Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : মুক্তগদ্য : একা এবং একক মনসা

শ্রাবণী ভট্টাচার্য

তা ছেড়ি কি করতো বলুন তো?সৎ মায়ে ঘরে ঠাই দেয় নি।বাপ ঘরের অশান্তি থেকে রক্ষা পেতে মেয়েকে ( থুড়ি অবৈধ মেয়েকে) রেখে আসলো নির্জন পাহাড়ে,কাঁটা গাছ আর বন্য সরীসৃপে ভরা পর্বতে।এ হেন পরিবেশে একা থাকতে থাকতে সুন্দরী যুবতী মেয়ে ডিপ্রেশন এ চলে যাচ্ছে দেখে বাপে জরৎকারু মুনি কে বলে কয়ে সুন্দরী কিন্তু কানা মেয়ের বিয়ে তো দিলেন।তায় একদিন খুব একটা সামান্য কারণে স্বামী স্ত্রীর ক্যাচাল।মুনি অমনি রেগে মেগে বউকে ত্যাগ করে ছেলেকে নিয়ে সিঙ্গেল প্যারেন্ট হয়ে চলে গেলো।পিতৃ পুরুষ কে উদ্ধার করতে পুত্রের দরকার ছিলো।পুত্র পাওয়া হয়ে গেছে।অতএব বউ এখন না থাকলেও চলে।পুত্রের নিমিত্ত ই ভার্যা কে ক্রয় করা। আগেকার দিনের মুনি ঋষিরা কথায় কথায় খোচে গিয়ে অভিশাপ টভিশাপ দিয়ে দিতেন।যখন তখন কামার্ত হয়ে যার তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হতেন।অসংখ্য সন্তান জন্মাতো।দেবতারাও কম যান না।এর সাথে ওর, লটঘট।

তার যাই হোক বাবা,দেবতা টেবতা নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো।কেস খেয়ে যেতে পারি যখন তখন।

মনসা তখন সত্যিই একা।identity crisis এ ভুগতে শুরু করেছে।দেবতার ঔরসে জন্ম হয়েও দেবী নন।পাতালে,নাগরাজ্যে পালিতা।কেউ প্যালা দেয় না।কি করবে একা একটা মেয়ে? বাঁচতে হবে তো?নিজের একটা identity,একটা কাজের জগৎ, ফ্যান ফলোয়ার সবই চাই।ওই বর্বর বর,আর ছেলের স্মৃতি কে নিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ,জঙ্গলে ঘুরে,”না কোয়ি উমঙ্গ হ্যায়,না কোয়ি তরঙ্গ হ্যায়” বলে কাল কাটানোর মেয়ে তো মনসা নয়।মেয়েবেলা থেকে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বহুত সংগ্রাম করতে হয়েছে।সাপেদের সাথে ঘর করতে গিয়ে নিজেও খানিক খল।তা না হয়েও বা কি করবে?ভালো মানুষের দিন তখনও ছিলো না,এখনও নেই। সখি রা বিশেষ করে নেতা বুদ্ধি দিল,এবার দেবী হওয়ার লড়াই তে নামার।তা যেমন ভাবা,তেমন কাজ।কিন্তু মর্ত্য ধামে পূজা পেতে গেলে কেউ কেটা কাউকে দিয়ে মহরৎ করাতে হবে।না মশাই,কোনো ব্রাম্ভন কে দিয়ে কাজ হবে না।চাই মাল দার পার্টি।তাই চাঁদ বেনেকেই বেছে নিলো মনসা।চাঁদের তখন হেভি রমরমা।বণিক হয়েও,সমাজের মাথা। যার কাছে ধন,মান তো তার কাছেই। চাঁদ বেনে আবার শিবের উপাসক।সে কোনো এলেবেলে মেয়েমানুষকে দেবী বলে মান্যতা দেবে কেনো? অতএব শুরু হয়ে গেলো পুরো পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে একক,ব্রাত্য নারী র লড়াই।মনসা আর চাঁদ বেনের গল্প সবার জানা।ওই নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করলাম না।নিজের identity তৈরি করতে মনসা অনেক ছোট কাজ করেছে।কিন্তু মনসার জন্ম থেকে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো ও তো ঠিকঠাক ছিলো না।অতএব একটা vindictive মানসিকতা মনসার ছিল।চাঁদের বেলায় সেটা আরো স্পষ্ট হলো,যখন মনসা দেখলো চাঁদ তাকে পুজো না করলে মর্ত্যের অধিবাসীরা তাকে recognition দেবে না।আর মর্ত্যে ভোট না পেলে,স্বর্গে দেবী হওয়ার বাসনা তার স্বার্থক হবে না।তাই মনসার লড়াইটা ছিল দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই।নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।

মনসার লড়াই টা তাই দেবতাদের ডোমেন থেকে বেরিয়ে বিস্তৃত হয় নারী লোকে।পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে,সমাজের সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে একা একটি মেয়ের দেবী হয়ে ওঠার টান টান গল্প তাই মনসার উপাখ্যান।এখানে ভ্যাজ ভ্যাজে কান্না নেই,কাউকে তেলানো নেই, কারোর করুনা ভিক্ষা নেই।এখানে আছে শুধু লড়াই।আর কে না জানে everything is just in war and love.

105

Leave a Reply