Categories
Uncategorized

কোভিড কথা : নবনীতা কর্মকার

ঐ দিনগুলোর কথা ভাবলে কেমন যেন দমটা আটকে আসে। ৮ই মে আমার জ্বর এসেছিল ।হঠাৎ কেন জ্বর মেপেছি তা বলছি, তবে আমাকে একটু আগের দিনগুলোতে ফেরত যেতে হবে । ২রা এপ্রিল আমার স্বামী অমিত দাস করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন। ৫দিন হাসপাতালে চিকিৎসার পর ডাক্তারবাবু হোম আইসোলেসনে থাকতে বলেন। বাড়িতে এসে একমাস আইসোলেসনে ছিলেন। একমাস পরে অর্থাৎ ২রা মে ছেলের জন্মদিনের দিন উনি আইসোলেসন কাটিয়ে আমাদের সঙ্গে একত্রে থাকবেন এটা ভাবতে ভাবতেই পয়লা মে ছেলের জ্বর এল। ছেলে পাশের ঘরেই আইসোলেসনে থাকতো ।ডা:দেবব্রত রায় এর পরামর্শ মতো ছেলেকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। খুব টেনশনের মধ্যেদিয়ে দিন কাটাতে থাকি ।পাঁচদিন পর ছেলের জ্বর কমেও যায়। একটু নিশ্চিন্ত হতেই দুই দিন পর থেকে আমার একটু একটু কাশি শুরু হয়। আমার স্বামী আমাকে জ্বর মাপতে বলে, দেখি ৯৯ টেম্পারেচার। কিছু বুঝতেই পারিনি যে জ্বর আসতে পারে। টেনশন অনেক বেড়ে গেল যে ছেলে প্রায় সুস্থ হচ্ছে আর আমি করোনা আক্রান্ত। শান্তনু দা(ডা:শান্তনু দাস) এর প্রেসক্রিপশন মতো ওষুধ খেতে শুরু করি। আমি আর ছেলে দুই ঘরে আর আমার উনি আবার সেই নীচের ঘরে । একই বাড়িতে তিনজন আলাদা… খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। খুব ই সাবধানতা অবলম্বন করছিলাম যাতে ছেলের আবার কিছু না হয় তবে ডা:দেবব্রত রায় আশ্বাস দিয়েছিলেন মাস্ক আর দূরত্ব এই দুটো মেনে চললে ভয়ের কিছু নেই। ১২ই মে আমি টেস্ট করালাম । কনফার্ম হলাম করোনা পজিটিভ। প্রথম চারদিন বেশি জ্বর ছিল না তবে পঞ্চম দিন থেকে জ্বর বাড়তে থাকলে সচেতন হই। শান্তনু দার পরামর্শ মতো সি টি স্ক্যান করাই। কিছুটা ইনফেকশন ছিল তাই স্টেরয়েড চালু করেন। আমি শান্তনু দাকে রিকোয়েস্ট করি আমাকে ভর্তি নেওয়ার জন্য কিন্তু অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৯ থাকায় আমাকে কিছুতেই ভর্তি নিলেন না, বললেন বাড়িতে থাকলেই হবে। চলে এলাম।মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত ছিলাম কিন্তু দুই দিন পর থেকে আরও জ্বর বাড়তে থাকে আর অক্সিজেন স্যাচুরেশনও কমতে থাকে। আমার স্বামী আবার শান্তনু দার সঙ্গে কথা বলেন। বুঝতে পারি আমাকে ডাক্তারবাবু র সান্নিধ্যে থাকতেই হবে। ভর্তি হতেই হবে জীবনরেখায়।এদিকে সারারাত একটু একটু করে স্যাচুরেশন কমেই যাচ্ছে। প্রোনিং করেছি, যে করেই হোক রাত্রিটা আমাকে কোনও ভাবে কাটাতেই হবে । সারা রাত ঘুমাই নি ।অপেক্ষা করেছি কখন সকাল হবে আর জীবনরেখায় ভর্তি হব। তবে মনোবল হারাইনি সুস্থ যে হতেই হবে আমাকে। কেন যেন বিশ্বাস ছিল ডাক্তারের কাছে গেলেই আমি সুস্থ হয়ে যাব। সারা রাত ভেপার নিয়েছি, জ্বর, স্যাচুরেশন মেপেছি, ব্যাগ গুছিয়েছি আর ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করেছি। মনে একটা জোর এসে গিয়েছিল। সকালে রওনা হলাম জীবনরেখার উদ্দেশ্যে জীবন বাঁচাতে। না, একটু ও কাঁদিনি। ছেলে কে ঘরে একা রেখে স্বামী র সঙ্গে বেড়িয়ে পড়লাম । মিথ্যা কথা বলবো না একবার মনে হয়েছিল, ফিরে আসব তো….. কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল অবশ্যই ভালো হয়ে ফিরব। ভর্তি হলাম। এদিকে জ্বর কিন্তু বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয় বার সি টি স্ক্যান করলেন শান্তনু দা। দেখলেন ইনফেকশন আরও বেড়ে গেছে।।অক্সিজেন চালু হল কিন্তু স্যাচুরেশন ঠিক হচ্ছিল না। শান্তনুদা আর বিপাশাদি কে খুব চিন্তিত দেখেছিলাম সেদিন। অনেকক্ষণ ধরে আমাকে অবজার্ভ করছিলেন। খুব যত্ন করেছেন ওনারা। তবে তিন রাত্রি চোখের পাতা এক করতে পারিনি।খুব আতঙ্কিত হয়ে ছিলাম। চোখ বন্ধ করলেই ভয়ার্ত কিছু ছবি চোখের সামনে ভাসতো। আসলে কিছু পরিচিত মানুষের মৃত্যু আমাকে মানসিকভাবে খুবই দুর্বল করেছিল। সেই তিন রাত্রি এক দাদা (শিবেস দাস)একটু পরপর এসে আমার সঙ্গে গল্প করছিলেন আর আমার মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন যেটা হয়তো আমার ক্ষেত্রে বিশল্যকরণীর কাজ করেছে। আর ছেলের দুটি মন্ত্রও মাথায় ঘুরছিল যেটা আমাকে বাড়ি থেকে বেরনোর সময় বলেছিল…. ‘মা বেশি করে খাবে আর বড়ো বড়ো করে তাকাবে’। যাইহোক ভর্তি হওয়ার চারদিন পর থেকে  বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি একটু একটু করে সুস্থ হচ্ছি।তখন থেকে মনোবল বাড়তে থাকে। সাতদিন পর থেকে আর অক্সিজেন দরকার হয়নি তবে জ্বর টা কিছুতেই কমছিল না। বাড়ির সবাই খুব দুশ্চিন্তায় ছিল। আমার উনার সাথে একদিন ফোনে কথা বলার সময় বুঝতে পারলাম গলার স্বর কাঁপছে, বললেন…. ‘আরেকটু সহ্য করো’। বুঝতে পারলাম আমাকে অনেক শক্ত হতে হবে, যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। শান্তনুদা ও খুব চিন্তায় ছিল আমার জ্বর না কমাতে। প্রয়োজনীয় সমস্ত টেস্টই হচ্ছিল প্রতিদিন। যাইহোক ১২ দিনের মাথায় জ্বর আর আসেনি। কিন্তু অন্য কোনও ইনফেকশন ছিল যার জন্য শান্তনু দা ছুটি দেননি আমাকে। কারণ আমি বলেছিলাম সম্পুর্ণ সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরতে চাই। যেদিন বাড়িতে ফিরলাম সম্পুর্ণ সুস্থ আমি। চোদ্দ দিন আমি ওখানে ছিলাম মানসিক ভাবে কখনও  মনে হয়নি যে আমি কভিড পেশেন্ট। ডাক্তারবাবুরা, নার্সদিদি,বোনেরা, আয়া মাসিরা সবাই খুব ই যত্নবান। আমি ভালো আছি। এইসময় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা সবাই আমার মনোবল যুগিয়েছে। আর ঐ যে, ঠাকুরের আশীর্বাদ, মা র প্রার্থনা, আত্মীয়স্বজন বন্ধুদের শুভকামনায় আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি।

৮ তারিখে করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৫ তারিখ জীবনরেখা তে ভর্তি হয়েছি এবং ২৮ তারিখে বাড়ি ফিরেছি। এই দীর্ঘ ২১ দিনের জীবনযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এটাই বলবো যে করোনার কোনো সিমটম দেখলে একটুও অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, সচেতন থাকুন, করোনাবিধি মেনে চলুন। বিশেষ দরকার হলে *রেড ভলেন্টিয়ার্স ভাই,বোনদের সাথে, স্বেচ্ছাসেবী ভাই,বোনদের সাথে যোগাযোগ করুন। নিজের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে, সমাজের স্বার্থে সচেতন থাকুন।
কারণ ভয় না পেয়ে জয় করতে হবে যে করোনাকে।

51

Leave a Reply