Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : সামাজিক

সোমা

আজ আবার শুরু হলো।
রোজ রোজ একই ঘটনা আর ভালো লাগে না। সুজয়, এবার একটা কিছু করতে হবে।
বুঝলে…!!

রোজ সকাল সকাল স্নান করে মন্দিরের দরজা খুলে ভক্তি..
ঝাঁই.. কাঁসর….
ঘন্টার ঢ্যং ঢ্যং….
আর তার সাথে বউ পেটানো নিয়ম করে !! মামদোবাজি নাকি…..?
ধর্মে সইবে না এই সব বলে টিনা গজগজ করছে।
আসলে টিনা সুজয় এক আবাসনে থাকে। কতগুলো আবাসনের মাঝে এই একটা মাত্র বাড়ি। সেটা প্রমোটাররা দখলে নিতে পারেনি। এক মন্দির সহ বাড়ি। জোরজারও করতে পারেনি এমনটাই জানিয়ে ছিল কেয়ারটেকার।

বাড়িতে কম করে ১০/১২ জন লোক। ছোটো বউ নেহা অত্যন্ত সুন্দরী। তার দুই মেয়ে। নেহার রূপটাই নাকি তার কাল।এমনটাই বলে আবাসনের অনেকে। তার বরের সন্দেহ বাতিকের কারণ তার রুপ।

যদিও প্রতিবেশীরা প্রচন্ড প্রতিবাদী। ঝামেলা হলেই আর তা বুঝতে পারলেই ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে বাড়িতে এসে ধমকি চমকি চলে।

যদিও কথায় আছে, কুকুরের লেজ সোজা হয় না কখনো৷ এরা হলগে ঠিক বাঁকা লেজ টাইপ পাবলিক।

পাড়া প্রতিবেশীর অনুরোধে একবার এক সংগঠনের মহিলারা ঐ বাড়িতে এসেছিলো। ঐ পরিবারের আপ্যায়নে ঐ সংগঠনের মহিলারাও কিছুটা ভ্যাঁবাচ্যাঁকা খেয়ে যায়। নেহার কোনো অভিযোগ নেই নাকি তার স্বামীর বিরুদ্ধে । তার স্বামীর সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক…….
সবই তো ঠিক।
ওনারা বাড়ির এক ঘরে আড়ালে নেহার সাথে কথা বলেন।আশ্বস্ত করেন সব বলতে, ভয় নেই কোনো। যদিও নেহার কথায় তাদের কিছু মনে হয় নি সেবার। পরে যদিও তারা ভুল তথ্য পেয়ে আসার কারন দেখিয়ে ক্ষমা চেয়ে চলে আসেন।

এমনটাই গল্প করছিল বুলবুলের মা জয়া টিনার সাথে।

টিনা সেদিন বলেছিল, এরা আসলে সমাজ সমাজ করেই মরে। মার খাবে, লাথি খাবে তাও বর বর করেই মরবে।

আরে না না টিনা। এর থেকেও বড় সমস্যা অর্থ। মানুষ রোজগেরে হলে অনেক সিদ্ধান্ত সহজেই নেওয়া যায়। নেহার সেটা নেই। পড়াশোনাও বেশি জানে না।

এভাবেই বেশ কয়েক মাস বছর পার। মন্দির বাড়িতে যাত্রা পালা অল্প বিস্তর লেগেই থাকে। টিনাও আর এখন অতটা মাথা ঘামায় না সুজয়ের কাছ থেকে বারবার ঝাড় খেয়ে।

বেশ কিছুদিন পর খাওয়ার টেবিলে সুজয় টিনাকে বলছে খালি এদিক ওদিকের খবর রাখলে হবে? সারাদিন বাড়ি থাকো। বাচ্চার স্বাস্থ্য হচ্ছে না। বই পত্র গোছগাছ করো। সবি তো অগোছালো।
ফোনটা তোমার একদিন জলে ফেলে দেবো। রান্নার সময় মন থাকে না। কি করো? যতসব সমাজ সেবা….
তা কি হলো তোমার নেহার সেবা??

তোমার সংগঠনের লোকরা তো কাল এসছিলো ঐ বাড়িতে আবার। কি বললো?
টিনা আগের কথা গুলো ভুলে বলতে শুরু করলো..

এরা এভাবেই মার খাবে। মরবে। কিন্তু মুখ খুলবে না। মরুকগে। আমার কে হয়? সহ্য হয়নি তাই ফোন করেছিলাম। মুখ যখন খোলেনি তখন বুঝুকগে……..

আমি হলে বুঝিয়ে দিতাম কত ধানে কত চাল। বউএর অসম্মান করা বের করে দিতাম।

এই কথা শুনে সুজয় টিনার দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করলো।
সে রাতে টিনার ঘুম হয়নি। সে খালি ভাবছিলো, ঠাকুর বলেও তো কিছু হয়। তাহলে সে কিছু করছে না কেনো? পর দিন সকালে চিৎকারে টিনাদের ঘুম ভাঙলো। মন্দিরে আরতি চলছে। ঝাঁই, কাসর বাজছে। ছোটো জানোয়ারটা ধুতি পড়ে বৌ কে উদোম পিটিয়ে বারান্দায় ফেলে দিয়েছে। বড়ো বৌ আজ প্রথম বার একটা বাঁশ এনেছে পাষন্ডটাকে পেটাবে বলে। তাকে মাগী,শালী চরিত্রহীন বলে গালাগালি করে মন্দিরে ঢুকে যায় নেহার পতি পরমেশ্বর। আজ যদিও এখানেই থামলো না। তবে আজ প্রথম থেকে টিনা সব রেকর্ড করছিলো ওর ফোনে। এখানে এবার একটু ছন্দপতন ঘটল। টিনার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো সুজয়। এবং ধমক দিয়েই বলল কি দরকার অন্যদের বিষয়ে মাথা ঘামানোর? আমি অন্যের বাড়ির ঝামেলার কথা রোজ শুনতে চাইনা। এসব বন্ধ করো। ভালো না লাগলে জানালা বন্ধ রাখো। তখনি একটা বিশাল জোরে আওয়াজ। মন্দির থেকে একটা আস্ত কাচের বয়াম ছুড়ে মেরেছে শ্রীমান তার বউ কে। তবে কথায় আছে, রাখে হরি তো মারে কে.. নেহার মাথার এক হাত দূরে বয়ামটা ভাঙলো। অল্প বিস্তর আঘাত তার লাগলো। তবে আজ প্রথম নেহা চিৎকার করে বললো, “….. জিস হাত সে হরি পুজা উস হাতসে মার রহে হো। ও হাতহি নহী রহেগা।”

তবে আজ দ্বিতীয়বার টিনার মন অশান্ত । সুজয় ফোনটা কেড়ে ভালো করেনি।টিনা আজ অপমানিত। একজনের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। সুজয় বলছে জানালা বন্ধ রাখতে?? নেহা যদি আমার মতো একটু সাহসী হতো তাহলে হয়তো ভাবতে হতো না তাকে। সুজয়ের ব্যবহারটা টিনা হজম করতে পারেনি। সেদিনই টিনা বাপের বাড়ি চলে যায় কিছুদিন মায়ের কাছে থাকবে বলে।সুজয়ও রাজি হয়ে যায়। কিছু দিন আর নেহার কথা শুনতে হবে না ভেবে। সপ্তাহ দুয়েক পর ফিরে এসে টিনা একটু বদল দেখলো। পাশের বাড়ির পরিবেশ শান্ত। ভালো লাগলো। তবে একটু আশঙ্কা। নেহা… নেহা আছে তো? যদিও একটু সময় পর নেহার দর্শন পেয়ে টিনা শান্তি পেলো। ওর মনটা ভালো লাগছে। আসলে এই আবাসনে আসার পর থেকেই নেহা ও টিনার চোখে চোখে কথা হয়। হাসি, হাত নাড়িয়ে সায় দেওয়া প্রথম থেকেই। তাই ও নেহার প্রতি একটু দূর্বল। রাস্তায় একবার দেখা হওয়াতে টিনা নেহাকে বলেছিলো রোজ মার খাও একদিন পাল্টা দেবে। তাহলে বুঝবে কেমন লাগে…. শাড়ির আঁচল সরিয়ে পিঠ দেখিয়ে বলেছিলো দেখো তার ফল। টিনা দেখে আঁতকে উঠেছিলো। কিছু দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মনে হচ্ছিল। পড়ে আছো কেন এখানে এই অমানুষের সাথে?? পুলিশের কাছে যাওনি কেনো?

দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নেহা বলে, আপনে হিসাবসে ক্যা সবকুছ চলতা হ্যায়? সমাজ নামকা ভি কোই চীজ হোতা হ্যায়!!

তাহলে নিজের বাড়ি চলে যাও। নেহা হেসে বলেছিলো মেয়েদের আবার কোনো বাড়ি হয় নাকি…….

আজ সুজয় ফিরতেই টিনা বললো নেহাকে বোধ হয় আর মারে না। নেহা আজ আমাকে দেখে হাসলো। একটা শান্তি আছে মনে হলো হাসিতে। সব ঠিক হলেই ভালো। এতে বাচ্চা গুলোও ভালো থাকে। সুজয় টিনাকে চুপ করিয়ে বললো মারবে কোন হাতে? সেদিন তো তুমি চলে গেলে তোমার বাড়ি। রাতে নেহার বর মেশিনে খড় কাটছিলো। নেশা করেছিলো। খড়ের সাথে নিজের হাতটাও মেশিনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। কবজি পর্যন্ত পিস পিস।

নেহার কথা পাথরের মুর্তি শুনেছে তাহলে !!!

74

Leave a Reply