Categories
প্রতিবেদন

আত্মজর কলমে ডা: অশোক ব্রহ্ম

ডা: অনুপম ব্রহ্ম

জীবন কখনো কখনো গল্পকে হার মানায় ।ছেলের জন্মদিনের সন্ধ্যায় বাবার মৃত্যু হয় । মৃত্যুর খবর পেয়ে লকডাউনের মধ্যে ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে পঁচিশ কিলোমিটার দূরের এক গঞ্জ থেকে ময়লা সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা ছুটে আসে । ছেলের হাতে চারটে ডিম দিয়ে বলে, “তোমার বাবা আমাদের থেকে কোনোদিন ভিজিট নেয় নাই । বাড়িতে এটাই ছিল । তোমরা খেয়ো ।”

জীবন কখনো কখনো গল্পকে হার মানায় । বাবার মৃত্যুর পর ছেলে যত পরিচিত মানুষের ফোন পায়, সবার থেকে একটাই কথা শোনে, তোমার বাবা ওই সময় আমার ওই উপকারটা করেছিলেন, নাহলে কী যে হত! ছেলে অবাক হয় একটা মানুষ কখন কীভাবে এত মানুষকে স্পর্শ করেছেন । সে অবাক হয়ে দেখে বাবার শেষযাত্রায় সঙ্গী মানুষদের বেশিরভাগের সাথেই বাবার রক্তের সম্পর্ক নেই ।বাবার এক রোগী এগিয়ে এসে দরকারি বাঁশ কেটে দেয় । প্রতিবেশীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে, ছেলেকে বলে, “তুই এসব কী বলছিস ভাই,আবার হাসপাতালে গিয়ে ঠিক করে দেখ।”

হইহল্লা না-করে, চুপচাপ কীভাবে মানুষকে ছুঁয়ে দিতে হয় তা বাবার থেকে শেখার। সকাল থেকে চেম্বারে ভিড় । ছোট্ট আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা তোমাকে এত রুগী দেখাতে আসে, এত টাকা পাও, তবু আমাদের গাড়ি নেই কেন?” বাবা বলল, “সব আমি কিনে নিলে তোরা কী কিনবি?” আরেকটু বড় হয়ে জানলাম বাবা ভিজিট নেয় কুড়ি টাকা । আমাদের বাড়ি ছোট্ট রায়গঞ্জ শহরের এক প্রান্তে । আশপাশ দিয়ে যত গ্রাম, সেখানকার সব মানুষদের ভরসা ব্রহ্ম ডাক্তার । জ্বর হয়েছে? ব্রহ্ম ডাক্তারের কাছে যাও,সারিয়ে দেবে । টাকা পয়সার চিন্তা করতে হবে না ।বাজাজ কাব স্কুটারে করে ব্রহ্ম ডাক্তার সন্ধ্যেবেলা শহরের চেম্বারেও যাবে । সকালে বাড়িতে দেখাতে না পারলে সেখানেও দেখানো যেতে পারে। “তুমি ভিজিট বাড়াও না কেন একটু?” উত্তর হল, “কী চাই বল না? কোন জিনিসটা চাই? বাড়িতে খাওয়ারের অভাব? জামা কাপড় নেই? ঘুরতে নিয়ে যাই না? পড়ার বই নেই? “

বাবা চেম্বার থেকে ফিরল, হাতে রংচঙয়ে শুকতারা। আমার হাতে শুরুতেই দিল না ।বাঁটুলটা পড়ল, তারপর আমি পেলাম। বাবার টেবিলে দেখলাম টিনটিন রাখা। খোলা ।এনেছে, কিন্তু আগে নিজে পড়বে, তারপর আমরা পাব । রাতে খেতে বসে মহাভারত পড়ে শোনাচ্ছে, আর আমরা খাচ্ছি। ছুটির দিনে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় নিয়ে বিছানায় ।শীর্ষেন্দুর প্রতিটা ভূতের নাম মুখস্থ ।

রাগ নেই এমন মানুষ হয়? সারাদিন ব্যস্ত, দিনের শেষে আরাম করে বসে টিভি দেখছে আর বৌদির পেছনে লাগছে। একসাথে দশটা কাজ, দশটা কাজের প্রতি সমান নজর, শান্ত-স্থির । প্রবল বেগে মানুষের উপকার করে যাচ্ছে, কিন্তু কখনো সে-সব বলা নেই । গীতায় কর্মযোগ পড়েছ, কর্মযোগী দেখেছ? হ্যাঁ, আমার বাবা । বড়মাপের সাধক না হলে সারাদিন এত ব্যস্ত থেকে সব কাজ শেষ করে রাতের বেলা দেড়টা-দুটো অবধি আমাদের হ্যা-হ্যা হি-হি তে সমান তালে সাথ দেওয়া যায় না। কোনো কারণে বাড়ির সবাই প্রবল টেনশনে, বাবা চুপচাপ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে । পরিবারের প্রতিটা মানুষের প্রতি সমান নজর ।

লিখতে গিয়ে যতই গলা ধরে আসুক আর চোখ ভিজে যাক লিখতে তো হবেই। আমার বাবা শুধু আমার বাবা না, দাদা, জেঠু, সোনাকাকু, মেসো, অসংখ্য মানুষের ডাক্তারবাবু। কোভিডের জন্য লকডাউন শুরু হল, কিছুদিনের জন্য জোর করে চেম্বার বন্ধ করানো হল। তারপর “ধুর কিছু হবে না, তোদের সবেতে বাড়াবাড়ি। আমাকে যে লোকগুলো দেখাত, তারা কাকে দেখাবে?” চেম্বারের ডিজাইন বদলে গেল। ওয়েটিং এরিয়া চারপাশ খোলা, দূরে দূরে চেয়ার।ডাবল মাস্ক, ফেস শিল্ড পরে রোগী দেখা চলল ।

কোথা থেকে ইনফেকশন এল কে জানে। কাশি,শ্বাসকষ্ট নিয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি। বুকের স্ক্যানে বোঝা গেল সেই ভাইরাসই বটে । চিকিৎসা হল । খুব ভাল সাড়া।চোখমুখ ভাল লাগছে। অক্সিজেন আর দিতে হচ্ছে না। RT-PCR হল । নেগেটিভ। কিন্তু দুর্বল ফুসফুসে অন্য সংক্রমণ হল । রক্তে ছড়িয়ে গেল। আর রক্ষা হল না । এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোম সম্পর্কে অনেক কথা দেখা যাচ্ছে। আজ বাবা থাকলে এর সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা উনিই করতেন। ডঃ শান্তনু দাসের কাছে আমাদের পরিবার চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। উনি অনেক চেষ্টা করেছেন, কলকাতা থেকে পালমোনোলজিস্টদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে, এইমস-এর বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে ; কিছু করা যায় নি।

কর্মযোগী মানুষ তো, অন্য যেখানে বেশি দরকার সেখানে তিনি রওনা হয়েছেন।

223

Leave a Reply