Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : পুনর্মিলন

পারমিতা নিয়োগী সরকার

                 হাই, আমি পিউ। বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান। পড়া শেষ হতে বাবার বিজনেস জয়েন করি। আমাদের দোকানে দেশের তো বটেই, বিদেশের ও বিভিন্ন ধরণের ঘর সাজানোর জিনিস পাওয়া যায়। দোকানের নাম বহুরূপী। জানো, আমার বাবা না খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। খুব যত্ন নিয়ে সাজিয়েছিলেন এই দোকান। বাবা মায়ের অবর্তমানে ব্যবসা এখন আমার দায়িত্বে। তাই  সারাবছর খুব ব্যস্ততার মধ্যেই কাটে আমার। বিয়ে একটা করেছিলাম। টেকেনি। বুড়ি পিসির ( উনাকে আমি ছোট থেকে আমাদের বাড়িতেই দেখেছি) ভাষায় কাটানছাড়ান হয়ে গেছে। যদিও এই ব্যাপারে আমার পরিবারের সবাই, বন্ধুবান্ধব আমাকেই দোষ দেয়। সে দিক গে। আমি নাকি সব ছেলেদের বাবার সাথে তুলনা করি। করলে করি। আমার চোখে আমার বাবা ই পারফেক্ট। এখন আমি একাই থাকি। বাবা মায়ের স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি আর দোকান নিয়ে। আজ আমি একটু ব্যস্ত আর অনেকখানি এক্সসাইটেড। বহু বছর পর আমরা ছয় বন্ধু একজায়গায় হব। ধন্যবাদন্তে ফেসবুক। সত্যিই দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেল মাঝে। ভাবতেই ভীষণ ভালো লাগছে যে আমি, সর্বানি, শ্বেতা,সোনালী, নিশা আর পিয়ালী আবার একসাথে হচ্ছি আমাদের পুরোনো আড্ডা খানায়। তবে শ্বেতার সামনাসামনি হতে আজ একটু অস্বস্তি হবে কি? আসলে সঞ্জয়, মানে আমার এক্স হাজবেন্ডের সাথে শ্বেতার একটা সম্পর্ক ছিল।বন্ধুদের ধারণা আমি জেনেশুনেই সঞ্জয় কে ওর থেকে দূরে করেছি তাও নাকি বাবার সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে। সেই রাগে ওরা কেউ আমার বিয়েতে আসেনি। আরে বাবা সঞ্জয় যদি সত্যিই লোভে পড়ে আমাকে বিয়ে করেই থাকে তবে তো শ্বেতার আমার ওপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তাই নয় কি? যদিও এই ভাঙাগড়ার গল্পটা ওদের কারোরই বিশেষ জানা নেই। জানানোর ইছেও আমার নেই। এত বছরের পুরোনো কথা ভেবে এখন আর কি লাভ বলো। তার চেয়ে চট করে রেডি হয়ে নি। ও হ্যাঁ , আজকের মেনুই তো বলা হয়নি। ড্রিংকস এর সাথে চিকেন পকোড়া আর ছোলা মাখা। অবশ্য যদিনা সোনালী ড্রিংকস আনতে ভুলে যায়। সে যে আবার কখন কোন জগতে থাকে বোঝা মুশকিল। যাক গে, লাঞ্চে ঝুরঝুরে আলু ভাজা আর পাঠার মাংস দিয়ে ভাত। দারুন না? টাটা। 

  ধুর বাবা কত্তো দেরি হয়ে গেল। সবাই ঠিক সময় মত পিউয়ের বাড়ি পৌঁছে যাবে আর আমার লেট লতিফ বলে আগের মতোই হাসাহাসি করবো। বলবে, ম্যাচিং ঝোলা মালা খুঁজতেই দেরি করেছি। আচ্ছা, ওরা এখনো আগের মতোই  আছে? ও বলাই হয়নি।আমি সর্বানি। ভীষণ আনন্দ হচ্ছে জানো তো! কতদিন পর ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে দেখা হবে। আমাদের মধ্যে আমারই সবার আগে বিয়ে হয়ে যায়।  ইস কলেজটাও শেষ করা হয়নি। ভাল্লাগেনা জানো , বাবা মা দুম করে একটা পনেরো বছরের বড় লোকের সাথে বিয়ে দিয়েদিল। না, বিয়ে করবোনা সেটা তো কখনোই বলিনি। বরং সেই ছোট্টবেলা থেকে বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন আমার। নতুন নতুন ঝকমকে শাড়ি, গা ভর্তি গয়না, সাজুগুজু। উফঃ, বেশ একটা জমজমাট ব্যাপার। তবে এটা ঠিক, বর নিয়ে তেমন কোনো ধারণা  ছিলোনা আমার। আরে তখন তো একটা অন্য রকম সময় ছিল নাকি। চারদিকে ছেলেদের ঘোরাঘুরি, প্রায় রোজ একটা করে প্রেমের প্রস্তাব। ইসসস এখনো ভাবলে কেমন একটা যেন হয়।  নিশ্চই কারো হায় লেগেছে , তাই তো আমার কপালে এমন একটা রসকষহীন বর জুটেছে। ধুর ধুর।ভাবা যায়? একটা মানুষ তার কোন শখ আল্লাদ নেই? জীবনের সবটাই প্রয়োজন? ব্যবসা করা, বাজার করা, খাওয়া ঘুম সহ বউকে আদর করাটাও। ছেলে হওয়ার পর থেকে তো সে পর্বও প্রায় নেই বললেই চলে। জানতো, এত বছর পর সেদিন যখন শ্বেতার সাথে কথা বলছিলাম তখন একটু বরের নিন্দে করে ফেলে ছিলাম আর কি। এমনিতে তো বাড়ির কাউকে কখনো বলিনা। তাছাড়া বলেই বা কি হবে বলো? কিন্তু পুরোনো বন্ধু পেয়ে কেমন যেন আগল খুলে গেল আমার। ব্যাস সুযোগ পেতেই শ্বেতা শুনিয়েদিলো ‘বেহিসেবী জীবনযাপন করেছিস একটা সময় এটা তারই ফল ভুগছিস’। হুঁ, বেহিসেবী আবার কি? অল্প বয়সে কে না দু চারটে প্রেম করে? ওর ছিলোনা প্রেম? সঞ্জয়ের সাথে?  সেখানে আমার একটু বেশিই ছিল এই যা। আমিও জানি এই সব কারণেই বাবা মা আর দেরি করেনি। তাই বলে… । বিয়ের পর আমার সব রাগ গিয়ে পড়েছিল ওই বুড়ো শিব ঠাকুরের ওপর। বছর বছর পুজো নিয়ে শেষে এই প্রতিদান দিলে?  সবই কপাল আর কি। যাই রেডি হই। আচ্ছা, ভারী শাড়ি পড়ব না হালকা? সোনার গয়না পড়বো? ধুর, আগে জানতো এগুলো নিয়ে ভাবতেই হতনা। আজকাল নিজের ওপর ঠিক ভরসা পাইনা। কথায় কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল। আসি গো। 

       হ্যালো, আমি সোনালী। বয়সটা বাকি বন্ধুদের সমান। Engineering করে এখন একটি Multinational company তে চাকরি করছি। বাড়িতে মা, দাদা, বৌদি আর ভাইঝির সাথে থাকি। দিদির বিয়ে হয়েগেছে বেশ কিছু বছর আগেই। আমার বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা কোরোনা বস, ওটা নিয়ে নিজেই চাপে আছি। সারাদিন বাড়িতে, অফিসে, বন্ধু মহলে এই এক প্রশ্ন। আমি জানি , এই যে আজ আমি সহ ছমাথা একখানে হবে সেখানেও এটাই মূল আলোচ্য বিষয় হবে। আরে বাবা আমি তো নিশা নই। যে নিজের আইডেন্টিটি লুকিয়ে বেড়াবো। আমি আর পাঁচটা মেয়ের মতোই ছেলেদের পছন্দ করি। সরি, আমি নিশা কে নিয়ে এভাবে বলতে চাইনি। নিশা লেসবি। নিজের এই পরিচয়টা ওকে কষ্ট দিত। তাই সারাক্ষন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইতো অন্যদের থেকে। ছাড়ো, যেটা বলছিলাম। আমার জীবনে খান কয়েক প্রেম এসেছে। যদিও ওটাকে প্রেম বলে কিনা জানিনা। তবে এটাও ঠিক যে আমার ওই  সতীপনা নিয়ে কোন ট্যাবু নেই তাই যার সাথে যখন সম্পর্কে থেকেছি চুটিয়ে উপভোগ করেছি। সত্যি বলতে কি, বিয়ে ব্যাপারটাকে একটু ভয় পাই। চিড়িয়াখানার বাঘ হাতিগুলোর কথা মনে পড়ে। Artificial jungle এ কি বুনো গন্ধ পাওয়া যায়? শুধু মনেহয় স্বাধীনতা বলে কিছুই থাকবেনা আর। এই যে আমার বৌদি। একটা শিক্ষিত, আধুনিক মেয়ে। কি করছে সারাদিন? কত্তো বললাম কাজ করো। বাইরে বেরও। না,তার বর মানে আমার দাদা নাকি পছন্দ করেনা। বোঝো। যত্ত সব ঢেমনামো। তারচেযে এই বেশ ভালো আছি। মাঝে মাঝে অফিসিয়াল, আনঅফিসিয়াল ট্যুরে বেরিয়ে পড়া। আড্ডা, পার্টি, ফুলটু মস্তি। বলি ভাত ডাল ছাড়াও তো শরীরকে আরো কিছু দিতে হবে না কি? ওই দেখো আবার ফোন করছে এই পিউটা। আজকের মেনুটা বলছে তো? চলো এবার ওঠা যাক। 

         নমস্কার আমি শ্বেতা। এখন আমি একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করি। বিষয় বাংলা। বিবাহিত, একটি কন্যা সন্তান আছে আমাদের। আমার স্বামী একজন সরকারি উচ্ছপদস্থ কর্মচারী। খুব প্রাণখোলা মানুষ। বেড়াতে যেতে,  আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হইচই করতে খুব ভালোবাসেন। আমি নিজের কাজে বাইরে খুব একটা কোথাও যাইনা। আমার স্বামী চান যে আমিও ওদের সাথে মিশি, আনন্দ করি। কিন্তু আমি আবার যার তার সাথে মিশতে পারিনা। অন্যরা আমায় উন্নাসিক ভাবে। কি করবো বলো, রুচিবোধ তো সবার একরকম হয়না। তাই না? ও কাল একটু অবাক ই হয়েছিলেন যখন শুনলো যে আজ আমি আমার ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাবো। ভাবছি, এতগুলো বছর পর আমার কি সত্যিই ভালো লাগবে ওদের সাথে ? জানো, পিউ আমায় প্রথমে যাবার জন্য বলেনি। সর্বানিকে দিয়ে বলিয়েছে। ভেবেছে ও বললে যদি আমি না যাই? পাগলী একটা।  কত বছর আগের কথা ও এখনো ধরে রেখেছে। সঞ্জয় আমাকে ছেড়ে ওকে আপন করে নিয়েছিল। তাতে ওর দোষ কোথায়? হয়তো আমিই নিজেকে উজাড় করে ভালোবাসতে পারিনি। হয়তো পিউয়ের  মত করে আপন করে নিতে পারিনি। আমি এমনই। বিয়ের এত বছর পরও নিজে থেকে সমর্পিত হতে পারিনি স্বামীর কাছে। পারিনি উনার পছন্দ মত আধুনিক সাজে নিজেকে সাজাতেও। তবে পিউও তো পারলোনা বলো বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে। এখন আর কিসেরই বা রেষারেষি, কিসেরই বা ক্ষোভ। আজ তবে যাই? অনেকটা পথ যেতে হবে তো।

      এতক্ষনে ..আমার সম্পর্কে নিশ্চই শোনা হয়েছে কিছুটা। এই যেমন একটু অন্যরকম, নিজের Identity নিয়ে দোলাচলে থাকা একটা মানুষ?  জানি জানি। তবে আমি ওদের দোষ দি না। ওরা আমার সত্যিকারের বন্ধু। আজ ওদের জন্যই নিজের একটা জায়গা তৈরি করতে পেরেছি জীবনে। নহলে কি যে হত আমার। সত্যিই কতগুলো বছর চলে গেল মাঝে বুঝতেই পারিনি। ও বলাই হয়নি, আমি নিশা। গ্রেজুয়েশনের পর এমবিএ করে এখন চাকরি করছি। সেলসে আছি তাই সময় ঠিক থাকেনা বাড়ি ফেরার। বাড়িতে দাদা , বৌদি আর ভাইপো। আগে আমিও ছিলাম ওই আমাদের পৈতৃক বাড়িতে। এখন একটা ছোট ফ্ল্যাট নিয়েছি। ওদের সাথে আমার ঘড়ি ঘন্টা নিয়ে বড্ডো সমস্যা হচ্ছিল। তাই চলে এলাম। সাথে থেকে সম্পর্ক খারাপ করার চেয়ে দূরে থেকে রক্ষা করা ভাল। কি বলো? ওই বাড়ির ওপর আমার কোন দাবি নেই, এটা লিখিত ভাবে দিয়েও এসেছি। মাঝে মাঝে যাই ভাইপো টাকে দেখতে। বন্ধু নতুন করে আর কেউ হয়নি আমার। আসলে কার সাথে মিসবো, কে কি ভাবে নেবে আমাকে। এই সব ভেবেই আর কি। আগে যখন এই বন্ধুরা আমাকে জিজ্ঞাসা করত যে কাকে দেখলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায়? হ্যান্ডসাম ছেলে নাকি সেক্সি মেয়ে? খুব রাগ হত। উত্তর দিতে পারতাম না। আজ জিজ্ঞাসা করলে ঠিক পারবো। জানো, নিজেকে বুঝতে শেখার সময় যখন নিজের মধ্যে কুঁকড়ে থাকতাম তখন এরাই সাহস জুগিয়েছে। বিশেষ করে পিয়ালী। আমাদের পিয়া। খুব বকতো আমায়। বলতো, ‘ মানুষ অন্যকে সম্মান করার  চেয়ে করুনা করতে বেশি পছন্দ করে। কারণ ওটাতে সে আত্মতৃপ্তি পায়। কেন দিবি লোককে সেই সুযোগ? নিজেকে যোগ্য তৈরি করে নিজের মত বাঁচ।’ আজ আমি সত্যিই পেরেছি।খুব আনন্দ হচ্ছে। আজ মনে হচ্ছে আবার নিজের রুট খুঁজে পেয়েছি। যাই, আর দেরি করতে মন চাইছে না।

       আমি পিয়ালী। পরিবারে কেউ নেই। আপন বলতে মা ছিল। সে চলে যাবার পর নিজেকে অনাথ ভাবতেই ভালোবাসি। যা কামাই করি তা দিয়ে নিজের ভালোই চলে যায়। কি বললে? প্রেম, বিয়ে, সংসার ? ছাড়না ভাই, শুধু শুধু খিস্তি বেড়িয়ে যাবে। সত্যি বলি,  পুরুষালী গন্ধে আমার বমি পায়। না, আজ আমার ওই পিউদের বাড়ির গ্যদারিং এ যাবার একটুও ইচ্ছে নেই। ওই লোকদেখানো আদিখ্যেতা জাস্ট সহ্য হয়না। ন্যাকামো যতসব। ওই সর্বানি, চলতা ফেরতা মেকআপের দোকান একটা। একটা মেয়ে তার একটাই ambition ছেলেদের Impress করা। আর এগুলো করে লাভের লাভ কি হল? নিজের বাপ মা ই ঝাড় থেকে বাঁশ এনে গুঁজে দিলো।আর একজন শ্বেতা, সেই স্কুল লাইফ থেকে দেখছি,  সব রকম আনন্দ করবে কিন্তু এমন একটা ভান করবে যেন আমরাই ওকে জোর করে করিয়েছি। আমি জানি, আজ ওখানে ও সবার সাথে মদ গিলবে। যত্তসব dabul standard লোকজন। আর সবচেয়ে অসহ্য তো ওই পিউ। সারাক্ষন বাবা বাবা করে হেদিয়ে মরছে। যেন ওরই শুধু  একটা লিগ্যাল বাপ আছে। বাকিরা তো সব অবৈধ সন্তান। কি ভাবছো? আমিও এমনই কিছু? না , সেই সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার জন্য বাবা শব্দের অর্থ বিভীষিকা। গায়ে দুর্গন্ধ, মুখে অশ্রাব্য গালি আর মায়ের ওপর অত্যাচার এই হল আমার বাবা। জানো, আমার মা শুধু আমার জন্যই লড়ে গেল। এই আজ আমি যে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি সেটা শুধু মায়ের জন্য। ভেবেছিলাম মাকে আমি ভালো রাখবো। একটু সুখে রাখবো । হল না। ওই বাবা নামক লোকটা মারা যাবার একবছরের মাথায় মা ও চলে গেল। আসলে ক্ষয়ে গিয়েছিল ভেতর থেকে। আর এই সব হারামি বন্ধুরা আমায় খিটকেলে বলে, মেন্টাল বলে। মাঝে মাঝে ভাবি জানো, বলে বলুক,  তবু পাশে তো থাকে। সত্যিই বলি? আমি না ওদের সবাই কে খুব হিংসে করতাম। এখন ওদের জীবনে হয়তো অনেক কিছুই মনের মত নেই। কিন্তু একসময় তো সব ছিল বলো। কিন্তু আমি? আমার ঝুলি যে সারাজীবন শুধু ফাঁকাই রয়ে গেল। কি করি বলতো, যাবো ওদের কাছে? আর যে সত্যিই কেউ নেই আমার ।

60

Leave a Reply