পাপিয়া দাস
বেশি দূরে নয়। শহর রায়গঞ্জের পাশে আরেকটি গঞ্জের বুথে প্রিসাইডিং অফিসার রূপেন সংস্থিতা হয়েছি- মেসেজ পেয়ে ষষ্ঠ দফার ভোটগ্রহণের উদ্দেশে একুশে এপ্রিল বেলা এগারোটা নাগাদ চাড্ডি ডাল-ভাত খেয়ে লোটাকম্বল নিয়ে ডাবল মাস্ক পরে , গলায় প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্বের আইকার্ড ঝুলিয়ে আর ১৮ই মার্চে নেওয়া প্রথম ডোজের কোভিশিল্ডটুকু সম্বল করে টোটোয় চড়ে বসলাম Distribution Centre মানে পলিটেকনিক কলেজে যাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়, পলিটেকনিক কলেজ দৃষ্টিগোচর হওয়ার আগেই টোটোদাদা হালটি ছেড়ে দিলেন চাদ্দিকের ভোটকর্মীদের আনা নেওয়ার জন্য রাশি রাশি বাসগাড়ির ভীড়ে টোটো চালাবার পথ না পেয়ে ।
অগত্যা “আপনা হাত জগন্নাথ”- ভরসা করে ভরদুপুরের রোদে যখন লটবহর নিয়ে টানা হাঁটতে শুরু করলাম, মাথার ঘামের প্রথম ফোঁটাটি পায়ে পড়লো । কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে গিয়ে পড়লাম এবার জনসমুদ্রে । এ বাবা ! সমগ্র উত্তর দিনাজপুরের কোনো বাড়িতে আজ বুঝি লোক নেই কো ! সবাই তো দেখছি এখানেই এসে ছোটাছুটি করছে ! চাদ্দিকে হৈহৈ কান্ড ! ভোটকর্মীদের মহা হট্টগোল কলরোলের মধ্যে ঘুর্ণীপাক খেতে খেতে ফোনাফুনি করে আমাদের পোলিং পার্টির চারটি প্রাণী একত্রিত হলাম অবশেষে । কাউন্টার থেকে জিনিষপত্র বুঝে নিয়ে নিজেদের লটবহরের সাথে ইভিএম মেশিন আর কাগজপত্রের বান্ডিল বোঝাই করে আরেক পোলিং পার্টির চারজন এবং তাদের মালপত্র সমেত যখন 6678 নং সওয়ারী গাড়িটিতে চেপে বসলাম আমরা আটজন, মরচে পড়া গাড়িটা যেন কঁকিয়ে বলে উঠলো–“ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো এ গাড়ি , তোমাদের ভারেতে আজ যাবো কি মরি ? “
এরপর সেই বন্ধ জানালাওয়ালা গাড়ি বাস-সমুদ্রের জ্যামের মধ্যে দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমাদের নিয়ে মূল রাস্তায় পৌঁছলো একসময় । একটু খোলা হাওয়া পেয়ে সত্যি সত্যি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম গাড়ির প্রেশার কুকারে হাফ-সেদ্ধ হয়ে যাওয়া আমরা । দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বুথে । স্কুলের বন্ধ গেট খুলে দিয়ে রাইফেল হাতে ফৌজি ভাই যখন ইয়াব্বড়ো একটা সেলাম ঠুকলো , তখন সেই মূহূর্তের জন্য নিজেদের যদি একটু কেউকেটা ভেবে ফেলি, তাহলে কি আর এমন দোষের হয় বলো?
স্কুলে পাশাপাশি দুই ঘর বরাদ্দ ছিলো আমাদের দুই পোলিং পার্টির জন্য । চাদ্দিকে তাকিয়ে দেখি স্কুল ক্যাম্পাসেই CRPF ভাইদের থাকার আস্তানা । তারওপর ওঁরা যখন জানালেন এই কোভিডকালে বাইরের খাবার না খেয়ে আমরা বরং ওঁদের ক্যান্টিনেই ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার খেতে পারি জনপ্রতি মাত্র ১০০টাকার বিনিময়ে , ব্যস্ , নিরাপদে থাকা খাওয়া নিয়ে আমাদের চিন্তা রইলো না আর । স্কুল গেটের পাশেই একটা দোকানে ঠান্ডা জল , গ্লুকন ডি ইত্যাদি কিনতে কিনতে একটু খোঁজখবর নিলাম চারপাশের। একটু পরে সন্ধ্যে ঘনালে পোলিং এজেন্টরাও এলেন আলাপ পরিচয় সারতে । বুথের ইতিহাস সম্পর্কে একই কথা বললেন এঁরা সবাই । –“আগর ফিরদৌস বার রুই-ই জমিন অস্ত, হামিন অস্ত – উ হামিন অস্ত – উ হামিন অস্ত”(অর্থাৎ স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তাহলে সে এখানেই” –বলেছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর তখনকার কাশ্মীর সম্পর্কে ।) একই ভাবে এজেন্টরা, স্হানীয় লোকজনরা সবাই বললেন , পৃথিবীতে সবচে’ শান্তিপূর্ণ ,সবচেয়ে নির্ঝন্ঝাট বুথ যদি কোথাও থেকে থাকে তাহলে সে এটাই, সে এটাই।
স্বস্তি পেয়ে ঘরে ফিরে টিমটিমে আলোয় মেঝেতে প্লাস্টিকের ওপর একটিমাত্র চাদরের রাজশয্যা পেতে বসে পড়লাম আমরা চারজনা পরের দিনের কাগজপত্র রেডি করতে । মাঝে একসাথে সবাই রোমান্চিতভাবে সাগ্রহে ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর বরাদ্দ মেনু দিয়ে ডিনার সেরে নিলাম তাদের দেশবাড়ির গল্প শুনতে শুনতে ।
তারপর “গভীর হয়েছে রাত , পৃথিবী ঘুমায়।” হঠাৎ পিলে চমকানো কড় কড়াৎ আওয়াজ ! যাচ্চলে !! সবার আশ্বাস বাণী ব্যর্থ করে দিয়ে এ কি বোমা না কি ?? না: আসলে ওটা মেঘের গুরুগুরু । তবে এও তো দেখি আরেক মুশকিল হলো ! কাল কি তবে “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে” ভোট করতে হবে ? তাহলে তো আবার শেষবেলায় কিউ স্লিপের ঝঞ্ঝাটে পড়তে হতে পারে ঠিক সময়ে ভোট শেষ না হলে ! যাগ্গে , কপালং শরণং গচ্ছামি ভেবে নিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে রাত সাড়ে তিনটের এ্যালার্ম সেট করে মেঝেতে শয্যা নিলাম । রাত পোহালে কাল এ ঘরেই ৬৫৮ জন ভোটারের পদধূলি পড়ার কথা ।
শেষ রাতে অ্যালার্ম কোঁকর কোঁ করে উঠতেই তড়িঘড়ি স্নান সেরে ঘর সাজিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম সবাই। ক্যান্টিনের চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখি স্কুলের গেটের পাশে ফুটে থাকা রাধাচূড়া আর পূব আকাশের লাল আভা মিলেমিশে একাকার । যাদের আজ ভোট নেই তারাও উঠে পড়েছে নিয়মমতো। সূর্য্য উঠছে, ফুলেরা ফুটেছে, পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ।
সাড়ে পাঁচটায় মক পোল। কিন্তু এজেন্টদের দেখা নেই। পোনে ছ’টা অব্দি অপেক্ষা করে শেষে নিয়ম মেনে নিজেরাই যখন শুরু করলাম তার একটু পরে এজেন্টরাও চলে এলেন একে একে । বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে শেষ হলো মক পোলিং । মেশিনপত্র সিলিং শেষ করতে না করতেই দেখি স্কুলমাঠে ভোটারদের লম্বা লাইন ।
মূল ভোটপর্ব শুরু হলো । বেলা গড়াতে লাগলো , ভোট পড়তে লাগলো । ফার্ষ্ট পোলিং মৃদুলা, সেকেন্ড পোলিং ঋতুপর্ণা , থার্ড পোলিং পিঙ্কি সুন্দর ভাবে ঠান্ডা মাথায় নিজেদের কাজ করতে লাগলো ঠিকঠাক । এরই মাঝে লাইনে ভোটার না থাকলে “আইয়ে , আপলোগ লাঞ্চ কর্ লিজিয়ে” অথবা “থোড়ি সি চায়ে পিজিয়ে গা” ? -তে সাড়া দিয়ে খাওয়া সেরে আসছিলাম একে একে । মৃদুলা বা পিঙ্কি খেতে গেলে তখন আমি ফার্স্ট পোলিং বা থার্ড পোলিং, আবার ঋতুপর্ণা খেতে গেলে মৃদুলা তখন সেকেন্ড পোলিং–এইভাবে প্রয়োজনমতো ডিউটি চেন্জ করে ভোটপর্ব চললো দিনভর । কোনো ঝামেলা ঝন্ঝাট ছাড়াই প্রায় মাখন মসৃণ ভাবে । আর তা দেখে এজেন্টভাইরাও মৃদুমন্দ হাসছিলো । ট্রান্সলেশন করলে যার মানে দাঁড়ায়–“কেমন ? বলেছিলাম না? এমন বুথটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি , সকল বুথের সেরা বুথ সে এই সুভাষগঞ্জেই , জানি !” ফৌজি ভাইয়েরা অবশ্য প্রায় প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় “সম্ভবামি যুগে যুগে”-র মতো করে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে সব ঠিক চলছে কি না দেখে আবার নিবিষ্ট হচ্ছিলেন বাইরের পাহারায় ।
সাড়ে পাঁচটার পর দেখা গেল লাইনে কেউ নেই আর । ভোট পড়েছে মোট ৫২৪ টি । নিয়মমাফিক সাড়ে ছ’টা অব্দি অপেক্ষা করে “ভোট শেষ হলো” ঘোষণা করে বাকি কাগজপত্র গুটিয়ে নিতে হলো তাড়াতাড়ি । কারণ পরদিন ভোর পাঁচটায় CRPF বাহিনীকে রওনা হতে হবে সপ্তম দফায় দক্ষিণ দিনাজপুরের ভোট পাহারার জন্য। অগত্যা বঙ্গপুলিশবাহিনী , আশাকর্মীদিদি ইত্যাদি সবাইকার রিলিজ পত্রের সইসাবুদ সেরে সাত্তারাতাড়ি আবার মালপত্রসমেত উঠে পড়তে হলো সেই 6678 নং সওয়ারিতে।
পলিটেকনিক কলেজের গেট দিয়ে ঢোকামাত্র “আবার সে এসেছে ফিরিয়া !!”– বলে সেদিনকার মতো ওই একই রকম ভীড় গ্রাস করে নিলো আমাদের । কাউন্টারের কাছাকাছি একটু ফাঁকা জায়গা বেছে কাগজপত্র মেলে সবাই মিলে আবার লেগে পড়লাম বাকিটা কমপ্লিট করতে। এরই মধ্যে মৃদুলা আবার বাড়ির কাউকে দিয়ে দোকান থেকে বিরিয়ানি আনিয়ে আমাদের রাতের উদরপূর্তির ব্যবস্থাও করে ফেললো । তারপর আর কি ? এগারোটার দিকে RC তে ভোটের মোটঘাট জমা দিয়ে আমাদের টিম টুয়েলভের(12/035) সবাইকে টা টা দিয়ে পাশের বাড়ির ভাই দেবুর ব্যবস্থাপনায় টোটোয় চেপে ‘সো গ্যয়া ইয়ে জাহাঁ’ আর আকাশ ভরা চন্দ্রতারা দেখতে দেখতে বাড়ি পৌঁছে হাইজিনিক স্নান সেরে বিছানায় এলাম যখন , ঘড়ির কাঁটা তখন পোনে তিনটের ঘরে ঢুকেছে , ক্যালেন্ডারের পাতায় শোভা পাচ্ছে ২৩শে এপ্রিল ।
সে দিন থেকে আজ অবধি আছি নিভৃতবাসে, কোভিড যুগে যার অফিসিয়াল নাম হোম আইসোলেশন । কারণ বুথে মোটামুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পারলেও DCRC-র মহাকুম্ভমেলায় সামিল হয়ে করোনা না হওয়াটা যথেষ্ট আশ্চর্যের । তাই আগাম সাবধানতা পরিবারের এবং প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার জন্য ।
ভোটমেলায় তোমরা সুনাগরিক হিসেবে সবাই তো সামিল হয়েছো নিজের নিজের মতো করে । তাই সবার জন্য প্রার্থনা — সবাই সুস্থ থাকো , সাবধানে থাকো।