Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : অক্ষরকর্মী

কুলদা রায়

1.
এই আষাঢ় মাসেই তার জন্ম হয়েছিল। বৃষ্টির মধ্যে। প্রথম ফুটেছিল।

তার ছোটো ছোটো হাত। ছোটো ছোটো পা। ছোটো ছোটো আঙুল। আর টকটকে গাল। আমার মা এই শিশুটির কান্না শুনে একটা বেলী ফুলের গাছ লাগিয়েছিল। দুধ শাদা তার ফুল। রাতে পাপড়ি মেলে। সুঘ্রাণ ভেসে যায় চরাচরে।

নাম রাখা হয়েছিল ‘ক’ অক্ষর দিয়ে। বাবার সঙ্গে মিলিয়ে। অথচ আমার মেয়ে দুটির নাম ‘প’ দিয়ে। বোনের ছেলের নাম ‘র’ দিয়ে। একদম নতুন অক্ষর।

আমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যাই দূরে, পদ্মা পার হয়ে–তুরাগ নদীর ধার দিয়ে, শান্ত স্নিগ্ধ ব্রহ্মপুত্রের কাছটিতে, ঠিক দ্বিতীয় দিনটিতেই টের পেয়েছিলাম, না–এই শিশুটির চোখ টলমল, সকল নদীর চেয়েও খরস্রোতা। যতদূরেই যাই না কেন–ঠিক কাছে চলে আসে। বলে, এসো।

সেই টলটলে চোখের ডাকে তিন দিনেই ফিরে এসেছিলাম–বৃষ্টির মধ্যে। ব্রহ্মপুত্রকে অগ্রাহ্য করে। তুরাগকে পাশ কাটিয়ে। আর পদ্মাকে ফাঁকি দিয়ে।

যখন এসেছি, দেখি সেই শিশুটি জানালা গলিয়ে চেয়ে আছে। চেয়ে থাকে। জল ভরা চোখ। বলে, যেও না।

তখন ১৯৮১ সাল। আর এখন 2021 সাল। চল্লিশ বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে কত শিশুর নাম হয়েছে– ‘অ’ দিয়ে। ‘দ’ দিয়ে। কারো নাম ‘ম’ দিয়ে। ‘স’ দিয়ে। কাউকে দেখেছি। কাউকে দেখিই নি। সবাই নানা অক্ষর নিয়ে বেড়ে উঠছে। আর আমি ক্রমশ অক্ষর হারিয়ে ছোটো হয়ে যাচ্ছি। দূরে চলে যাচ্ছি। কেউ বলছে না–এসো।

আমি আজ কেউ নই– এক রিপ ভ্যান উইংকল। পাহাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরছে।

প্রিয় কৌশিক, তুই না ডাকলেও তোর সেই জলে ভরা চোখই কেবল আমাকে ডাকে, আয়।

2.

কোনো না কোনোভাবে হামিদ খাঁই আমার জিগরী দোস্ত। তাঁর বাড়ি লাহুড়ী গ্রাম। ইউনিয়ন–শঙ্করপাশা। পাশের নদীর নাম বলেশ্বর। পিং আসমত আলী খাঁ।

হামিদ খাঁর সঙ্গে যখন আমার দেখা হয় তখন তাঁর বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে।

পথের পাশে বসেছিলেন দুটো সফেদা নিয়ে তিনি। গায়ে ধানের গন্ধ। পায়ে প্যাচপ্যাচে কাদা। বললেন, খাইয়া লন।
বুড়ো হামিদ খাঁ একটি সফেদা খেলেন। আমি আরেকটা। খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম, আপনি এই সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি মাঠে ঘাটে কী করেন।

তিনি হাসলেন। বললেন, স্যার জীবনে লেখাপড়া শিখতে পারি নাই। লোকে কয়–খাঁয়ের বেটা বকলমা। এই বকলমা নিয়াই লিখি।

এরপর বাগানে নামলেন। বাগানটি তখন সাদা কাগজ। তার গায়ে লিখলেন–শিরিষ গাছ। এক সারি আমড়া গাছে ফুল এসেছে। একটা কলাগাছও লিখলেন। অক্ষরের মধ্য দিয়ে গাছটিতে সদ্য মোচা এসেছে। তারপর যত্ন করে লিখলেন, বেগুনগাছ। গাছটিতে তাল বেগুন ধরেছে। একটি শিমগাছের কথাও লিখলেন। গাছটি পেয়ারা গাছের গোড়ায় লতিয়ে উঠেছে। আরেকটি কাগজ নিয়ে বড়ো করে লিখলেন–আমাগো ধানের নাম বৌয়ারি। ধানক্ষেতে রৌদ্র-ছায়ার খেলা জেগে উঠল।

হামিদ খাঁ জানতে চাইলেন, আমার লেখন পড়তে পারতেআছেন স্যার?

আমার মুখে রা নেই।

তিনি বললেন, এই সবই আমার আত্মজীবনী।

55

Leave a Reply