Categories
প্রতিবেদন

এক ডক্টর কি মৌত

শ্রাবণী ভট্টাচার্য

সদ্য প্রয়াত ডাক্তার অশোক ব্রহ্ম এর মৃত্যু সংবাদ শুনে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের যে প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে মানুষের ভালোবাসা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।আমি সাধারণ মানুষ।রোগে ভোগে ভোগা মানুষ।আমার সীমিত জ্ঞান তাই ব্যক্তি নির্ভর।আমার নিজস্ব উপলব্ধি এই যে,ডাক্তার আর রুগীর মাঝখানে একটা মানবিক বন্ধন গড়ে ওঠা জরুরি।শ্রদ্ধা,বিশ্বাস,আর ভরসার বন্ধন যে কতটা তীব্র হতে পারে,তার প্রমাণ আমি জীবনের বহু ক্ষেত্রে বহুবার পেয়েছি।একজন রোগ জর্জরিত রোগী যখন একজন ডাক্তারবাবুর কাছে যান,তখন সে যে শুধু চিকিৎসা খোঁজেন,তাই নয়,খোঁজেন একটা মানসিক আশ্রয়।রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস।একজন মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন ডাক্তার বাবু,রোগীকে তাই দেন,দেওয়া উচিৎ বলেই আমি মনে করি।যাকে ডাক্তারবাবু তার observation এর আওতায় এনেছেন,তিনি শুধু object নন,তিনি মানুষ।আর তখন থেকেই ডাক্তার আর রুগীর সম্পর্কের সূচনা।শুধু প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেই আর কয়েকটা টেস্ট করাতে বললেই,তার দায়িত্ত্ব শেষ হয়ে যায় না ।তার দুটো ভালো কথা,দুটো অভয় বাণী,আমি তো আছি,এই ভরসা রোগীর মনে এক অদ্ভুত সাহস যোগায়।একে আপনারা ভোকাল টনিক বলতে পারেন,যা অনেক ওষুধের থেকে শক্তিশালী আর এই ব্যবহার নামক আশ্চর্য ওষুধ ডাক্তার বাবুকে কর্পোরেটের ঝাঁ চকচকে চেম্বার থেকে টেনে এনে জন মানসে প্রতিষ্ঠা করে।এমন একেকজন ডাক্তার বাবু থাকেন যাদের নরম অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের আলোয় রুগী দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হয়ে যাওয়ার সাহস পায়।আর ডাক্তার বাবুর প্রাপ্য হয় শ্রদ্ধা,ভালোবাসা,যা প্রভূত অর্থের বিনিময়েও অর্জন করা যায় না।রায়গঞ্জ শহরে অনেক ডাক্তার বাবু আছেন যাঁরা ডাক্তার হিসেবে ভালো হলেও তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী কম।তাই তাঁরা রোগীর কাছে আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেন না।আবার এমন অনেকেই আছেন যাদের ডিগ্রী হয়তো কম,কিন্তু মানবিক উৎকর্ষের কারণে তাঁরা ভীষণভাবে সমাদৃত।কিছুদিন আগে যখন ডাক্তার সুদেব সাহা করোনা জয় করে ফিরে এলেন,তখন দেখেছিলাম তাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগ,আবেগের অশ্রু। ডাক্তারবাবুর চোখেও জল।এর মধ্যে শুধুই ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নেই।আমাদের এখানে মানে কর্ণজোড়াতে একজন কম বয়েসী হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বাবু আসেন।ওষুধের দাম কখনোই ৩৫ টাকার বেশি হয় না।তিনি আমাদের ছোট খাটো অসুখে ভরসা।একদিন দেখি ডাক্তার বাবুর চেম্বার এ টেবিল এর উপর কয়েকটা গন্ধরাজ ফুল।জিজ্ঞাসা করতে বললেন এক দিদা নাকি গাছের প্রথম ফোঁটা ফুল দিয়ে গেছে ডাক্তার বাবুকে।কি বলবেন এটাকে?কত টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় এই আন্তরিকতা?কলকাতা শহরে আমাদের চেনা একজন ডাক্তার বাবু আছেন,যিনি পেটের রোগ বিশেষজ্ঞ হলেও আমাদের কাছে উনি সর্ব রোগের প্রথম চিকিৎসক ও পরামর্শ দাতা।আমার এক ছাত্র দীর্ঘদিন পেটের অসুখে ভোগার পর,তার চিকিৎসায় সুস্থ হয়।ডাক্তার বাবুর প্রতি ভালবাসায় সে নিয়ে গিয়েছিল রায়গঞ্জের সুপ্রসিদ্ধ বিকোরের বেগুন।ডাক্তার বাবুও হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন সেই উপহার।

আমাদের বর্তমান সময় বড়ো আত্মকেন্দ্রিকতা,দেখন দাড়ির সময়।অহঙ্কার আর ফালতু আতলামির মুখোশ পরে আমরা অনেকের থেকে দূরে সরে যাই।আমি অমুক,আমি তমুকের সাথে কেন মনের কথা বলবো,,!এই বোধ যাদের থাকে তাদের বৃত্তের পরিধি ক্রমে ছোট হতে থাকে,তাদের কাছেই নিজের দুঃখ বিষম বড়ো ঠেকে আর তারাই হন ডিপ্রেসন নামক মহামারির শিকার।মরে যাওয়ার পর কেউ হিসেব রাখবে না,আপনার কত টাকা ছিল,কোন গাড়িতে চেপে আপনি ঘুরতেন।সে সব ভোগ করবে আপনার পরিবার।কিন্তু ওমুক কি ভালো মানুষ ছিলেন,হয়তো আপনার মৃত্যুতে তার চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠবে,সেটাই তো জীবনের পরম পাওয়া।আপনি এসব নাই মানতে পারেন।তবুও ধূপের মতো জীবন ই তো কাম্য।আসুন না একবার ধুপ হওয়ার চেষ্টা করি।ডাক্তার বাবুর মতো চেষ্টা করি মানুষের মনে বাসা বাঁধতে।

49

Leave a Reply