Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতিচারণ : কাবুলিওয়ালার ছেলে

শৌভিক রায়

মির্জা খানের সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গীরাও আমাকে খেপাতেন- এ শুব্বু ! টুমি কোবে বিয়া কোরবা! হামরা সোব টুমার বিয়া খাব। আমার বয়স তখন চার পাঁচ হবে!

আমার বিয়ে খাওয়ার সৌভাগ্য মির্জা খানের হয় নি। আমি কিন্তু সেই ছোটবেলাতে মির্জা খানের বিয়ে খেয়েছিলাম। আর সেই সুবাদেই কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউও দেখেছিলাম। তাদের একটি ফুটফুটে ছেলেও জন্মেছিল কিছুদিন পর। কোনও একবার মির্জা খান বউ ছেলে দেশে রেখে এলেন। দেশে অবশ্য তার আগের পক্ষের বউ ছিল। শুনেছিলাম বাঙালি মহিলাটি দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলেন সেখানে।

দিনহাটার সেই মহিলা নিশ্চয়ই আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি আফগানিস্তানের কোথায় আছেন সেটা জানি না আর। মির্জা খান‌ও আছেন কিনা জানিনা। থাকলেও তার বয়স নিশ্চয়ই আশি পার করে গেছে! যতদূর জানি, দ্বিতীয় বিয়ে হলেও, ভিনদেশী হলেও, মির্জা খান, মানে আমার কাবলিকাকা, তাকে খুব যত্নে রেখেছিলেন। আজ এই মধ্যবয়সে এসে মনে হয়, দিনহাটার হতদরিদ্র সেই মহিলাটিও বোধহয় বেঁচে গিয়েছিলেন কাবলিকাকুকে পেয়ে!

দিনহাটা তখন ছোট্ট একটি শহর। গোধূলি বাজারে আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের মসজিদের চেহারা আজকের মতো হয় নি। তার সামনের মাঠের ঘাসগুলো ছিল খোঁচা খোঁচা। বেশ শক্ত। আমরা তাতেই ফুটবল খেলতাম। মসজিদের পেছনে গোপালকাকুদের বাড়িতে কয়লা বিক্রি হত। পাশের রাস্তা ধরে এগোলে পশু চিকিৎসালয় পার করে ডাকবাংলো আর তার খানিকটা পরে মায়ের দিনহাটা গার্লস হাই স্কুল। স্কুল শেষে মা ওই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। মায়ের সঙ্গে কোনও কোনও থাকতেন মানি (শ্রীমতি সন্ধ্যা সাহা), ঝর্ণা মাসি (শ্রীমতি ঝর্ণা নাগ), গৌরী পিসি (শ্রীমতি গৌরী সরখেল), জয়তি মাসি (শ্রীমতি জয়তি ইশোর)।

মসজিদ আর ওই রাস্তার পরেই দিনহাটা হাই স্কুল। কোনও কোনও বিকেলে আমরা স্কুলের মাঠে খেলতাম। থানাও ছিল ছোট্ট। থানার মাঠে তপনকাকু নামে এক পুলিশ কর্মচারী মাঝে মাঝে আমাদের শারীরিক কসরত করাতেন। পয়লা জানুয়ারি হলের মাঠে পাইওনিয়ার ক্লাবের স্পোর্টসের বিরাট আসর বসত। বছরের অন্য সময় ফুলদিঘিতে সাঁতার প্রতিযোগিতা হত। গার্লস স্কুলের পেছন দিকে লম্বা দিঘিটা আমরা এড়িয়ে চলতাম। ওখানে নাকি চন্দ্রবোড়া সাপ পুকুর থেকে উঠে এসে রাস্তায় রোদ পোয়াত!

গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেকদিন বাবার সবচেয়ে ছোট ভাই আশুকাকু আমাকে স্কুলে দিয়ে আসত। বাস স্ট্যান্ডটা তখন গোধূলি বাজার পার করেই। সকালবেলায় বাসগুলো ইঞ্জিন স্টার্ট করে ঘ্যা ঘো আওয়াজ করত। আশীষ চক্রবর্ত্তী ডাক্তারের চেম্বার চৌপথিতে হলেও বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির মোটামুটি উল্টোদিকে। ওনার বাড়ির পাশে ছিল একাদশী ভান্ডার। আমার খুব মজা লাগত এই নামটা।

সেই দোকান আর মসজিদের মাঝে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার মানিক সোমের দোকানের পেছনে বেশ কয়েকটা ঘর নিয়ে থাকতেন কাবলিকাকু ও তার দেশোয়ালি ভাইয়েরা। তাদের লম্বা লম্বা শরীরে আতরের গন্ধ ভুরভুর করত। চোখে লাগানো থাকত সুরমা। মাথায় ফেট্টি বেঁধে সাইকেল চালিয়ে মির্জা খান, মানে আমার কাবলিকাকু, আর তার সঙ্গীরা ব্যবসার কাজ করতেন। না, তিনি মিনির কাবলিওয়ালার মতো ফল-বিক্রেতা ছিলেন না। তাদের সবার ছিল সুদের ব্যবসা। দিনহাটা আর তার আশেপাশে ঘুরে ঘুরে তারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন। দুই তিন বছরে একবার আফগানিস্থান যেতেন। মাস ছয় বা আরও বেশি থেকে আবার ফিরে আসতেন।

সেই সময় দিনহাটার অনেকে জানতেন যে, আমি কাবলিওয়ালার ছেলে। কেননা বাবা ফালাকাটায়। মা স্কুলে। বড় কাকিমা যৌথ পরিবার সামলাচ্ছেন। ঠাকুমা আছেন তার হেলপার। ঠাকুরদা আর দুই কাকু দোকান নিয়ে ব্যস্ত। একজন চাকরি সূত্রে দিনহাটার বাইরে, আর একজন গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন। ভাল খেলোয়াড় ছোটকাকু খেলা নিয়ে আজ গৌহাটি তো কাল শিলিগুড়ি! অতএব আমি ছাড়া গরু।

আমার দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাবলিকাকু। কখনও সাইকেলে, কখনো কোলে চাপিয়ে সারা দিনহাটা টহল দিতেন। সেই ফুল চেন কাভার, ব্যাটারি দিয়ে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা থাকার সাইকেলের সামনের রডে আমার জন্যই একটি বেবি সিট লাগিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গ্যাঁট হয়ে বসে আমিও দিব্যি তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। সত্যি বলতে দিনহাটার অনেক গলিঘুজি পথ চিনেছিলাম কাবলিকাকুর জন্যই। সেই ছোট্টটি থাকতেই!

আমাদের বাড়ির সব অনুষ্ঠানে কাবলিকাকুর বিশেষ উপস্থিতি থাকত। অতিথি বিদায় হলে, তিনি বড় কাকুর ঘরে তার সঙ্গীদের নিয়ে বাঙালি খানা বেশ আরাম করেই খেতেন! আমাদের বাড়িতে চেয়ার টেবিলে ব্যবহার করলেও, তাঁদের নিজেদের ঘরে অবশ্য মেঝেতে গোল করে খেতে বসতেন। মেঝেতে থাকত পুরু কার্পেট। দেওয়ালে ধর্মীয় পেন্টিং ঝুললেও নামাজ পড়তেন মাঝেমাঝে। দেশ থেকে ফিরলেই আমাদের বাড়িতে আখরোট, বাদাম ইত্যাদি আসত। আমাদের বাড়ির বহু ব্যাপারে কাবলিকাকুর মতামতও যথেষ্ট গুরুত্ব পেত।

ফুটবল খেলতে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে অকালে চলে গিয়েছিলেন তরতাজা যুবক ছোটকাকু। শোক তীব্র ব্যাকুল করল। খানিকটা বাউন্ডুলেও হয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা ফালাকাটায় নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একা একা থাকবার জীবনে মায়ের পর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত কাবলিকাকুর কথা। হয়ত তাঁরও মনে পড়ত। দুই একবার এসেছিলেন আমাদের ফালাকাটার বাড়িতে। আর আমি ছুটিতে দিনহাটায় মায়ের কাছে গেলেই দৌড়তাম তাঁর কাছে।

মাঝে এক দুই বছর তিনি ছিলেন না। দেশে গেছিলেন। খুব অল্প দিনের জন্য যখন ফিরলেন আমি তখন ক্লাস সেভেন। আমার ভাঙা উইং স্যাং পেনটা চেয়ে নিলেন তিনি। ওটা রাখবেন নিজের কাছে। ‘ওহিটা দেখলে মুনে ওবে ইন্ডিয়াতে শুব্বু আছে’। এরপর আর একবার তাঁকে দেখলাম ক্লাস টেনে পড়বার সময়। যখন আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তখনও একবার এসেছিলেন। খবর পেলাম আমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। চটজলদি গেলাম দিনহাটায়। বয়সের ছাপ পড়লেও ঋজু শরীরে তখনও শক্তপোক্ত পাঠান। আমাকে দেখে অবাক চোখে বললেন, ‘টুমি বড়া হয়ে গেলা। হামি বুড়া হইলাম।’

আর দেখা হয় নি কাবলিকাকুর সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা ভুলে গেছি তাঁকে। কখনও রাস্তাঘাটে কাবলিওয়ালা দেখলে হঠাৎ তাঁর কথা মনে হয় কদাচিৎ! শুনেছি তাঁর সেই বাঙালি বউয়ের ছেলে বাবার ব্যবসা সামলানোর জন্য এদেশে মাঝে মাঝে আসত। সে অবশ্য একদমই ওদেশের মানুষের চেহারা পেয়েছে। তাকেও দেখেছিলাম সেই কবে! তার বয়সও নিশ্চয়ই এখন পঁয়তাল্লিশ বা তার আশেপাশে হবে।

বিগত দুই চারদিন থেকে আফগানিস্থানের পরিস্থিতি দেখে কাবলিকাকুর কথা ভীষণ মনে হচ্ছে। আদৌ কি আছেন তিনি? থাকলেও, আছেন কেমন? তাঁর সেই ঋজু শরীর কি ঝুঁকে পড়েছে? এখনও কি দু’চারটে বাংলা শব্দ মনে আছে তাঁর? মনে আছে কি দিনহাটার মতিলাল সরকার লেন দিয়ে খানিকটা এগিয়ে তিনি তাঁর সাইকেলে ‘শুব্বু’কে ধান ক্ষেত দেখাতে নিয়ে যেতেন? কিংবা কলেজ হল্ট স্টেশন পেরিয়ে গড়ের পাশ দিয়ে এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তায় যেতে যেতে বলতেন, ‘দিনহাটা বহুত হরা আছে! হামাদের মুলুকের মাফিক বানজারা নেহি।’

‘আমার শৈশব’ বইটিতে দেখতে পাচ্ছি, ‘যাঁরা আমাকে কোলে পিঠে করে বাইরে নানা কিছু দেখিয়ে দেখার আগ্রহ জাগাতেন’ কলামে কাবলিকাকুর উল্লেখ। আফসোস, তাঁর কোনও ছবি নেই আমার কাছে। তবে তাঁর উদ্যোগে দিনহাটা মসজিদের সামনে চার বছর বয়সে তোলা একটি ছবি পেলাম নিজের…..

এখনও পৃথিবীর কত জায়গা এরকম। সবুজ হরিয়ালি কোথাও, কোথাও আবার বানজারা। Wasteland… নষ্টভূমি।

আমাদের মানুষদের মতোই!!

46

Leave a Reply