Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি : ২১

সাধন দাস

ওজন সর্বস্ব জীবন 

চাকরি পেয়ে পেটে নেওয়াপাতি শাঁস হয়েছে। 

বাবা বললেন- পুরুষ মানুষ, কাজ করতে গিয়ে চর্বি! ছিঃ!! হাঁটতে তো পারিস! 

অগত্যা অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটি। তবু ওজন বেড়েই চলে।  

চাকরি পাওয়ার মেডিকেল টেস্টের সময় শুকনো চিঁড়ে, পাকাকলা, আর গণ্ডুষ গণ্ডুষ জল গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে, পেচ্ছাব পায়খানা না করে, ঘাম না মুছে, বিয়াল্লিশ কেজি হয়েছিলাম। বাবার বয়সি ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, বারো কেজি সর্ট। আনফিট। 

ছলছল চোখে বলেছিলাম- গরিবের টেনশন, স্যর। চাকরি পেয়ে, না পেলে ওজন আরো কমে যাবে। 

ডাক্তারবাবু নিঃশব্দে হাসলেন। 

দূরে চার্চের ঘড়ি দেখিয়ে বললেন- ক’টা বাজে? 

জেনেছিলাম, এটা জিজ্ঞেস করবেন। বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া হাতঘড়ি চার্চের সঙ্গে মিলিয়ে ঢুকেছি, চুপি চুপি কবজি উলটে বলেছিলাম- বারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি। 

ডাক্তারবাবু ঠোঁট টিপে বললেন- হাতের ঘড়িতে নয় চার্চের ঘড়িতে। চিটিংও শিখেছো।   

ধরা পড়ে কাচুমাচু। চোখ থেকে চশমা তুলে নিলেন। 

– শেষ কবে চোখ দেখিয়েছো। 

– ক্লাস নাইনে। 

– চশমা নিয়েছো কবে? 

– ক্লাস নাইনে। 

– ব্যাঙ্কের চাকরি। চোখেও আনফিট। 

মাথা নিচু হয়ে এলো। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। – গরিবের চোখ স্যর। এক পয়সা কেউ ঠকিয়ে নিতে পারবে না। 

ডাক্তারবাবু কাঁধে হাত রাখলেন- নটি ইয়ং ইন্টেলিজেন্ট। ডোন্ট ওরি। ফিট লিখে দিচ্ছি। ছ’মাসে চাকরির কনফারমেশন হয়। তার আগে দেখিয়ে যাবে, নতুন চশমা, বাড়তি ওজন, আর শুনিয়ে যাবে নতুন জীবনের গল্প।

বাবার মতো ভেবে প্রণাম করেছিলাম। 

পুরনো জীবন অপেক্ষায় ছিলো। যাইনি। শোনাবার মতো জীবন তৈরিই করতে পারিনি। 

রিটায়ার করেছি।  বাবার কথা মনে রেখে হাঁটি। কিন্তু ঘাম বেরোয় না। ওজনে বয়সে বাহাত্তরে চলেছি। উচ্চতা একটুও বাড়েনি। উদর সর্বস্ব পুরনো জীবন নিয়ে কোনো বাবার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারিনি। হেঁটেই চলেছি। 

36

Leave a Reply