Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : নেমন্তন্নবাড়ি

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

কলাপাতা ওপরে মসৃণ আর গ্লসি হলেও তলে তলে সে ম্যাটফিনিশ। প্রতিটি আয়ত কলাক্ষেত্রের ওপরে থাকে মার্জিন, শক্তপোক্ত এক ডাঁটি, যা ফ্যানের হাওয়ায় পাত ছেড়ে উড়ে যেতে দেয় না কলাপাতাটাকে। কলা বলতে শিল্প বোঝে বাঙালি। কলাগাছ বলতে ক্যারমবোর্ডে গুটির পর গুটি সাজিয়ে একরকম খেলার কথাও জানতাম ছোটবেলায় যার একদম নিচের গুটিটাকে তাক করলে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বাকি সব গুটির বহুতল। দুগ্গাপুজোর সময় গণেশ ঠাকুরের বাঁ দিকে কলাবউও দেখে এসেছি জন্ম ইস্তক। তবে শিল্প-র চেয়ে মালপো যেমন বেশি সরেস তেমনি কলা মানেই হল কলাপাতা, আচার অনুষ্ঠানে চর্বচোষ্য খাওয়া।

আমাদের ছোটবেলার নেমন্তন্নবাড়িতে মেনুকার্ড থাকত না। এখনকার মতো দ্যাবা ওয়েডস দেবী লেখা কার্ড দেখে আগেভাগেই জেনে যাওয়া যেত না কী কী বস্তু আছে খাদ্যতালিকায়। তখন বিবর্ণ সানমাইকা লাগানো লম্বাটে কাঠের টেবিল থাকত। তার নীচে, দু’ধারে থাকত ত্রিভুজাকৃতি পায়া। তার দু’পায়ে লাগানো থাকত লোহার চেন। ব্যাচ শুরু হয়ে যেত, কিন্তু কিছুতেই ঠিকঠাক সেট করা যেত না সেই টেবিল। কাঠের চেয়ারগুলোও ছিল তেমন। ক্যাঁচকোচ করে নিজের উপস্থিতি জানান দিত তারা। একটু কায়দা করে আগুপিছু বসে ম্যানেজ করতে হত। বিরাট একটা কাগজের রোল হাতে চলে আসতেন পরিবেশনকারীর দল। অল্প জল ছড়িয়ে দিতেন। টেবিলের একপ্রান্তে রোলটি ধরে থাকতেন একজন। অন্যজন সেটা গড়িয়ে দিতেন অন্যপ্রান্তের শেষ সীমা অবধি। তার পর ঘ্যাঁচ করে একটা শব্দ। ব্যস কলাপাতা পড়ার আগেই তৈরি হয়ে যেত তার শ্বেতশুভ্র আসন।

এবার একজন ভেজা মাটির গেলাস হাতে চটপট চলে এসে প্রত্যেকের সামনে সেটা উপুড় করে রেখে যেতেন। যিনি জল দিতেন তাঁর কাজ ছিল গেলাসটাকে সোজা করে জল দেওয়া। কলাপাতা আসত তার পর। বাড়ির সবচাইতে ছোটরা দৌড়ে দৌড়ে এসে পাতে নুন আর লেবু দিয়ে চলে যেত। তা পড়ে থাকত বিশাল কলাপাতার এক কোণে।

প্রথমে পাতে পড়ত বেতের ধামা থেকে ফুলকো লুচি আর বোঁটাসমেত রোগা রোগা বেগুনভাজা। তার পর কিসমিস দেওয়া ডাল, ছানার কোপ্তা, আলুর দম। খাওয়া শুরু হত একসঙ্গে। যে যার মতো নয়, পাড়ার বয়স্ক একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলতেন, এবার তাহলে শুরু করা যাক। সেটাই ছিল রেফারির বাঁশি। খেলা শুরু হত তার পর।

তখন ভাতকে ভাত বলারই চল ছিল, রাইস বলা হত না কখনও। পরিবেশনকারীর কাছে গ্রেভি চাইত না কেউ, ঝোল লাগলে ঝোলই চাইত। ডাল বা ছ্যাঁচড়ার জন্য সাধারণ বালতি ব্যবহার করা হলেও মাছ মাংস পোলাও জাতীয় সম্ভ্রান্ত পদ পরিবেশন করা হত পিতলের বালতি থেকে। কাতলের পেটি না গাদা, মাংসের নলি না পাঁজর তা নিয়ে পরিবেশনকারীর সঙ্গে মনোমালিন্য হত একচোট। চাটনি, পাঁপড়ভাজা শেষ হতে না হতেই পাতে চলে আসত রসগোল্লা, সন্দেশ। শেষপাতে দই থাকবেই থাকবে। দধি-র অগ্রভাগ না পেলে বিমর্ষ হতেন অনেকে। তখনও আইসক্রিম আসেনি বিয়েবাড়িতে। শেষপাতে থাকত মিস্টি পান, কলাপাতায় সযত্নে মোড়া।

পরিবেশনকারীরা হতেন পাড়ার দাদা, বন্ধু কিংবা আত্মীয়েরা। কাজের বাড়িতে দেখা পাওয়া যেত এঁদের। কোমরে বকলসের স্টাইলে আটকানো থাকত খেটো গামছা। বড় বড় গামলাগুলো তোলার সময় সে জিনিস কাজে আসত। পরিবেশন করার সময় খুব ঘামতেন তাঁরা, তখনও নিশ্চয়ই লাগত। পরিবেশনকারীর দলে একজন থাকতেন ব্যান্ডমাস্টার, যিনি পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করতেন। তাঁর ভূমিকা ছিল অসীম। কতগুলি পাত পড়ল দুঁদে অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো সেই হিসাব কাগজে লিখে রাখতেন তাঁরা।

অনেক বাড়ির নিয়ম ছিল যখন যে আইটেম ঢুকছে সেটা একবার শুরুতে ব্যান্ডমাস্টারকে দিয়ে ব্যারিটোন গলায় বলিয়ে নেওয়া। যেমন – কাতল ঢুকছেএএ … কিংবা এবার কিন্তু চিংড়ির মালাইকারি আসছেএএ…। কোনও কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতে একেবারে শুরুতে আবৃত্তির ঢঙে একজন জানিয়ে দিতেন সেদিনের টিমলিস্টে কে কে আছে। সে সময় সকলে আপাত উদাসীন ভঙ্গি বজায় রেখে কান খাড়া করে পুরোটা শুনে নিতেন আর মনে মনে প্ল্যান ভেঁজে নিতেন, আজ কীসের কীসের ওপর দিয়ে যাবেন।

যিনি ব্যান্ডমাস্টার হতেন তিনি খেলা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যেতেন সেদিন কোন পদ খাইয়েরা বেশি টানবে, আর কোনটা বাসি বিয়ে অবধি থেকে যাবে। রক্তকরবীর রাজা-র মতো তিনি হুকুম করতেন অলক্ষ্য থেকে – পোলাওটা আর একবার ঘোরাতে হবে … কিংবা ভেটকি মাছের পাতুরিটা আর একবার দেখাবি …। এই ‘দেখানো’ ব্যাপারটা ছিল মারাত্মক গুপ্তভাষ্য। সে সময় নেমন্তন্ন বাড়িতে কোনও না কোনও নন ভেজ আইটেম শর্ট পড়তই পড়ত। বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনাপতি সেই ব্যান্ডমাস্টার আগেই বুঝে যেতেন, সেদিন কোন জাহাজ ডুবতে বসেছে, মাটন কোর্মা, না কি কলাপাতায় মোড়া ভাপা ইলিশ। সেটা বুঝেই তিনি দেখানো-র কথা বলতেন।

নিয়ম ছিল, সবচেয়ে দক্ষ পরিবেশক যিনি তিনি ধাঁ করে পঙতির একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে যাবেন। যারা তখনও মনস্থির করতে পারেননি খাবেন কী খাবেন না, মানে যাঁরা তখনও দোলাচলে মহাপ্রভু, তাঁদের মনের কথা মনেই রয়ে যেত, সেই সুস্বাদু পদটি ততক্ষণে উধাও। না পাওয়া প্রেমিকার মতো ভাপা ইলিশের জন্য তাঁদের মনে আফসোস রয়ে যেত দীর্ঘদিন। ‘দাদা ওঁর পাতে আর একটা পাতুরি দেবেন তো’ বলে চাতুরি করে নিজের পাতেও দু-এক পিস পাতুরি নিয়ে নিতেন কেউ কেউ।

তখনও প্যান্টাপ্রাজল বাঙালির ঘরে ঘরে ঢোকেনি। সে সময় কেউ মিস্টি খেতে গিয়ে এক ডজন দু’ডজনের কমে থামতেন না। কেউ খেতেন পঞ্চাশটা রসগোল্লা। কেউ থামতেন সত্তরে। বড়রা বলত, কে করেছে এমন ? আমাদের রমেশ ? তাহলে ঠিকই আছে। ও তো এমনই খায়। আসলে এরকমই তো মাপ ছিল সকলের। এখন আমরা মানুষকে চিনি ব্লাডসুগারের মাপ দিয়ে। ছোটকাকা দুশো আশি, রাঙামামি তিনশো চল্লিশ, বড়জ্যাঠা পাঁচশো দশ। সেসব দিনে অনেকদিন পর জামাই পাড়ায় এলে জিজ্ঞেস করতেন, নিতাইমামার খবর কী ? নিতাইমামাকে তাঁর মনে রাখার একমাত্র কারণ, তিনি গোটা পঞ্চাশেক সন্দেশ দু’কেজি দই দিয়ে মেখে খেয়েছিলেন তাঁর বিয়ের ভোজে।

তখন কোনও কেটারার ছিল না, ছিল না গার্ডেন চেয়ার, কাচের প্লেট। বাড়ির কর্তা যাবতীয় দায় বাইরের লোকের ওপর চাপিয়ে নিশিন্ত থাকতেন না। পাড়ার মানুষও একজোট হয়ে ভিড়ে যেত যজ্ঞিবাড়িতে। বিয়ের ক’দিন আগে থাকতেই বাড়ির ছাদে বসত ভিয়েন। সুখাদ্যের সুগন্ধ ছড়াত অনেক দূর পর্যন্ত। প্যান্ডেলে পাত পড়ত অগুন্তি লোকের। বিনা নিমন্ত্রণে বিয়ের দিন পাড়ার দু’চারজন হা-গরিব মানুষ এসে কুন্ঠিত মুখ করে খেতে বসতেন প্রথম ব্যাচে। তাঁদের ধরে উঠিয়ে দিত না কেউ। মেয়ে চলে যাওয়ার সময় মা কেঁদে ফেলতেন, পাড়ার কাকিমারাও কিছু কম কাঁদতেন না। সেই চোখের জলে মিশে থাকত আন্তরিকতার গন্ধ।

একান্নবর্তী পরিবারের ফের এক হওয়ার গল্প ছিল সেসব। যে পরিবার ভেঙে যাওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে তাকে জুড়ে দিত যজ্ঞিবাড়ি। দু’বছর পর দেখা হত দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের সমবয়সি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। হয়তো দূর প্রবাস থেকে এসেছেন ছোটপিসি, তাঁর আদো আদো বাংলা বলা কন্যা সমেত। সেদিন এদের সকলের পাত পড়বে একত্রে। পরিবারের সকলে একসঙ্গে খাবেন।

সম্পর্কের টেনশন তখনও ছিল, মামলা মোকদ্দমার চোখরাঙানিও থাকত, পরদিন থেকেই হয়তো অন্যের সাফল্যে ঈর্ষায় চিড়বিড়িয়ে উঠবে আর একজন, শরিকি বাড়ির ভাগ নিয়ে শুরু হবে নোংরামি, কিন্তু সেদিন সকলেই যেন এক শক্তপোক্ত পরিবারের সদস্য। খেতে খেতে একজন বলে ওঠেন, ওর পাতে আর একটা মাছ দে। কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়ে স্কুলপড়ুয়া ভাইপো ভাইঝিরা। গোলাপ হাতে ছুটে বেড়ায় খুদেরা। তাদের কোনও একটাকে ধরে বড়রা বলে ওঠেন, তোর মা ছোটবেলায় একবার কাউকে না বলে কী করেছিল জানিস ? কিংবা তোর বাবা সেবার চুপিচুপি চিলেকোঠায় গিয়ে …। সে সব দিনে বড়দেরও ছেলেবেলার রঙিন দিনগুলির কথা মনে পড়ত। যখন ছিল কোনও সমস্যা না থাকার দিন। এক পঙতিতে বেড়ে ওঠার দিন।

খাঁচা খুলে একটা একটা করে পাখি ওড়াবার মতো কে যেন এক এক করে উড়িয়ে দিয়েছে শৈশবের সেই সব উজ্জ্বল মুহূর্তগুলিকে। উড়ে গেছে আলোর পাখনা। বুকের ওপর চেপে বসেছে মনকেমনের অন্ধকার। আমরা জেনে গিয়েছি সেই সব ফেলে আসা যজ্ঞিবাড়িতে আমাদের আর নেমন্তন্ন নেই। একদম নেই।

79

Leave a Reply