছে।

পোস্ট অফিস গেটের ভেতরে প্রশস্ত জায়গায় হত সাইকেল আর মোটর সাইকেল স্ট্যান্ড। সাইকেল ১ বা ২ টাকা। মোটর সাইকেল ৫। আলাদা করে মোটা কাগজে এক জোড়া একই সংখ্যা লেখা থাকত। সেই কাগজের একটি দিয়ে দেওয়া হত সাইকেলের মালিককে আর আরেকটি আটকে দেওয়া হত সাইকেল হাতলের সামনের দিকে ব্রেকের যে লোহা চেপে ধরা অংশটি থাকত, সেই অংশে। ফিরে আসার পর সংখ্যা মিলিয়ে সাইকেল ফেরত দেওয়া হত মালিককে। বিনিময়ে ১ বা ২ টাকা। পোস্ট অফিসের দুই অস্থায়ী বিহারি কর্মী মহঃ আস আর বিন্দেশ্বর রায়ের তত্ত্বাবধানেই চলত সেই সাইকেল স্ট্যান্ড। দু’জন সামান্য বেতনের অস্থায়ী কর্মীর এই সুযোগে কিছু বাড়তি রোজগারের সুযোগ আসত প্রতিবছর।

আসু কাকু আর বিন্দেশ্বর কাকুর তত্ত্বাবধানে এই সাইকেল স্ট্যান্ড চললেও তাতে মূল দায়িত্ব সামলাত তিন জন – আসু কাকুর ছেলে রাজু, বিন্দেশ্বর কাকুর ছেলে অরবিন্দ আর আমি। বিকেলের পর থেকে মানুষ দেখা আর সাইকেল স্ট্যান্ড সামলানো ছিল আমার ছাত্রজীবনের অন্যতম বড় কাজ। ভালো লাগত। নিজেকে যথেষ্ট দায়িত্বশীল মনে হত সেই বয়সে। ফি বছর লেগে থাকত একটা নিরলস কর্মব্যস্ততা। সাইকেল সাজিয়ে রাখা, উচিৎ দূরত্বে রাখা যাতে একটা আরেকটার গায়ে পড়ে না যায়, নাম্বারিং করা আর শেষে টাকা নেওয়া ছিল এই কর্মব্যস্ততার মূল অংশ। যদিও এই অর্থের কোনোটার ওপরই ছোটদের কোনো অধিকার থাকত না।

কাজের ফাঁকে সময় মিলত গেটে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখার। সন্ধেবেলা গ্রামের সানগ্লাস পরা উঠতি যুবক মুখে পান ভরে হেঁটে যেত নিজের ছন্দে। গায়ে লাল জামার খোলা বোতামের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারত সেইসময়কার হৃত্বিকের ‘এক পল কা জিনা’ গানের মতো ফুটো ফুটো স্যান্ডগেঞ্জি। ওরা শহরে এসে লাইট দেখত আর শহরের মানুষ দেখত ওদের। হাসির রোল উঠত মেয়ে-বৌদের মধ্যে। রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের হাস্যরত চোখ এড়িয়ে এগিয়ে যেত গ্রামীণ যুবক।

সন্ধে একটু গভীর হলে ভীড় কমত গ্রামীণ মানুষের। রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত শহুরে পরিবার। তখন আর সাইকেলের ভীড় নেই। পায়ে পায়েই মেপে নেওয়া যেত শহর। পোশাক দেখেই বোঝা যেত দুর্গাপূজার ‘ট্রায়াল রান’ চলছে রাস্তায়। আমি সাইকেল স্ট্যান্ড ছেড়ে হাজির হতাম জয়দের দোকানের সামনে। সেখানে তখন আইসক্রিম আর কোল্ড ড্রিংকসে মজে শহুরে পরিবার। একেকটা জিনিসের একেকরকম দাম। তার ওপর যোগ হয়ে যেত ফ্রিজের চার্জ। মফস্বলে তখন ফ্রিজের জন্যও আলাদা মূল্য ধার্য করত দোকানদার। সবটা আয়ত্ত্ব করে উঠে পারতাম না আমি আর জয়। তাই আমরা তখন শুধুই দর্শক। চাহনিতেই মেপে নিতাম সবটা। সবটাও চাহনিতে মেপে নিত আমাদের।

রাত একটু গভীর হলে মেলার দোকানদার গোটাতে শুরু করত তাদের পসরা। শেষবেলায় ফুচকায় এক্সট্রা ফাউ আর কম দামে জিলিপি খেতে হাজিরা দিতাম আমি। জিলিপির প্যাকেট হাতে ধরে আরও একবার ঢুকে যেতাম গ্যারেজের ভেতর। ভীড়হীন শেষবেলায় পুরোটা আরও একবার কাছ থেকে দেখে নেওয়ার লোভে জুড়িয়ে যেত জিলিপি। ঠান্ডা জিলিপিরও একটা অন্য স্বাদ থাকে। স্বাদ থাকে মফস্বলের শরতের রাতের ঠান্ডা বাতাসের। কোথাও যেন আশেপাশে শিউলি ফুটেছে। ভীড়ের মধ্যে সেই গন্ধ নাক অবধি আসেনি এতক্ষণ৷ শিউলির গন্ধ, ঠান্ডা বাতাস আর ঠান্ডা জিলিপি নিয়ে আমি বাড়ি ফিরছি। পুজো আসছে। বাবা এখনও বোনাস পায়নি। তবু… পুজো আসছে। মার্চেন্ট ক্লাব মাঠের পুজো প্যান্ডেলের বাঁশ পড়বে শিগগিরই।

109

Leave a Reply