Categories
কুলিক রোববার প্রথম পাতা

কুলিক রোববার : গল্প: একটি সত্যি গল্প

ডাঃ দেবব্রত রায়

রোগী এবং ডাক্তারবাবু সবাই ভাদরের গরমে হাঁসফাঁস করছেন । ডাক্তারের চেম্বারে ঢুঁ মেরেও   ডাক্তারবাবুটিকে আবিষ্কার করা গেল না ।

সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল এর অতিব্যস্ত আউটডোরে দীর্ঘ লাইন। সবাই দেহাতি। কারো পরনে লুঙ্গি, কারো খাটো ধুতি।পরিস্কার জামা প্যান্ট  পরিহিত কেউ প্রায় নেই বললেই চলে।মেয়েবৌদের পরনে সস্তা শাড়ি।

সবেধন নীলমণি ডাক্তার বাবুর বয়স অল্প। দেখলেই বোঝা যায় সদ্য পাস করা শহরবাসী। প্রতিদিন গড়ে তিনশ রোগী দেখতে হয় এই ডাক্তারবাবুকে।রোগী পিছু বরাদ্দ সময় তাই কোনমতেই এক মিনিটের বেশি হয় না। এই সময়ের মধ্যে রোগীর কথা শোনা,ব্যবস্থাপত্র লেখা, তাকে বোঝানো সমস্ত কিছু সেরে ফেলতে হয় ।

এ নিয়ে ক্ষোভ আছে রোগীদের মনে। এভাবে রোগী দেখে ডাক্তারবাবুও যে খুব একটা সন্তুষ্ট তা নয়। আসলে করার কিছু নেই। সময়ের যাঁতাকলে সব বাঁধা।

রোগীদের দীর্ঘ লাইন কখনো কখনো হাসপাতাল চত্বর ছাড়িয়ে বাইরের মাঠে চলে যায় ।গরমের সময়ে রোগীরা কেউ মাথায় ছাতা কেউ গামছা রেখে অপেক্ষা করে।

দুপুরে ঠাঁ ঠাঁ রোদ্দুরে রোগীদের লাইন  ক্রমশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যারা একটু বয়স্ক বা বেশি অসুস্থ যারা তারা সঙ্গীর হাতে লাইনের জিম্মা রেখে একটু দূরে গাছ তলায় বসে ডাক পাওয়ার অপেক্ষা  করছে এভাবে। এভাবেই রোগী-আক্রান্ত হয়ে বসে আছেন নবীন ডাক্তারবাবুটি।

রোগী এবং ডাক্তারবাবু সবাই ভাদরের গরমে হাঁসফাঁস করছেন । ডাক্তারের চেম্বারে ঢুঁ মেরেও   ডাক্তারবাবুটিকে আবিষ্কার করা গেল না । সেখানে কেবলই নানা বয়সের মানুষের মাথা।একটা রোগীর ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছিলেন ডাক্তারবাবু। ঠিক তখনই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পরের রোগীটি নিজের কষ্টের কথা বলতে শুরু করলো। বৃদ্ধা মহিলা।  মুখে অসংখ্য বলিরেখা । অবিন্যস্ত বেশবাস।দেখে বোঝা যায় একেবারেই দেহাতি, বিধবা মহিলা। সদ্য চাকরিতে আসা নবীন ডাক্তারবাবুটি বিরক্ত হলেন। একটি রোগী শেষ না হতে হতেই অন্য রোগীর কথা শুনলে মনঃসংযোগ নষ্ট হচ্ছে যে!

ডাক্তারবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন– তুমি থামো,  একে শেষ করে তারপর তো তোমার কথা শুনবো।

বৃদ্ধাও তেড়ে উঠলেন– কোথায় আর শুনিবিরি বাবু, বলার আগলাই তো ফটাস্ করিয়া নিখ্যা দিবিন রে বাবু।

ডাক্তারবাবু গম্ভীর হলেন ।

একটু  নড়েচড়ে মুখ তুলে চাইলেন। হাতের লেখা থেমে গেল। বলিরেখা ভর্তি মুখের দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ।সেসবের মধ্যে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করলেন গভীরভাবে।

53

Leave a Reply