Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার গল্প ঈশ্বরের মহিমা

শৌভিক দাস

কারোর ভাবাবেগে আঘাত করার কোনোরকম উদ্দেশ্য নেই নীচে উল্লেখিত ঘটনায়। সুধী পাঠক এই লেখার বক্তব্যের সাথে একমত নাও হতে পারেন। তবু এই ঘটনা যদি কারোর আবেগেকে আহত করে তবে অনিচ্ছাকৃত সেই কাজের জন্য আমি আগেই তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা এবং দুঃখ প্রকাশ করছি।

ঈশ্বরের ব্যাপারে আমি চিরকাল ভীষণ দ্বিচারী। এই বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনা বা বিতর্কে নিজেকে যুক্তি ও বাস্তববাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আমি তাঁর অস্তিত্ব ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে থাকি। যদিও অনেক দুর্বল সময়ে ঈশ্বর বা ভগবানের প্রতি ভক্তি জানাতে নতমস্তক হতেও লজ্জা বোধ করিনা। তবে জীবনের সাবলীল চলমানতা বিঘ্নিত না হলে আমি খুব একটা ওনার শরণাপন্ন হই না বা ওনার বিষয়ে মাথা ঘামাই না। এক কথায় “ফাঁন্দে না পড়িলে ‘আমি’ বগা কান্দি না”। আমার কাছে তিনি একমাত্র প্রয়োজনের। তবে ঈশ্বর বা ভগবান যাই বলুন না কেন তাঁর প্রতি আমার নমন একদিকে যেমন প্রয়োজনের তাগিদে বা দরকারে, অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে আমার মধ্যে একটা অজানা ভয়ও কাজ করে তাঁকে নিয়ে, কে জানে বাবা না মানলে কিছু যদি হয়! কি দরকার আছে রিস্ক নেওয়ার। সেই কারণে আমাকে আস্তিক বলে ঠাওড়ানোও উচিৎ হবে না আবার সে অর্থে আমি নাস্তিকও নই। আমার অবস্থান এক্ষেত্রে সুবিধাবাদী এটা একেবারে সত্যি। তবে এটাও ঠিক যে, এমন একজনের অস্তিত্ব মনে ভাবতে সত্যিই বেশ প্রশান্তি লাগে যে, একজন আছেন যিনি সবসময় সমস্ত জীবকুলের এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়। তাঁর চোখে কোনো আঙ্গিকেই কারোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবার জন্যই তাঁর সমান ব্যাকুলতা। ব্যক্তিগতভাবে এই গুলোই আমার কাছে ঈশ্বরত্বের সূচক। কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয় ঈশ্বর যদি থাকেন এবং তিনিই যদি এই জগতের ঘটে চলা প্রতিটি কাজের নিয়ন্ত্রক হন তবে তিনি মানুষের মতই তাঁর কাজকর্মে প্রচুর গাফিলতি করে থাকেন। প্রচুর ফাঁক রয়ে যায় তাঁর কাজেও। তা না হলে পৃথবীতে এতদিকে এত রকম বৈষম্য থাকতো না। না না আমি এখানে ধর্মীয় কোনো কথা অথবা ধনী-দরিদ্র বা জাতপাত নিয়ে চর্বিত চর্বণ করতে যাচ্ছি না। জীবনে প্রত্যক্ষ করা ঈশ্বরের এক মহিমা, হ্যাঁ মহিমাই বলব তা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

ছবি তোলার কাজে আমাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠানে যেতে হয়। ছবি বলতে ভিডিও। বোঝার সুবিধের জন্য বিয়েবাড়ির ভিডিওগ্রাফির উদাহরণ কল্পনা করতে পারেন। তবে আমি যে ঘটনাটি উল্লেখ করছি সেটা ছিল এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আমাদের এখানকার এক বিখ্যাত মন্দিরের বাৎসরিক পুজো। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটির ভিডিও করে পরবর্তীতে লোকাল কেবল চ্যানেলে টেলিকাস্ট করতে হবে। এই আমার কাজ। বেশ কয়েক বছর ধরেই মকরসংক্রান্তির দিন আমার এটা প্রায় বাঁধা কাজ হয়ে গেছে। সেই কারণে নিজের থেকে অনেক দায়িত্ব নিয়ে এই কাজটা আমাকে নামাতে হয়। বিশাল এক অনুষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। একদিকে পুজো-আরতি-যজ্ঞ আর একদিকে পদাবলি কীর্তন-ভজন-নামগান। তারসাথে পাত পেড়ে ভোগ খাওয়ানো। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তার পাশে মেলা। সব একসাথে চলে। সে এক প্রকাণ্ড ব্যাপারস্যাপার। দু’দিন ব্যাপী এই পুজোকে কেন্দ্র করে আশেপাশের গ্রামের মানুষজন এইসময় উৎসবে মেতে ওঠেন। তা এতবড় একটা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমার যেমন ভাললাগে তেমনি টুপাইসও আমদানি হয়। আর সেই কারণে এই দু’দিন সর্বক্ষণ স্পটে থেকে কাজের ছেলেপুলেদের পরিচালনা করতে করতে নাওয়াখাওয়া পর্যন্ত হয়ে ওঠে না। তা এবছর এই মন্দিরে এক অদ্ভুত ঘটানার সম্মুখীন হলাম। সকাল থেকেই মন্দিরের বিভিন্ন জায়গায় তিনটে ক্যামেরায় লাগিয়ে দিয়েছি তিনজনকে। আমি অনলাইন এডিটিং-এর ডেস্কে বসে আছি। হঠাৎ তিন নম্বর ক্যামেরায় দেখতে পেলাম পাঁচ কি ছয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলেকে। দেখতে পেলাম বলার চেয়ে বলা ভালো চোখ আটকে গেলো বাচ্চাটার দিকে। সে সম্ভবত তার মা আর দিদির সাথে মন্দির চত্বরে ঢুকছে গেট দিয়ে। ছেলেটার একটা বিশেষ ব্যাপার দেখে কৌতুহল হওয়ায় অনলাইনে অন্য একজনকে বসিয়ে আমি ছেলেটার কাছাকাছি গেলাম ওর কার্যকলাপ দেখার জন্য। দেখলাম ছেলেটা একা একা ওই ভিড়ের মধ্যে তার শিশুসুলভ অস্থিরতায় তড়-বড় করে তার মা আর দিদির থেকে দ্রুত হেঁটে এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের সিঁড়ির নীচে ফিতে বাঁধা জুতো খুলে মন্দির অলিন্দে উঠে লোকজনের ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক্ষণ ধরে প্রণাম করল। এই ঘটানায় আমার ভেতরে অদ্ভুত একটা প্রতিক্রিয়া ঘটতে শুরু করল। ঈশ্বর বলে যাঁকে আমরা মানি বা কল্পনা করি তাঁর প্রতি একটা ক্ষোভ হতে লাগলো আমার। মনে হল ক্ষুদ্র এই শিশুটির উদারতার কাছে মহান ঈশ্বরের গৌরব যেন অতিশয় ম্লান হয়ে গেল এই ঘটনায়। মনে হলো, ঈশ্বর যদি কোনো পদ হতো তবে সেই পদে আসীন যে কোনো বিচারবুদ্ধি বা কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি নিজকৃত অন্যায়ের দায় স্বীকার করে স্বেচ্ছায় তাঁর এই মহান পদ থেকে পদত্যাগ করতেন। আপনারা হয়ত ভাববেন সাদামাটা অতি সাধারণ এই ঘটনায় কী এমন আছে যার জন্য আমি ঈশ্বর সম্পর্কে এত বড় বড় কথা বলছি আমার ছোটমুখে? হ্যাঁ আছে, অবশ্যই আছে। যদি আপনি ওই ফুটফুটে শিশুটির হাতে একটা বাঁশের লাঠি দেখতে পেতেন যা দিয়ে সে তার ডান পায়ের অভাব ঘোচানোর চেষ্টা করছিল, তবে আপনার মনেও এমনই কোনো ভাবনা আসতো। সম্ভবত কোনো দুর্ঘটনায় হতভাগা তার সেই পাটা হারিয়েছে হয়ত। ডান পা হাটুর নীচ থেকে না থাকলেও সে লাঠিতে ভর দিয়েই বেশ অনেকটা পথ এসেছে সেই ঈশ্বরকে প্রণাম জানাতে যে জগতে ঘটে চলা সমস্ত ঘটনার রূপকার। তার জীবনে ঘটে যাওয়া এই অপূরণীয় ক্ষতির পরও ঈশ্বরের প্রতিরূপের সামনে আজও সেচ্ছায় মাথা নিচু করে সে এবং তার পরিবার। হায়রে ঈশ্বরের মহিমা!

104

Leave a Reply