Categories
কুলিক রোববার

স্মৃতি : ৭ : মায়ের জুতো

সাধন দাস

থাকতাম লালদিঘিপাড়ায় খেতাম বাবুপাড়ার মেসে। মায়ের জুতো পরে মেয়েটা আসতো রান্না করতে। মায়ের কাজ আর জুতোজোড়া ওর পছন্দ। ব্যাঙ্কবাবুদের মেসে রান্নাকরা ইজ্জতের। রাতে ওর খাওয়ানো আর আমাদের খাওয়া শেষ হলে ফেরার পথে ওকে ঘরে পৌঁছে দিতাম। যেতে গল্প করতো, বাবা পালিয়ে গেছে। মা লোকের বাড়ির আগুনে রান্না করে শুকিয়ে কাঠ। মরে যাবে। জুতোজোড়ার ছেঁড়া গলিয়ে ইট-পাথরকুচি ঢুকে পড়ে, কিন্তু আরাম। 

দশ পয়সা দিলাম, সারিয়ে নিতে। আবার একদিন রাস্তার আলোর নিচে দেখালো, সাতজন্মের পুরনো, সাততালি, চোদ্দ সেলাইয়ের জুতো, পায়ের কড়ে আঙুল বেড়িয়ে পড়ছে। সেদিন কুড়ি পয়সা দিলাম। আর একদিন পঁচিশ পয়সা। একদিন খেয়াল করলাম, দুটো জুতোর দুটো শুখতলা দু’দিকে ক্ষয়ে যাওয়া, মেয়েটার পা দু’খানা দু’দিকে কাত হয়ে হাঁটে। বললাম- তোকে একজোড়া জুতো কিনে দেবো। 

তক্ষুনি মুখের উপর বলে দিলো- না।  

– কেনো রে? 

– এ জুতো মায়ের, এতে খুব মায়া। 

– দূর বোকা! জুতো ছিঁড়লে পাল্টাতে হয়। 

– মায়ের জুতো কি পাল্টায়? 

 মাইনে পেতেও দেরি! মাথা চুলকে বললাম- তাইতো! জুতোজোড়া দিবি? কোম্পানিতে পাঠিয়ে দেবো। আগুনে গলিয়ে ছাঁচে ঢেলে নতুন করে দেবে। 

অবাক কিশোরী আমার মুখে তাকিয়ে ঝলমল করে উঠলো- তাই! দেখতে একই রকম থাকবে? 

-হ্যাঁ। শুধু নতুন মনে হবে।  

সঙ্গে সঙ্গে জুতো খুলে, ব্যাগের খবরের কাগজে মুড়ে হাতে ধরিয়ে দিলো- সাতদিন কিন্তু, দেরি হলে মা বকবে। 

তারপরই আমাদের ইউনিয়ন ভেঙে গেলো। ছাঁচে ঢালাই নতুন জুতো আর দেওয়া হয়নি। মেসের সবাই এক ইউনিয়নে, আমি অন্য। ওখানে খাওয়া ছাড়তে হলো। মাইনে পেয়ে মেসের হিসেব মেটাতে গিয়েছিলাম। মেয়েটার মা মারা গেছে। সে আর কাজে আসে না। মেয়েটার পুরনো জুতো কেড়ে নিলাম, কিন্তু নতুন জুতো দিইনি।  

36

Leave a Reply