Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : সাহিত্য সমালোচনা

পত্রিকা : এক পশলা বৃষ্টি বিশেষসংখ্যা:কিন্নরদের কলমে

বিনীতা সরকার

“কাপড়ের নীচে কি আছে সেটা ইম্পর্টেন্ট নয়, মাথায় আর মনে কি আছে আর কি করতে পারলাম জীবনে,সেটাই ইম্পর্টেন্ট।”

এমন দৃপ্ত কণ্ঠ যাদের,বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও মনন তাঁদের কলমে লেখা অসাধারণ একটি সংখ্যা খুব সম্প্রতি পড়লাম। বলছি খুব সম্প্রতি পঠিত কবি ও সম্পাদক শ্রী অম্বরীশ ঘোষ দাদার সম্পাদনায় রচিত ‘এক পশলা বৃষ্টি’র কিন্নরদের কলমে লেখা সেই বিশেষ সংখ্যাটির কথা। এই চমৎকার উদ্যোগটির জন্য প্রথমেই সম্পাদক দাদাকে জানাই আমার কুর্নিশ,আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। তিনি কিন্নরদেরকে দিয়ে কলম ধরিয়েছেন, তাঁদের মনের না বলা কথাগুলোকে সকলের মাঝে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন,এটা সত্যিই একটা বিরাট ব্যাপার। এর আগেও কিন্নর বন্ধুদের নিয়ে কাজ হয়েছে। অন্যেরা তাঁদের সুখ-দুঃখ ষ,জীবনের কথা সবার মাঝে তুলে ধরেছেন,ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু এবার কিন্নররা নিজেরাই তাঁদের কথা, তাঁদের জীবনের কথা নিজেদের কলমে তুলে ধরেছেন এই সংখ্যায়। সেই দিক থেকে সংখ্যাটি সত্যিই বিশেষ। আর অসাধারণ এই সংখ্যাটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শ্রীহরি দত্ত। তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে নতুন কোরে কিছুই বলার নেই, তাঁর প্রত্যেকটি শিল্পকর্মই ভীষণভাবে জীবনমুখী যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

অনেক কিন্নর বন্ধুরাই লিখেছেন এই সংখ্যায়। ষোলো পাতার এই মর্মস্পর্শী সংখ্যাটি পড়ে জেনেছি তাঁদের মধ্যে অজস্র জীবন জিজ্ঞাসা রয়েছে, গোপন কান্না রয়েছে, লুকোনো দুঃখ-বেদনা-লাঞ্ছনা রয়েছে আবার আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপনের বাসনাও রয়েছে। তাঁদেরও জীবনে প্রেম, ভালবাসা, সমাজ,সংসার সবকিছুরই বাসনা আছে। কিন্তু তা অপূর্ণ থেকে গেছে, থেকে যাচ্ছে। সমাজের মূল স্রোত থেকে তারা বরাবরই বঞ্চিত। সমাজের অন্ধকার গলিঘুঁজিতে কেন তাঁদের ঠাঁই হবে?কেন তারা পাবেননা আলোর সন্ধান? এই প্রশ্ন বারবার মনকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে বন্ধুরা। অথচ তাঁরা এই আলো-হাওয়া-মাটি সবকিছুরই অংশীদার, তাঁরাও এই পৃথিবী মায়েরই সন্তান। এই জীবনের পথে প্রতি মুহূর্তে তাঁদের নানান ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয় এই সমাজ সংসারের থেকে। তাঁদের জীবনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলেছে অমাবস্যার অন্ধকার। কেন এতগুলো প্রাণ এভাবে হারিয়ে যাবে অন্ধকারে? আমাদের কি কোন দায়বদ্ধতা নেই? বইয়ের প্রতিটি পাতায় ফুটে উঠেছে কিন্নরদের অনিঃশেষ দুঃখ কষ্ট ও বেদনার ছবি। তাদের মনের কষ্টের অনুভূতিগুলো তারা কি সাবলীল ভাবে লিখে গিয়েছেন তা পড়বার পর সত্যি দু’চোখে ভিজে আসে। একজন মানুষ হয়ে আর একজন মানুষের জীবনের এই সূক্ষ্ম আবেগ-অনুভূতি কষ্টগুলো আমাকে ভীষণ ভাবে ছুঁয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। তাঁদের না পাওয়া, তাদের প্রতি অন্যদের অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজের বিরূপতা সবকিছু ফুটে উঠেছে কিন্নর বন্ধুদের কলমে।

তাঁরা যখন লেখেন —-” আমরা জানি না কেন এরকম হয়েছি। বাড়িতে যতই জায়গা-জমি থাকুক, যতই ভালো মন্দ অবস্থা থাকুক, আমরা বাড়িতে জায়গা পাই না। শুধু একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই আমি আমরা। লোক যেন আমাদের দেখে হাসাহাসি না করে। মানুষ ভেবে একটু সম্মান করে, সেইটুকুই শুধু চাই। ” সত্যি বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তখন তাঁদের এই অসম্ভব জীবন যন্ত্রণার কথা শুনে। অনেকেই লিখেছেন ছোটবেলা থেকে তাঁরা ফ্যামিলির কোনো সাপোর্ট পাননি, তাঁরা ছোটবেলায় তাদের সহপাঠী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকেও সহযোগিতা, ভালবাসা বা আশানুরূপ ব্যবহার পাননি,বরং নিগৃহীত হয়েছেন সকলের কাছে শারীরিক ও মানসিকভাবে বারবার। তাঁদের এই বিপর্যয়ের কথা সুধী সমাজের ক’জন মানুষ ভেবে দেখেন? তাঁরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন? কিভাবে সুস্থ জীবন যাপন করবেন? আমার মনে হয় না তথাকথিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা খুব বেশি এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। বরং,দিনের পর দিন অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের নানা ভাবে। কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। যা সুশীল,সভ্য, মানবিক সমাজে কোনো ভাবেই কাম্য নয়। সময় এসেছে বদলাবার। এইরূপ মানসিকতা পরিবর্তন করবার। তাঁদের এই যন্ত্রণা,এই কষ্ট কে উপহার দিল এই এক অনন্ত জিজ্ঞাসার জায়গা। আসুন না একটু ভাবি তাঁদের কথা । তাঁদের অনেকেই আছেন দুঃখ পরিতাপ করেন যে তাঁরা নারী হলে স্বামীর সঙ্গে সুখের সংসার করতেন। সন্তানাদিও থাকত তাঁদের। কিন্তু তাঁরা আশাহত। এমতাবস্থায় তাঁরা সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। আমরা কি একটুও ভাববো না তাঁদের ন্যায্য অধিকারটুকুর কথা?

আমরা কি তাঁদের প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি না? সময় এসেছে ভেবে দেখবার। এই বিপুলা পৃথিবী অকৃপণ সংসারে তাঁদের প্রতি একটু ভালোবাসা,একটু সহানুভূতি পৌঁছে দিতে আমরা কেনো কার্পণ্য বোধ করব একটু ভাবুন শুধু বন্ধুরা। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় যখন পরম ধর্ম তখন আমরা কেনো নিজেদের সংকীর্ণ গন্ডির ভেতর আটকে রাখবো? আমাদের ছুড়ে দেওয়া অন্ধকারেই কি তাঁরা দিন দিন ডুবে যাচ্ছে না? তাঁরা তো তাঁদের আলাদা করতে চাইনি, তাহলে আমরাই কি তাঁদের আলাদা করে দিচ্ছি না সমাজের বুক থেকে সুকৌশলে? ভেবে দেখবার সত্যি সময় এসেছে। যখন তাঁরা বুকফাটা আর্তনাদে চিৎকার করে জানতে চায় তাঁরা কেন আলাদা, তখন কি কোনো সদুত্তর থাকে আমাদের কাছে থাকে ?হয়ত বা না। আমরা কেউই আসলে আলাদা নই বন্ধুরা। আমরা সবাই প্রকৃতি মায়ের সন্তান, ঈশ্বরের সন্তান। আমাদের মতন তাঁরাও স্বপ্ন দেখেন লিঙ্গ ভেদাভেদ বর্জিত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ বর্জিত, ন্যায় ও সাম্য দিয়ে গড়া এক সুশীল সমাজের। নিজেদের কর্ম ও গুণে তাঁরা জায়গা করে নিতে চান এই সমাজে। এটা কোনো দোষের নয়। আত্মমর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে সমাজের বুকে বাঁচতে চান তাঁরা, আসুন তাঁদের বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়াই, সাহায্য করি। কিছু না দিতে পারলেও দূর থেকে একরাশ ঘৃণা ছুঁড়ে দেবেন না তাঁদের প্রতি। বরংচ,পারলে ভালবাসার পরশ দিন তাঁদের অবহেলিত প্রাণে। আড়চোখে নয়, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে বন্ধু হয়ে উঠুন তাঁদের। কেননা—
“সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”

আমার মানবিক আবেদন সকলের প্রতি তাদের কাজ ও মানসিকতার ভিত্তিতে দেখা হোক, মানুষ হিসেবে দেখা হোক, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়। যে যন্ত্রণাগুলো তাঁদের দিনে দিনে শেষ করে দিচ্ছে, আমরাই পারি তা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে। আমরা কি পারিনা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে? তাঁদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল, আরও মানবিক হয়ে উঠতে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার বন্ধুরা। আসুন তাঁদের জানার চেষ্টা করি। একসাথে সমাধানের পথে হাঁটি। হয়তো একদিনে কিছুই সম্ভব হবে না তবে ধীরে ধীরে অবশ্যই হবে। আসুন তাঁদের বিশ্বাস করি। মনে রাখতে হবে বন্ধু বিশ্বাসই জীবন আর অবিশ্বাসই মৃত্যু। আসুন এই মানবজমিনে বিশ্বাসের চারা রোপণ করি। আসুন না আরও একটু মানবিক হই। আকাশের মতো মন নিয়ে তাঁদেরও বুকে টেনে নিই। আপনজন হয়ে উঠি তাঁদেরও। আমরা মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে যন্ত্রণা কিভাবে উপহার দিতে পারি, বলুন। তার চেয়ে বরং আসুন না একটু খানি আলোই পৌঁছে দিই তাঁদের জীবনে। হয়ত তাঁরা এই আলোটুকুরই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন জীবনের পর জীবন ধ’রে। হয়ত!!!

পত্রিকা-এক পশলা বৃষ্টি
বিশেষ সংখ্যা
(কিন্নরদের কলমে)

সম্পাদনায়-শ্রী অম্বরীশ ঘোষ
প্রচ্ছদ-শ্রীহরি দত্ত

63

Leave a Reply