Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : মুক্তগদ্য

জন্ম এবং মৃত্যুর ঠিক মাঝখানের গোটা অংশটা জুড়ে থাকে জীবনযাপন

দীপেন ভূঞ্যা

ঘাটাল হাসপাতালে মেইন গেটে ঢুকেই ডানদিকে এমার্জেন্সী সেকশন৷ তার সামনের রাস্তার বামদিকে পরপর অনেকগুলো সিমেন্টের বাধানো বেঞ্চ, পেশেন্ট পার্টির বসার জন্যই হয়তো৷ আমি যে বেঞ্চটায় বসে আছি ঠিক তার বামদিকের বেঞ্চে একটা কাপল৷ মেয়েটা চুলের ক্লিপটা টেনে চুলটা হঠাৎ খুলে ফেলে, তারপর আবার গুছিয়ে নিয়ে খোঁপা করার চেষ্টা করে৷ কিন্তু একগুচ্ছ চুল প্রথম থেকেই বড্ড অবাধ্যতা করে চলেছে, মুহুর্ত পরে ছেলেটি সেই গুচ্ছ চুলকে পরম যত্নে পিছন থেকে মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিলে মেয়েটি নিজের চুলগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে খোঁপায় বন্দী করে ফেলল৷

আমি ভ্যাকসিন(Covaxin) নিতে এসেছি৷ আমাদের বামদিকের সেকশনে ভ্যাকসিন শুরু হবে এগারোটার পর, আমি পৌঁছে গেছি দশটার আগেই, একটা বেঞ্চ আমার অধিকারে৷ ওদিকে মেয়েটার চুল বাঁধা কমপ্লিট, ছেলেটার মুখে মুচকি হাসি৷ ছেলেটার পিঠে কলেজ ব্যাগ আর মেয়েটার কাঁধে সাইডব্যাগ৷ একটু পর দুজনেই হাত ধরে আমাকে ফেলে রেখে বেরিয়ে গেল, আমি নিজেকে ব্যস্ত করে তুললাম মোবাইলে৷

ঠিক এমন সময় একটা এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে এসে থামলো এমার্জেন্সীর গেটে! মুহুর্তের ব্যস্ততা! কিছু মানুষের দৌড়দৌড়ি! তারপর সব চুপচাপ, চুপচাপ বসে আমিও৷ হঠাৎ একটা দমকা কান্নার আওয়াজে চমকে উঠলাম! বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্নের এক ভদ্রমহিলা আমার পাশে এসে বসলেন, কাপড়ের আঁচলটা নিজেই নিজের মুখে চেপে ধরে কান্নার বেগটা আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন কিন্তু পারছেন না৷ দমকা কান্নার বেগের সাথে সাথে কিছু অস্পষ্ট কথা ছিন্নবিচ্ছিন্ন ভাবে আমার কানে এসে স্পর্শ করছে৷ একটা প্রবল অস্বস্তি আমাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলছে, নির্দিষ্ট বেঞ্চ থেকে উঠে পালাবো কিনা ভাবছি, ঠিক সেই সময় ভদ্রমহিলা অশ্রুসজল চোখে আমাকে বলে উঠলেন,

—’একটা ফোন করতে দেবেন ভাই?’

কান্নায় দলা পাকানো কন্ঠটা আমাকে আরও স্থবির করে দিল৷ নাইলনের ব্যাগের ভেতর থেকে একটা রুমালের পুঁটলি বের করে তার মধ্য থেকে একটা প্রেসক্রিপশন বের করে আমার হাতে তুলে দিলেন, পিছনে একটা নম্বর লেখা! ‘বাবা’…

নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করে ভদ্রমহিলাকে আমার ফোনটা বাড়িয়ে দিলাম৷ ভদ্রমহিলা দ্বিতীয়বার কান্নায় ভেঙে পড়ল,

—’বাবাগো! সব শেষ হয়ে গ্যাল বাবা! আমি বিধবা হয়ে গেনুম বাবা গো! তমার মেইছ্যানাটা কি লিয়ে বাঁচবে বাবা……’

না, বাকি কথাগুলো শোনার ক্ষমতা, ইচ্ছে, ধৈর্য্য কোনটাই আমার ছিল না, নেই৷ আমার পাশেই ভদ্রমহিলা ফোনটা হাতে নিয়ে বেঞ্চের তলায় গড়িয়ে পড়েছেন প্রায়, কান্নার দমকে পিঠটা বেঁকে গেছে৷ আমি উল্টোদিকে তাকিয়ে চোখের জল লুকোনোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছি৷ আমার সামনে ভ্যাকসিনের নির্দিষ্ট চেম্বারে তখন ধীরে ধীরে মানুষজনের ভিড় বাড়ছে৷ 

—’দাদা! ফোনটা…’

পিছুডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ালাম, বছর পঁয়ত্রিশের এক ভদ্রমহিলা আমার ফোনটা ফিরিয়ে দিলেন, তেনার পাশে আরেকজন ভদ্রলোক৷ সেই ভদ্রলোককে দেখে প্রথম ভদ্রমহিলা কান্না ভুলে মাথায় ঘোমটা টেনে নিলেন, চোখের জল মুছে একদম স্বাভাবিক গলায় দ্বিতীয় ভদ্রমহিলাকে  উদ্দেশ্য করে বললেন,

—’কখন এলি?? জামাই কখন এল!! একসঙ্গেই এসচু???’

চমকে উঠলাম!! যে ভদ্রমহিলা একটু আগে স্বামী হারানোর যন্ত্রনায় কুঁকড়ে গিয়েছিলেন, কান্নার দমকে গোটা শরীরটা বেঁকে গিয়েছিল প্রায়, সেই তিনিই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে এত স্বাভাবিক হলেন কিভাবে!!!? যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে মেয়ে জামাইয়ের সাথে কথা বলতে লাগলেন!!

মেয়ে উত্তর দিল,

—’এই এনুম! একসঙ্গেই এসচি আমরা৷’

মায়ের চোখেমুখে প্রবল চিন্তা,

—’আগে ঘরকে গেইলি না একেবারে এখেনকেই চলে এসচু? জামাইকে জল টল দিইছিলি খেতে?’

মেয়ে মুখঝামটা দেয়,

—’তোখে এখন কুটুম্বিতা করতে হবে নি!! (জামাই ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে) তুমি এগবার ভিতরকে যেয়ে দেখ, বডিটা কখন দ্যায়! কি নিয়ম কিনুন, কাগজপত্র…’

বলতে বলতে মেয়েটা কেঁদে ফেলল হঠাৎ করে! ভদ্রলোক আমাদের ফেলে রেখে এগিয়ে গেলেন এমার্জেন্সীর দিকে৷  ওদিকে মা আর মেয়ে, দুইজন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাহাকার করে উঠলেন৷ ‘কিকরে হল! কেন এমন হল!’ এরকম হাজারও টুকরো টুকরো কথা আমাকে ক্রমশ অবশ করে দিচ্ছে, চলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছি৷ ইচ্ছে হচ্ছে উঠে আসি ওখান থেকে, কিন্তু পারছি না৷

এমন সময় মেয়ের ফোন হঠাৎ বেজে উঠতে দুজনের কান্না থামলো, মেয়ে ফোন রিসিভ করে কিছু কথা বলে মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল! মা ফোন ধরে,

—’বাবলু? কাঠ জোগাড় হয়েছেরে?’

—****

—’না না! বাবলা গাছটা গটা কাটিসনি! বড় হোক গাছটা! তুই অন্য গাছ দ্যাখ! এজমালি জায়গায় ত অনেক গাছ আছে, সবারির তো ভাগ সেই গাছগুলানে! সেখেন থেকে কাট৷ আমাদের খামারের গাছে হাত দিতে হবে নি৷ বুইলি?’

মায়ের চোখের জল ক্রমশ শুকিয়ে উঠছে৷ মৃত্যূ মানেই যে অতীত, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাঁর কাছে৷ বাস্তবে ফিরে আসছেন ধীরে ধীরে৷ বাস্তবের হিসেব, নিকেশ, সম্পত্তি, ভাগ বাটোয়ারা, আমার, ওদের….সব জাগতিক বোধগুলো জাগ্রত হচ্ছে ভদ্রমহিলার মধ্যে৷ দ্বিতীয় ফোন,

—’হ্যালো! বড় বৌমা? বলচি মড়া লিয়ে যেতে তো দেরি হবে গো৷ রান্না বসি লাও না! জামাই এসচে, ঝি এসচে, ঘরের ছ্যানা মেইছ্যানাগুলান সব আছে! মড়া ঘরে ঢুকলে তো আর খাওয়া চলবেনি না পুড়িয়ে ঘুরে এসা পর্যন্ত৷ তমরা সব খেয়ে লাও, আমাদে কত দেরি হবে এখন!!’

পরের ফোন,

—’হ্যালো, হ্যাঁ শ্যামলকাকু? সবই ত শুনেচ… ভোমলাকে পাঠাচ্ছি! ভুষিমাল সদাপাতি যা লাগবে কাকু তুমি একটু দিয়ে দিবে, আমি ঘর যেয়ে পয়সা মিটি দুব৷ ঐ তিরিশ চল্লিশ জন তো হবেই কাকু…হ্যাঁ দেহটা পুড়ি এসে তো ময়দা খেতে হয়৷’

মা কান্না ভুলে, স্বামী হারানোর যন্ত্রনা ভুলে ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে উঠলো৷ ওদিকে মেয়েটার মুখে ভীষণ চিন্তার ছাপ,

—’মা? বাবার এলাইসির কাগজগুলান সব ঠিক জায়গায় রেখেচু ত! গুছানা আছে তো!! ছোটদাকে দিয়ে একবার অফিসে পাঠাতে হবে, কত কি পাওয়া যায়!!’

মা মুহুর্তে অগ্নীশর্মা হয়ে ওঠেন,

—’তুই কি পাগল হলি!! ছোট বৌকে চিনুনু? টাকা যদি অদের হাতে উঠে থালে আর চোখের দেখা দেখতে পাবি!! তুই বরং জামাইকে বলে ব্যাবস্থা কর!!’

—’কত টাকার করেছিল বল দিখি মা!’

—’আমার অত মনে নাই৷’

আবারও একটা ফোন,

—’হ্যালো? (অস্ফুটে দমকা কান্নাটা গলার কাছে আটকে রেখে) এই ত হল একটু আগে!! সব শেষ হয়ে গেল বড় কাকি গো!! আমি বিধবা হয়ে গেনুম….’

—******

—’না না, সবাই এসচে! মেইছ্যানা জামাই সবাই হাসপাতালে৷ (অদ্ভুতভাবে কয়েক সেকেন্ড আগের কান্নাটা উধাও) বলি কাকি, সেই মুনুর ছ্যানা হইচে নাকি শুননুম! কদিন আগেই ত বিয়া হল, বলি বিয়ার আগেই কি!!!’

ওদিকে জামাই এসে হাজির,

—’বডি নিয়ে যেতে হবে তো!!’

শাশুড়ি মা আবার কেঁদে উঠলেন, ব্যাগের পুটুলি থেকে কিছু টাকা বের করে জামাইয়ের হাতে দিলে জামাই হাসপাতালের গেটের দিকে চলে গেল৷ মেয়ে চোখমুখ কুঞ্চিত করে জিজ্ঞাসা করল,

—’মা! মুনুর ছ্যানা হইচে নাকি??’

মায়ের মুখে মুচকি হাসি,

—’আর বলিসনি! কত গন্ডগোল করে ত বিয়াটা হল! নির্ঘাত পেটে ছিল, নাহলে কি বিয়াটা হত নাকি!! হি হি হি…’

মেয়ের মুখেও মুচকি হাসি,

—’বাবা! মুনুর কত ঢঙ কত ঢঙ! মাদ্যমিকটা পাশ করে মনে কচ্ছিল য্যামন পধানপন্তি হয়ে গেছে! তলে তলে যে এতকিছু আমরা কি জানিনি নাকি, না কিছু বুঝিনি! আমরা লোকের লিয়ে পরচচ্চা করিনি তাই!’

—’তুই মুনুর কথা বলচু ক্ষেপি!! মুনুর মাকে থালে কি বলবি? সে তিনকাঠ উপরে! সেই অমুক সিরিয়ালটায় দেখুনু, পুরা ছোট বৌটার শাশুড়ির মত!!’

—’হ্যাঁ গো মা! সিরিয়ালটা কেমন করে শেষ হয়ে গেল বল? আরেকটু টানলে ভাল করত!’

এমন সময় দুটি ছেলে এসে হাজির হয়,

—’ও কাকি! এবারে ঘর যেতে হবে ত!! বডি উঠে গেছে গাড়িয়ে৷’

মা আর মেয়ে দুজনেই কেঁদে লুটিয়ে পড়ল আরও একবার৷

***

ভ্যাকসিনের কাউন্টারে ভিড়টা ক্রমশ বাড়ছে, বাড়ছে রোদের তেজও৷ আমি বেঞ্চ ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ালাম লাইনে৷ ওদিক একটা ডেডবডি আর কান্নায় ভেঙে পড়া কিছু শরীর এগিয়ে যাচ্ছে মেন গেটের দিকে৷

জন্ম আর মৃত্যূ, জাস্ট দুটো আলাদা মুহুর্ত মাত্র৷ আর এই দুটো মুহুর্তের মাঝে টানাপোড়েন চলে আরও অনেকগুলো মুহুর্তের৷ সেখানে খিদে পাওয়া থাকে, যৌনতা থাকে, সন্ধের সিরিয়াল থাকে, পাশের বাড়ির চর্চা থাকে! সম্পত্তির হিসেব নিকেশ থাকে, পারিবারিক অশান্তি থাকে! ভালবাসা থাকে, ঝগড়া থাকে! শুধু প্রতিটা ঘটনা নিজের জন্য আলাদা আলাদা মুহুর্ত বেছে নেয়, কিন্তু থেমে থাকে না কিছুই৷ একটা জন্ম বা একটা মৃত্যূ, কখনই জীবনযাপনে পূর্ণচ্ছেদ টানার ক্ষমতা রাখে না৷

47

Leave a Reply