Categories
কুলিক রোববার প্রথম পাতা

কুলিক রোববার : গ্রন্থ সমালোচনা

বিনীতা সরকার

গ্রন্থ : মাতব্বর-বৃত্তান্ত’
লেখক :সুবীর সরকার
প্রকাশক : গাঙচিল
প্রথম প্রকাশ:ডিসেম্বর ২০১৮
প্রচ্ছদ- বিপুল গুহ
মূল্য- ২০০ টাকা
আলোচক: বিনীতা সরকার

কবি ও গদ্যকার শ্রী সুবীর সরকার। উত্তরের আপন মানুষ,প্রাণের মানুষ শ্রী সুবীর সরকার। উত্তরের মাটি ও মানুষ জড়িয়ে বেঁচে থাকা, উত্তরের লোকগান জড়িয়ে বেঁচে থাকা সদা হাস্যজ্জল প্রাণবন্ত এক মানুষ তিনি। খুব সম্প্রতি পড়লাম তাঁর লেখা মাতব্বর বৃত্তান্ত, উত্তরের প্রান্তিক মানুষের জীবন গাঁথা। উত্তরের প্রান্তিক মানুষের জীবন ও যাপন নিয়ে লেখা মাতব্বর বৃত্তান্ত বইটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ। এই উত্তর বাংলার যাঁরা প্রাণভোমরা, সেই সব মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের জীবন যাপন, জীবিকা,ভাষা,উপভাষা,লোকাচার,লোকসংস্কৃতি, বর্ণাঢ্যতা,জীবনগান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই আখ্যানের নানা দিকে।

কাহিনীর শুরু হয় লেখকের শৈশবের স্মৃতিমুখর দিনগুলোর কথা দিয়ে।সীমান্ত মফস্বল শহর কোচবিহারের মাথাভাঙা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মানসাই আর সুটুঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে তার শৈশববেলা কেটেছে। এখনো চোখ বন্ধ করলেই লেখক মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যান সেইখানে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পান ডুয়ার্সের সারি সারি চা বাগান, জঙ্গল,সাঁকো, ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়ি নদী, সোনালী ধানের ক্ষেত, সারি সারি বিছানো সুপারি বাগান, বাড়ির সামনে উন্মুক্ত খোলান বাড়ির মায়া। এখনও মনে পড়ে তাঁর সোমবারের রংদার হাটের কথা। আর হঠাৎ করেই ফিরে যান কাকা-জ্যাঠা- ঠাকুরদা-পিতামহের স্নেহে ঘেরা যৌথ জীবনের ঘোরাটোপে। এখন জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে শৈশবের স্মৃতিরা তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। আর তিনি ও পাঠকেরা আস্তে আস্তে ঢুকে পড়তে থাকেন এক মায়া ঘেরা তাঁবুর ভেতর।
নদীর সাথে তাঁর আছে এক গভীর সখ্যতা। নদীকে ঘিরেই তাঁর জীবন। কখনো তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন মাটির বাঁধের পাশে দূর থেকে দেখেন নদী জীবন, দেখেন ডিঙ্গি নৌকা মাঝি জেলে, নানা রকমের মাছ ধরার জাল, নদীর চর,কাশফুলের ঝোপ, ঝুঁকে পড়া শান্ত বিকেল, মেঘ ভর্তি আকাশের গম্ভীর আলাপ। এক প্রবল জীবনগান তাড়া করতে থাকে তাঁকে যেমনটা আর সবাইকে । সেই গান উত্তরের একান্ত আপন,সেই গানে মিশে থাকে দোতরার সুর, সারেঙ্গীর সুর। কখনো সেই গান বুকে নিয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে লেখক ঢুকে পড়েন কোন এক রহস্যময় জঙ্গলে। সেই গভীর জঙ্গল ঘুরে তিনি আবিষ্কার করেন জঙ্গলি নিজস্ব শব্দাবলি, কাঠ কাটার করাত, ঝাঁকরা ঝাঁকরা গাছের সারি, কাঠ কুরানি মেয়েদের দল আর ঝিম হয়ে নেমে আসা গানের সুর। এসব কিছু তাঁকে আরও একা করে দিতে থাকে নিজের ভেতর। তুমুলভাবে একা হয়ে যেতে থাকেন তিনি। গুহা গাত্রে ঝরণার ছবি” আসলে আমাদের সকলের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা সেই শৈশবের দিনগুলি অনুরণন যা আমাদের ভিতরে একান্ত গভীরে লুকিয়ে রাখি আমরা। বয়স এগিয়ে যাবার সাথে সাথে আবার ফিরে তাকাই সেই দিনগুলিতে। এ যেন এক মায়াময় জাদুঘেরা জগত। উত্তরের মাটির টানে, মানুষের জীবন গানে মিশে যায় শত শত বছরের পুরনো গল্প। দেশী-ভিনদেশী মানুষের গল্প। তারা ফুরিয়ে যাবার পরেও মিথ হয়ে ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে মুখে, হাটে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে,বাজারে,আর ডানকান সাহেবের কবরের পাশে। বড়াইকবাড়ির আকাশে বাতাসে ভাসে সে গল্প। বন্ধুক হাতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটতে থাকা সেই ডানকান সাহেবের গল্প। উপসংহার এর বদল-এ লেখক লিখে গেছেন ডানকান সাহেবের জীবনে ফিরে আসার গল্প। আসলে ডানকান সাহেবদের চলা তো কখনও শেষ হয় না। কিছুক্ষণ বিরতি নেবার পর আবার তাঁরা ছুটতে থাকেন। আর তাঁর ঘোড়াটি নদী হাট ঘাট জঙ্গল পেরিয়ে খুব দ্রুত ছুটে যায় অতিকথনের এক দুনিয়ার ভেতর। ঘোড়ার খুরের শব্দ ধীরে ধীরে গানের মধ্যে মিলিয়ে যায়, উত্তরের জীবনের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এপিটাফে লেখক লিখেছেন “নদীর ভেতর নদী শুয়ে থাকে।” নদীর স্রোতে লুকিয়ে থাকে কাল চক্র। সময়ের প্রবাহ শরীর যেন এই নদী। ‘হেরম্ব বর্মন’ এই উত্তর বাংলার ধুলো মাটি মাখা মানুষ বলে যান এই নদী আখ্যান। আর তখনই নদীর ভেতর থেকে উঠে আসতে থাকে তুমুল এক নদী। লোকগাথা হয়ে সেই জল গড়াতে থাকে সময়ের স্রোত ধরে। উৎসবমুখর এক বাংলার ছবি এঁকেছেন সুবীরদা নিজের দক্ষ হাতে। এই উৎসব গ্রাম বাংলার নিজস্ব উৎসব। এই পরব শুরু হয় ছোট্ট শিশুর জন্মের মত দিয়ে রাজবংশী মেয়েদের দলবদ্ধ নাচে। জীবন যার কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব সেই মাটির মানুষ বলেন-” লোকায়ত ভুবন যার ভেতর থেকে আমার আর কোনদিনই বেরিয়ে আসা হবে না। অথচ ব্যাধ যুবকেরা সব একদিন ভুলে যাবে প্রলাপকথন। আর মাটির উঠোন থেকে অনিবার্য কিছু গান গোটা জীবন আমার সঙ্গে থেকে যাবে।”এইসব টুকরো টুকরো সময়যাপন অভিজ্ঞতা সবকিছু তাকে বহুমাত্রিক জীবনের পথে নিয়ে চলে। তিনি বলেন গাছের পাতায় আঠা মাখিয়ে সারাদিন ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করা “বাবুলাল বাশফোঁড়ের” কথা। আর বলতে থাকেন তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসে থাকা তাঁর তরুণ বন্ধুদের কথা। তিনি বলেন “বাঁশের সাঁকো থেকে দীর্ঘতম সুরঙ্গ পথ সমস্তটাই আমার কবিতা জীবন।” এভাবেই উৎসব গাঁথা রচিত হতে থাকে। নদীয়া হোলাই নদীর জলে মিশে থাকে জীবনের সুর। তেমনি নদীর ধারে বসে ভালুক মিয়া একজন জন্মান্ধ লোককবি শিস দিয়ে ভাওয়াইয়া সুরে জীবনের গান তোলেন। সুবীরদা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন সেই ভালুক মিয়ার সঙ্গে। এখানেই সুবীরদা তারঁ অসামান্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এই ভালুক মিয়া জীবন-জীবিকার তাগিদে নানারকম পশুপাখি ডাক নকল করে বন্দরে মফস্বলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এভাবেই ভালুক মিয়া ঢুকে পড়েন উত্তরের জীবনে। আর সাইকেল ঘনঘন দাঁড় করিয়ে রাজবংশী সম্পন্ন কৃষকদের গাড়ি-ঘোড়া বৈঠকখানা ঘরে বসে সুবীরদা দোতারার আওয়াজ শুনতে থাকেন। এভাবেই আবিস্কারের ভরে ভরে উঠতে থাকে তাঁর ঘটনাবহুল বর্ণময় জীবন। এভাবেই তিনি বন্দী হতে থাকেন উত্তর বাংলার লোকায়ত ভুবনের মায়া আর জাদুতে।

এই উত্তর বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জোতদার আর মাতব্বরের গল্প। যেমন আছে ইয়াসিন মাতব্বরের গল্প,তেমনি ধনকান্ত জোতদারের গল্প। আর তাদের জীবন জুড়ে ছড়িয়ে থাকে এইসব ইতিহাস আর রাশি রাশি মূহুর্তরা। “মাতব্বর-বৃত্তান্ত” ছুঁয়ে থাকে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের জীবনের ইতিহাস। হঠাৎ গল্পে এক আলোহীন, সাঁতার হীন জীবন যাপনের নেশার টানে ইয়াসিন মাতাব্বর উঠে দাঁড়ায়। তারপর দীর্ঘ এক হাঁটার জন্য পরিক্রমণ এর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। আর শেষে,’মাতব্বর’ হাঁটা শুরু করেন জোতদার টাড়ির জঙ্গলের দিকে। জঙ্গল অতিক্রম করে তাকে দ্রুত পৌঁছাতে হবে একশ ঘোড়ার ধনকান্ত জোতদারের বাড়ির খোলানে।’ সেই সঙ্গে আরও অনেক নতুন নতুন গল্প জুড়ে যায় তার চলার পথে। জুড়ে যায় চা বাগানের গল্প, জঙ্গলের গল্প, বাগানের ফরেস্ট বাবুর গল্প, শালকুমারের জঙ্গল থেকে বাঘ বেরিয়ে আসার গল্প, মাতব্বরের ভাই ইয়াসউদ্দিনের গল্প, বুধুরাম মাহুতের গল্প, নদীর পাড়ে জঙ্গলে ঘুরতে থাকা একাকী ময়ূরের গল্প। এত এত গল্পের মধ্য দিয়ে চার কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই ইয়াসিন মাতব্বর ধীরে ধীরে ঘুমের ভিতর ডুবে যেতে থাকে। জোতদার নেই এখন আর শুধু জেগে আছে যত জোতদারটাড়ি। আর তাদের গল্পেরা জেগে আছে গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে।

গাথাশোলক আসলে জীবনের শোলক গাথারা। যে গাথার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কখনো ঢুকে আছে মকবুল বয়াতির দোতারার সুর,কখনো নজরুল গীতির মরমিয়া গান-‘আইসো মোর কলাচান/যাও খাইয়া যাও বাটার পান….।’এসব গানের ভেতর দিয়ে হাল্কা ব্যথার সুর বেজে ওঠে। মন কেমন করে ওঠে। জোতদারের ধানের গোলায় আগুন থাকলেও তার মুখে তখন তেভাগার গল্প ওঠে। আগুন শেষ হলেও গল্প শেষ হতে চায় না। এদিকে ভালোবাসার পাশের সন্ত্রাস রক্ত, লালসার আগুন জ্বলতে থাকে। জন্ম মরণ লিখতে থাকে বাজপাখি। নদীরা তাঁকে টানে। নদীপথে কতশত কাহিনীর জন্ম হয়। রাতে মিশে যেতে থাকে লোকগান আর লোকবাজনা। নদীকে উপাস্য দেবতা ভেবে আমাদের উত্তর বাংলায় গান বাঁধা হয়। আর উত্তরবঙ্গের রাজবংশী মহিলারা দলবদ্ধ নাচের মাধ্যমে ঢাকের তালে তিস্তা বুড়ির পুজোয় মেতে ওঠে। মদ্যপানের পর লেখক ফাঁকা মাঠ অতিক্রম করতে থাকেন আর বলে যান সেই মুল্যবান বাক্যবন্ধ যা পাঠক হৃদয়টা আন্দোলিত করে- ‘জীবনে আসলে কিছুই নষ্ট হয় না। সমগ্র আয়ুপথ পথ জুড়ে কেবল অর্জন আর পাওয়া।’ সত্যি তো তাই জীবনের পথ জুড়ে কেবলই রয়েছে অর্জনের সম্ভার। তাই মন খারাপের আয়নায় নিজেকে না দেখে লেখক আত্মপ্রত্যয়ী,আত্মবিশ্বাসী হতে উদ্বুদ্ধ করেন। আর ঘটনার বর্ণনা মধ্য দিয়ে আমাদের নিয়ে যান সরু সরু মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া বা হ্যাজাক বাতির আলোয় উদ্ভাসিত এক শান্তির উঠোনে।

বাওকুমটা বাতাস যেন মন কেমনের ডাক দিয়ে যায়। মানুষকে ভেতরে ভেতরে একা করে দিতে থাকে। যৌথতার গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া মানুষ আস্তে আস্তে হেঁটে যেতে চায় দিগন্ত পেরিয়ে আরো দিগন্তের ভেতর আর মানুষ হতে থাকে ভিতরে ভিতরে আরও একা। এদিকে জীবনের মাঠের ভেতর দিয়ে সুপারি বাগান, শুকনো সাঁকো পেরিয়ে হাঁটতে থাকেন পালা গানের মাস্টার টরেয়া বর্মন,তেমনি ধানহাটিতে নাচতে থাকেন বুধেশ্বরী বুড়ি, কইতরের গান বুকে বাঁধেন হরিকান্ত। আর এই সব কিছু নিয়েই জীবন যেন জীবন হয়ে ওঠে।
তবুও মানুষ নৌকা ও মাঝির সম্পর্কের মতন, দোতরা ও গীদালের সখ্যতার মতন, জীবনের সংকোচন-প্রসারণের ভেতর দিয়ে নির্জনতার পথ খুঁজতে গিয়ে চির বিস্ময় নিয়ে জেগে ওঠে। আর জেগে ওঠে শোক ও শ্লোক বাহিত জীবনগান যা গল্পের পাকে পাকে জড়িয়ে নেয় আমাদের।

জোতদারটারির গল্পে থাকে চাচামিয়ার গল্প, তাঁর জীবনের গল্প,তাঁর স্বপ্নের গল্প, তাঁর স্মৃতিময় শান-বাঁধানো মায়াময় পুকুর ঘাটের গল্প। আর এত এত এতয় গল্পের সাথে জুড়ে যায় পাইকার মিসকিন কবিরাজের গল্প। এই গল্পে আস্তে আস্তে জুড়তে থাকে সেতু ঘাট মাঠ পেরিয়ে জিকির গান জলসার আসরের বেড়ানোর দিনগুলির কথা, কার্তিকের পৃথিবীতে চাঁদ আলোয় জনবসতিহীন পৃথিবীর প্রান্তরে নতুন নাচ নতুন গানে মত্ত এক যৌথ জীবনের কথা। এভাবেই ‘চাচামিঞা তাঁর বৃত্তকে সম্প্রসারিত করে তুলতে থাকে প্রসারণের গতি প্রকৃতির খণ্ড-বিখণ্ড জুড়ে জুড়ে অনবদ্য এক জীবন যাপনের তাল পাকানো আদিমতায় নিঃশঙ্ক ফিরে আসতে থাকে।’ এই গল্পেই উঠে আসে গৌরীপুরের রাজবাড়ির কথা, মাটিয়াবাগের রাজকুমারীর কথা। রাজবাড়ীর দিকে যুগপৎ উড়ে যাওয়া কুয়াশাও গানগুলির কথা। এভাবেই বসন্ত মালি, সীতানন্দ বুড়া, বাইদর হাতিরা, গদাধর, অতি পুরাতন মিথ জালক, জঙ্গল হাতি,জোতদারটাড়ির সুউচ্চ টংঘর, চাচামিয়ার গল্পের গোলকধাঁধা সবকিছু মিলিয়ে গড়ে এক মায়াময় যৌথতার জোতদারটারি।

মাহুত বন্ধু রে আসলে জীবনের কথা বলে। এক দরদিয়া মরমিয়া জীবন গানের কথা বলে। জীবন গানের সাথে লেগে থাকা দরদের কথা বলে। এখানে আছে উঁচু টিলার ওপর রাজবাড়ীর লালটিয়ার কথা, নদিয়া হোলার কথা, বসন্ত মালি, সুধীর রায়, সীতানন্দ বুড়ার ঢোল দোতরা, লালজী রাজা, রাজকুমারীর কথা। আছে বাঘ শিকারের গাঁথা, হাতির মাহুত, নবনী গড়িয়াল ও মৈশাল বন্ধুর কথা। এসব গল্পের সাথে জুড়ে যায় রাজ বাহাদুর এর শিকার জুলুসের কথা, প্রতাপ সিংয়ের কথা, রঘুনাথ মাহুতের কথা, আলাউদ্দিন ভাইজানের গানের প্রলম্বিত সুরের কথা। এসব সুর ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিত হয়ে বৃত্তাকারে আবর্তিত হতে হতে জীবনের ভেতরে বেজে ওঠে। ‘জন্ম-জন্মান্তরের এইসব গল্প গুলি জন্ম-জন্মান্তরের এক আবহমানতাই এনে দিতে থাকে। যেভাবে ‘গান,লোক মানুষের এক পৃথিবী, ভালোবাসার এক ঘোর, অজস্র হাতি বা হাতের উত্তাপ’ রাজকুমারীকে হস্তী কন্যায় রূপান্তরিত করে দিল। আর তাঁর গানের ভেতর দিয়ে জীবনের যাবতীয় স্তব্ধতা ভেঙ্গে যায়। ফিরে আসতে থাকে গমগম গমনাগমন। এই গল্পে মাহুত আসলে মাহুত থাকে না। হাতির পেট থেকে নেমে এসে তিনি হয়ে ওঠেন অতি মানুষ। আর হাতি মাহুতের গান ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে।
‘ তোমারা গেইলে কি আসিবেন
ও মোর মাহুত বন্ধু রে…’

হিজড়া পুরাণে সুবীরদা এঁকেছেন উত্তরবাংলা বৃহন্নলাদের ছবি। যাদের ‘ লিঙ্গ নেই। যৌনতা নেই। যৌনাচরণ নেই। যারা শোক ও শ্লোকের কুয়াশার আড়াল থেকে বারবার মনে করিয়ে দেন ‘জীবন-মৃত্যু শাসিত। দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙ্গিলা দালানের মাটি।’ আর তাই হরসুন্দরীরা, টিয়া সুন্দরীরা নাচে-গানে এক উন্মত্ত জীবন কাটাতে কাটাতে জগতকে দিয়ে যান এই অমোঘ বার্তা। আদতে হিজড়া পুরাণে বৃহন্নলাদের মাধ্যমে জীবনের এই অমোঘ সারসত্যটার কথাটাই সুবীরদা বলেছেন।

সুবীরদা তাঁর বলিষ্ঠ তথা দরদী লেখনীর ছোঁয়ায় উত্তর বাংলার জীবন গাঁথা তথা মাটির খুব কাছাকাছি থাকা মানুষদের জীবন আখ্যান অত্যন্ত নিপুণতার সাথে উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। এইসব মাটির মানুষদের ভালোবেসে নিজেও জড়িয়ে গেছেন মায়া ও ছায়ার ভেতর বারবার। এই মানুষরাই উত্তর বাংলার প্রাণ, তাঁরা এখানকার মূল চালিকাশক্তি প্রকৃত অর্থে মাতব্বর। তাঁদের জীবন-জীবিকা, ভাষা,লোকসংস্কৃতি সবকিছুকে নিপুন হাতে গেঁথে, বুকে ধারণ করে সুবীরদা প্রকৃত অর্থেই “মাতব্বর বৃত্তান্ত” নামক এক অসাধারণ জীবন আখ্যান উপহার দিয়েছেন আমাদের যা প্রকৃত অর্থেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

73

Leave a Reply