Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : মুক্তগদ্য : ‘বাবা’ নামের শব্দটি

অজিত রায়

ফেলে আসা কৈশোর, উঠতি যৌবনের বিলুপ্ত স্মৃতির হাহাকার মনকে উন্মনা করে, প্রলেপও দেয়।  বাবা মারা গেলেন ১২ মে ১৯৭৯,  দিনটি ছিল বুদ্ধপূর্ণিমার।  এরপর মা হয়ে গেল পরবশ, আমরা পাঁচ ভাইবোন হয়ে পড়লাম আত্মবশ।  মা চলে গেলেন এ বছর ফেব্রুয়ারি, ছিলেন বটে, কিন্তু যেনবা না-থাকারই অন্ত্যমিল।  আমি আমার কথা, একান্ত আমার স্মৃতির কোদাল চেঁছেই বলি।  আমারও তো রোদেধুপে বয়স কম হল না।  মুখে রুদ্রপলাশ ধরে গেল, আগে ছিল বনপলাশী।  কে আর পথ চেনালো, এইদিকে হাঁটো।  পরে সবাই কেন বলে ভুল পথেই হেঁটেছি আমি?  তোমার জীবনচর্যার আলোয় পোকা ভাসছে, জীবনরাজ্যে দৈন্য, তবু উড়ালবৈভব আসে, এসেছে।  এখন প্রতিটি ভোর সৃষ্টির বীর্য খোঁজে।  রবির রাগে ফিকে হয়েও কুয়াশা তবু রোজ ফোটে।  হঠাৎ টুপ করে অতলে যাবার সাধ জাগায় আবার তোমার কাছেই ফিরছি দ্যাখো, ও প্রহেলিকা, সেইরকমই বৃষ্টিভেজা লোকাল ট্রেনে।

     নদ বরাকর তলায় ফেলে, কুমারধুবির মাথায় চড়ে, ধান-কমানো ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ধাঙি পাহাড়ের কোল বেয়ে, জংলা গাছের সারি চিরে ট্রেন ঢুকল ধানবাদ জংশন।  কলকাতার ফ্ল্যাট থেকে আসছি, বাঁশদ্রোণী, অতখানি জার্নির ধকল, কিন্তু অদ্ভুত!  যেন এই চা-বিস্কুট খেয়ে, এমনই, যাবো কিন্তু বহুদূর।  সদর থেকে সুদূর।  প্রায় ৯ মাইল তো হবেই।  বাবা বলতেন মাইল।  আসলে ১৪.৬ কিমি।  বাবার ভাষায় বোঝাতে হলে ৮.৭ মাইল।  অথবা, সোজাসাপ্টা, ৭.৬ নটিকাল মাইলস।  চল্লিশ মিনিট পাক্কা।  আগে বাস ছিল, ট্রেকার ছিল, এখন অটো কিংবা টোটো।

     আ, কতকাল পর আমার জন্মভূমি!  সিএফআরআই কলোনি!!  শুনেছি আজ সমস্ত ডিক্লাইনড, খণ্ডহরের পথে, দিনে শেয়াল ডাকে।  তবু কী এক অজানা নেশার ডাকে চলেছি আমার প্রিয় জন্মভূমি।  ঝরিয়া পেরোতেই ক্ষণে ক্ষণে মনে হয় এই বুঝি এসে পড়েছি।  এই রোকো!  চিনতে কষ্ট, বছর তো কিছু কম হলো না, প্রায় চল্লিশ।  হঠাৎ হঠাৎ লোহার মস্ত গরাদ দেখলেই মনে হয়, এই রোকো-রোকো, এসে গেছি।  আসলে কিন্তু অনেকটাই অচেনা।  চেনার ঘরে দুটি একটি।  অনিল টকিজ, ফুসবাংলা, জোড়াপুকুর, বিসিসিএলের স্টেডিয়াম, দশনম্বর ডিগুয়াডি, বিয়ন্ত সিংয়ের ঢাবা, ভাগাড়ে শকুনদের কালালি, মহাবীর টকিজ।  সব যেন কাল-পরশুর দেখা।  অটোর মালিক জানায়, না সাহাব, অনিল টাকিজ তো অব গুদাম বন গয়া।  সুনীল টাকিজ মে কপড়া কা মাল (মল) খুল গয়া।  হবে হয়ত।  চোখ কিরকির করে।  কয়লাগুঁড়ি, ধোঁয়াধক্কড়, হল্লাগুল্লা, চুহা মারে কা দবাই সেই আগের মতই।  মহাবীর টকিজ আসতেই ধ্বক করে উঠল বুকটা।  আমার মায়াপুরী।  কত বিপুল ছবি, কত কত হিরো, ভিলেন, মেহমুদ ও হেলেন আমার উপাসনায় বুড়ো হয়েছে।  কিন্তু না, অটোবাবু জানালেন, এটাও নাকি সেই কোন কালে ভোগে চলে গেছে।  মহাবীর বাবু কা দামাদ চলা রহা থা, উ ভি গুজৱ গয়া।  খালি মার্কিট বচা হ্যায়।  রুগ্ন, জীর্ণ, পরিত্যক্ত দৃশ্যপট।  কয়লার ডাস্টে গতর কালিয়ে ঝিমঝিম করছে।  হ্যাঁ, চন্দনদার স্টুডিওটা আছে।  ম্যাট্রিকের ফর্ম ফিলাপের সময় তিনটে পাসপোর্ট সাইজ, মনে আছে।  বোস মেডিক্যাল স্টোর।  ওটা বিশ্বনাথদের।  পাশে চপ-সিঙাড়ার দোকানটাও দেখি পূর্ববৎ।  হাফ টাইমে বেরিয়ে কুড়ি পয়সায় উজ্জ্বলন্ত গরম একটা শালপাতায় নিয়ে, রিংরিংরিং বেল বাজতে না বাজতেই ফিনিশ।  ওঃ, হো হো হো —- বস বস, রোক দো ভাই।  পহূঞ্চ গয়ে।

     সিএফআরআই কলোনির মেন গেট।  এখন আর উইকেটটা নেই।  উর্দিও পাল্টেছে।  একটু আগ-বাড়িয়ে দাঁড়াল। — কাঁহা জানা?

     বললাম, —- কলোনি।

     কালৌনি!! — খুবই অবাক।  খানিক সন্দিগ্ধ।

     ১৯৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ছিল নিস্ক্রমণের তিথি।  আজ ২০১৮ সালের অগাস্ট।  এত যুগ পরে নিজ জন্মভূমিতে পদার্পণ, নিজেকেই তো কেমন অবাক, সন্দেহভাজন লাগছে।  একটা বেড়াল ভীরু ও সন্দিগ্ধ চোখে জরিপ করল।  আমারও ঋজু, কম্পিত, ভীরু, উত্তেজিত পদক্ষেপ।  রাস্তার দুপাশের ঝাউগাছ, হ্যাঁ, চেনা।  ট্রিঅং করে একজন সাইকেল করে পেরিয়ে গেল, হ্যান্ডেলে বাজারের থলি, চিনতে পারি না।  নিজেকে কেমন লাজুক-লাজুকও ঠেকছে।  অচেনা কেউ অল্প হাসি ছড়িয়ে দাঁড়ালে চমকে উঠব।

     বড় রাস্তাটা কখন পেছন ছেড়ে কলোনির দিকে এগোতে শুরু করেছে খেয়াল হয়নি, যেন একটা মৃত উপত্যকায় পথচারী একা, অনেক অনেক দিন আগে দেখা স্বপ্নের মত, অপরিসর বুনো সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে, একা।  মরামরা সরু পিচসড়কগুলো কেমন যেন হুড়মুড়িয়ে উঠল জেগে, অপ্রত্যাশিতের আবেগে অবাক, নিরর্থকের মত দৃষ্টিহীন চাউনি।

     হঠাৎ এক চেনা গন্ধ, সেই নিপাট দীঘল অর্জুন গাছটা।  দু-একটি পাতা উড়ে এসে মাথায় বসল।  প্রথম পরিচিত সাক্ষাতের মতন।  তারপর একে একে জাগতে শুরু হঠাৎ নিভে যাওয়া আলোর মত পরিত্যক্ত ডিস্পেন্সারি, স্টোর, ক্যান্টিন। জানালাগুলো কারা খুলে নিয়ে গেছে।  বিল্ডিংয়ের গা ছুঁয়ে চাগিয়ে ওঠা আগাছার জঙ্গল।  ওষুধ ওষুধ, ডেটলের গন্ধ।

     বাবাদের আপিসে ঢোকার লোহার গেটটা বন্ধ।  তালা মারা।  কোনো প্রহরী নাই।  ডিউটির ভোঁ আর বাজে না বহুদিন।  ভেতরটা প্রৌঢ় মুনিশের মত নিঝিম।  প্রেত হানা দেয় দিনে রাতে।  বাবা ওই গেট দিয়ে কুব্জদেহে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে যেতেন।  যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠা শরীর।

     পাশেই সেই বড় লেকটা।  রেলিং ঘেরা।  বাবারা পাড়ে বসে মাছ ধরতেন।  আজ জনশূন্য, রিক্ত, পরিত্যক্ত।  এমনকি, আকাশও যেন কান্নায় ঢাকা, এমনই মলিন, মাদকতাহীন, নিঃসীম।  পাঁচিল ধারের বহু কোয়ার্টার্স থেকে দরজা, জানালা, পাল্লা, পাইপ গায়েব।  বড় বড় ঘাস, আগাছা, পোকামাকড় আর মশার হাইড পার্ক।  চোরকাঁটা।

     জনশূন্য বিশাল মাঠ, কতিপয় বেগানা মোষ চরছে কেবল।  মাঠের ওপারে গেট দিয়ে বেরুলে যে রেললাইন, সেটা ছিল আমাদের দ্বিপ্রাহরিক রাজ্যপাট।  আমার আর মিষ্টির।  আমরা সারাদুপুর নুড়ি আর চকমকি খুঁজে বেড়াতাম।  সেই মায়াতুর রেললাইন আজ ছেঁড়া ঘুড়ির বিবর্ণতায় সুরিন।

     আমাদের বাসার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আমার জন্ম, আমার শৈশব ও কৈশোর, তারুণ্যেরও কিছুখানি।  গতি পুনরায় শ্লথ, শুকনো, ভীরু ও লাজুক।  ছোটবেলার সেই আপ-ডাউন সুদীর্ঘ ও প্রশস্ত সড়কগুলো কত ছোট, কত শীর্ণ ও ম্রিয়মাণ ভাত হয়।  ইটগুলো আজ বেতরতিব, কালভার্টের তলা শুকিয়ে, কোথাও কোনো কুকুর অবধি নেই, এমনই নির্জীব, ফাঁকা, বিষণ্ন।  কী শুঁকে কী না বুঝে ঈষৎ দাঁড়িয়ে পড়ি।  রায়কাকুর কোয়ার্টার।  ওই তো ডালিম গাছটা।  মিষ্টি আর আমি তলায় মার্বেল খেলছি।  এমন যদি হতো, মিষ্টির সঙ্গে আমার বিয়ে যদি হতো?  কিন্তু তার কি আজ আমায় মনে আছে?  ভুলে যাবারই কথা।  ফেসবুকে কি পাওয়া যাবে মিষ্টিকে?  কী নামে?  ওর আসল নামটাই তো জানা হয়নি কোনদিনও।  সেও কি আমার নাম জানে?  কী তার এখনের পদবি?  ওর স্বামী কি ডাক্তার, নাকি ব্যাংক অফিসার?  ভারি সুন্দর, টলটলে, খানিক মহুয়ার মত ছিল দেখতে।  অপরূপ দীঘল আঁখি ছিল, কী অপরূপ আর-সব!  তারও ছিল পাকা মালভোগের মতন গায়ের রং — মিষ্টির নাম কি জয়ন্তী হওয়াও অসম্ভব?

     কী অদ্ভুত।  এই প্রথম একটি কুকুরী, তারও গায়ের রং কালো, অবিকল টমির মত দেখতে, সরু কোমর, জনমানবহীন খণ্ডহর হতে যেন আমার সাথে সাথে বাড়ি অব্দি যাবে বলে উঠে এলো।  গন্ধটাও অবিকল টমির।

     খুব কাছে এসে পড়েছি।  শিবমন্দির অব্দি না নেমে এবার ডাইনে বাঁক নিলেই আমাদের কোয়ার্টার।  দূর থেকে মনে হলো আমাদের কোয়ার্টারটা অমনি আছে।  আমরা থাকতাম আমাদের এই কোয়ার্টারে।  আমরা পাঁচ ভাইবোন, বাবা-মা।  কেমন যেন লাগে, গলায় ঢক করে কিছু লাগে।  গলা শুকিয়ে আসে কেন?  সামনে আসতেই দৃষ্টি সমুচয় ঝাপসা।  আগাছা, বাগান, কল্কে গাছটা, অত বড় বাড়ি — কিছুই আর গোচর নয়।  সব ঝাপসা, ধূসর।

    একটা দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করে অল্প এগিয়ে গেলেই, দেখি সামনেই কে-একজন মানুষ শুয়ে আছে, চোখ নেই, দুটো গর্ত, শুয়ে আছে তার আধফাঁক বোতলটিও।  কাইয়ুম চাচাকে ধরে তুলতে গিয়ে টের পাই, মৃত।  একটা অন্তর্বাস ঝুলছে, মিষ্টির।  মিষ্টিরই প্রতিভাত হলো, তালাটালা মারা বাসার সমুখে একা-একলা ডালিমতলার মেয়েটি।

     দোতলা-সাইজের পেয়ারাগাছটা দেখতে পাই এবার।  ন্যাড়া, একটিও পাতা অবশিষ্ট নেই।  বাবার প্রতীক।  বাবাই যেন, নির্জীব, দু-শাখা বাড়িয়ে।

     আমরা পাঁচ ভাইবোন এখনও জীবিত।  মা এই সেদিন গত।  মায়ের স্মৃতি কোনোরকম আর ঘা করে না।  বলতে পারি, একা আমাদের মধ্যে আমাদের বাবাই আজ নেই।  ‘বাবা’ শব্দটি, ব্যাপারটি নয়, আজও উন্মনা করে; বড় ভালো রকমই করে, উহা যেন শব্দমাত্র নয়।  তাহা যেন বর্ণগন্ধ — ক্রন্দসী জীবন যেমতি শূন্য লইয়া উড়াউড়ি করে।  পৃথিবীর কোথাও এখনও যেন আমার বাবা বেঁচে আছেন।

92

Leave a Reply