Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : স্মৃতি : ১৬

সাধন দাস

ঘর ভাঙার আর্তনাদ 

আগে লিখেছি। ফের লিখছি। আবার লিখবো। ঘর ভাঙার গল্প। ফি-সনে বন্যার গল্প। 

এবছর আকাশ ভেঙে নেমেছে। মেসের পেছনেই বাঁশবন। ঝমঝম, ঝিমঝিম ঝরছে। কাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। দিনরাতই রাত্রি। আকাশে রাক্ষসীর জটা মেঘ, বাতাসে হুঙ্কার, দৃষ্টি অশনি। বন্ধ জানালায় ফোঁওস ফোঁস, এতোল বেতোল ধাক্কা। স্যাঁতসেঁতে বিছানা। ঘুম আসছে না। যেনো হরিহরের ভূত, প্রেত, রাক্ষস খোক্কসের আদিম পাড়ায় আছি। 

বাঁশঝাড়ের নিচে বুড়ি আর নাতনির ঘর। মাটির। বৃষ্টির অবিরল ছাঁটে, ঝাড়ের ধারায়, পুকুরের ঠেলজলে সপসপে, গলছে। 

আতঙ্কের মাঝঘুমে বিকট শব্দ। ধড়মড়িয়ে বসি। অন্ধকার ঘর। বাইরে বিদ্যুতের ঝলকানি। ঝড়ের সাঁ সাঁ। আর কিছু না। শুয়ে পড়ি।। আবার শব্দ। আবার বসি। পাশের ঘর খুলে নিমাইদা, দিবাকরকাকুরা এলো। শেষ রাতে আমরা গোল হয়ে স্তব্ধ। কিসের শব্দ! সবার বিস্ফারিত চোখ অন্ধকারে ফুটে আছে। 

দিনে খবর পেলাম, বুড়ির ঘর ভাঙছে। বাঁশের খুঁটি ফাটার শব্দ। 

দিনেও, নানা রকমের যন্ত্রণার কাতরানি। রাতে বাড়লো। হঠাৎ হঠাৎ ডুকরে উঠছে। 

কাকু বললো- নাতনি কাঁদছে। 

মোটা গিটকিরি কান্না, নিমাইদা বললো- বুড়ি মাথা কুটছে। 

সুশান্ত ভয়ে গা ঘেঁষে এলো। বললাম- গরিব মানুষের কান্না তো! ভয়ের কিছু নেই। 

খবর পেলাম। বুড়ি, নাতনি স্কুলবাড়িতে উঠে গেছে। মানে ফট ফটাস শব্দ ঘরেরই। যেনো তার হাঁটু, জঙ্ঘা, কব্জি একে একে ফাটছে। ক্যাঁআয়াচ কট, কটকট বাঁশে-বাখারিতে, বাখারিতে-কঞ্চিতে, আদরে মমতায়, আড়ায়, খুঁটিতে, যেখানে যা বাঁধন আছে কাটছে। যে খুপটি জানলায় চোখ রেখে নাতনি বাইরেটা দেখতো। তিনদিনের দিন দুপুরে কেতরে উঠে এক মচকায় বসে গেলো। কাত হয়ে ঘরখানা দুনিয়া থেকে বাদ হয়ে গেলো। যে দাওয়ার বুকে বুড়ি ভিক্ষের কাঁড়া আকাঁড়া চাল বাছতো। শুঁকে, মেপে, রঙে বুঝতো সংসারের হকিকৎ। চারদিনের দিন ঝপাস শব্দে মুখ থুবড়ে পড়লো তার চালখানা। সন্ধ্যেয় ঘরে আটকে পড়লো বহুকালের অন্ধকার। বাইরে চোখ ঝলসানো বিদ্যুৎ। দিনের পর দিন নিরূপায় ঘরখানার ক্যাঁচ ক্যাঁচ কট্‌ কট্ মায়ার বাঁধন কাটার শব্দ। একটানা একই আর্তনাদ, ঝোড়ো হাওয়া। যেনো কতোকাল ধরে শুনছি! কাঁহাতক সহ্য করা যায়! বুকের ভিতর যন্ত্রণা খেপে উঠছে। ঘুমের মধ্যেও নিঃশ্বাস ভারী। একটা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কী করা উচিত! পাঁচদিনের দিন রাতে বিকট আর্তনাদে ঘরখানা ভেঙে পড়লো। 

36

Leave a Reply