Categories
প্রতিবেদন

করোনা ভাইরাস ও ভবিষ্যৎ

অরিন্দম ঝা

এপ্রিল ১৯,২০২১: দীর্ঘ এক বছর চার মাস অতিক্রান্ত। আবার পৃথিবীতে আরম্ভ হয়েছে করোনার দ্বিতীয় সংক্রমনের ঢেউ। চলুন ফিরে দেখা যাক ভাইরাসটিকে, বুঝতে চেষ্টা করি ভাই এই ভাইরাস থেকে আমরা কতটা সুরক্ষিত বা ভ্যাকসিন আমাদের কতটা সুরক্ষিত রাখবে।

সবচেয়ে আগে জানতে চেষ্টা করি ভাইরাস জিনিসটা কি..?

খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে ভাইরাস হল জীব এবং জড়ের মাঝামাঝি একটি অদ্ভুত বস্তু। জীব দেহের বাইরে এ ভাইরাস মৃত অর্থাৎ জড় পদার্থের মত আচরণ করে, কিন্তু জীব কোষের ভেতরে এটি বংশবিস্তার করে থাকে। তাই এটিকে জীব এবং জড়ের মধ্যবর্তী একটি বস্তু বলা হয়। করোনাভাইরাস ঠিক তাই, জীব দেহের (হোস্ট যেখানে এরা বংশবিস্তার করতে পারে) বাইরে এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল অথচ জীব দেহের ভেতরে এটি বংশবিস্তার করে এবং রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

COVID-19 ও করোনাভাইরাস: ইনফ্লুয়েঞ্জা নামটির সঙ্গে আপনারা সকলেই পরিচিত। ফিবছর আমাদের যে সর্দি-কাশি-জ্বর হয় ইনফুয়েঞ্জা ভাইরাস তার একটি অন্যতম কারণ। করোনাভাইরাস হচ্ছে একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস। করোনাভাইরাস স্তন্যপায়ী এবং পাখিদের মধ্যে আপার রেস্পিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ঘটায় অর্থাৎ শ্বাসনালীতে সংক্রমণ ঘটায় এবং অনেক সময় নিউমোনিয়ার সৃষ্টি করে। ১৯৬০ সালে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব প্রথম সামনে আসে। তাহলে এই করোনাভাইরাস এবং COVID-19 এর জন্য যে করোনাভাইরাস দায়ী সেটা কতটা আলাদা..? আদি করোনাভাইরাস টি কোনও ভাবে মিউটেট হয়েছে এবং এটি আজকের COVID-19 রোগের জন্য দায়ী।

এবার সংক্ষেপে জেনে নিন মিউটেশন জিনিসটা কি..? কোষ বিভাজন দ্বারা একটি কোষ থেকে অন্য কোষ যখন সৃষ্টি হয় তখন ডি.এন.এ রেপ্লিকেশন ঘটে। এই ডি.এন.এ রেপ্লিকেশন এর সময় সিকোয়েন্সিং এর কোথাও কোনো সমস্যা (বাইরের কোনও রাসায়নিক এর প্রভাবে) ঘটলে বা সিকুয়েন্স পাল্টালে নতুন ডিএনএ সিকুয়েন্স সৃষ্টি হয় যেটা কিনা আগের ডি.এন.এ সিকোয়েন্স থেকে আলাদা। ফলে উৎপন্ন কোষটির আকার এবং চরিত্র উভয়ই আলাদা হতে পারে। এটি হলো মিউটেশন। করোনাভাইরাস হলো আর.এন.এ ভাইরাস এবং মিউটেশন এর ক্ষেত্রেও ঘটে। আগে যে করোনাভাইরাস এর অস্তিত্ব ছিল সেটি মিউটেশনের পরে মানুষের মধ্যে প্রচুর ভাবে সংক্রমণ ঘটানোর জন্য সক্ষম হয়ে উঠে এবং আপার রেস্পিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ঘটাতে সক্ষম হয়ে ওঠে। এর সংক্রমণ ক্ষমতা এত বেশি যে হু এটিকে প্যানডেমিক ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

 *রোগের ভয়াবহতা এবং অজানা কথা:*  

অন্যান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মত করোনাভাইরাস একটি বায়ুবাহিত ভাইরাস অর্থাৎ COVID-19 একটি বায়ুবাহিত রোগ এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বায়ুবাহিত কথার অর্থ হল এই ভাইরাস বাতাসের দ্বারা সংক্রমিত হয় এবং ধুলোবালিতে মিশে আমাদের শরীরের ভেতরে কোনভাবে প্রবেশ করে ইনফেকশন ঘটায়। আরো একটি বায়ুবাহিত রোগের উদাহরণ দিয়ে সেটা হল টিউবারকিউলোসিস বা টি.বি। যেগুলো বায়ুবাহিত রোগ সেগুলো আটকানো খুব মুশকিল অর্থাৎ আপনি কোনোভাবেই এই ভাইরাস বা এই রোগের হাত থেকে নিস্তার পাবেন না। আপনি ভাবতে পারেন যে ফেস কভার অথবা মাক্স এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার করে আপনি করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাবেন অর্থাৎ এই রোগ থেকে আপনি সুরক্ষিত থাকবেন এই ঘটনা টা পুরোটা সঠিক নয়। আপনি পুরো ঘটনাক্রম মনে করে দেখুন আগে WHO বলল যে তিন ফুট দূরত্ব এবং মাক্স এবং স্যানিটাইজার যথেষ্ট করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে, তারপর কিছুদিন পর আসলো মিনিমাম ছয় ফুট দূরত্ব রাখতে হবেই ভাইরাসের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে। আর কালকে একটি জার্নালে পড়লাম যে আপনি যদি একটি ঘরের মধ্যে থাকেন এবং মাক্স ব্যবহার করেন এবং সেই ঘরে যদি কোন করোনা সংক্রামিত ব্যক্তি থাকে তাহলেও আপনার মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে। আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন হু বারবার নিজের অবস্থান পালটাচ্ছে কেন। কথা হচ্ছে যেহেতু এই সংক্রমণ টি নতুন কাজেই রোজ রোজ নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে এবং তার থেকে প্রাপ্ত ফল বিশ্লেষণ করে WHO এই নির্দেশ দিচ্ছে। আমাদের একটা কথা মনে রাখা দরকার আজ হোক বা কাল আমরা এই করোনা সংক্রামিত হবই।

এবার আসি ভয়াবহতার কথায়, আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা যথেষ্ট কম। আপনি কি জানেন টি.বি তে ভারতবর্ষে প্রত্যেক বছর প্রায় ২৪ লক্ষ লোক আক্রান্ত হয়, এবং এই টিবিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রত্যেক বছর দু লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। অথচ এইটা আপনি জানেন না এবং এটা নিয়ে আপনি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন কারণ এটা আপনাকে জানানো হয়নি তাই আপনি জানেন না। শুধু তাই নয় প্রত্যেক বছর multidrug-resistant টিবির সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজারের ওপর। অথচ এই টিবি রোগের জন্য কোথাও কোন প্রচার হয় না কেউ আপনাকে বলেও না। আবার দেখুন এই করোনা ভাইরাস যেভাবে প্রচার পেয়েছে তাতে মৃত্যুহার এর তুলনায় মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে বেশি।

 *ওষুধ এবং ভ্যাকসিন:* এটি আর.এন এ ভাইরাস ঘটিত রোগ। তাই প্রথমেই বলে দেওয়া দরকার কোন এন্টিবায়োটিক এই রোগকে বা এই ভাইরাসটি আটকাতে সক্ষম নয়। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর বাক্টেরিয়া সংক্রমনের উপর, ভাইরাস এর উপর এ কোন কাজ করে না। তাই করোনা সংক্রমণ হলে অনেকে অ্যাজিথ্রোমাইসিন খান সেটা কেবলমাত্র কোম্পানিকে নিজের টাকা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপকারে লাগে না। এবার আসি হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন এর কথায়। হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন হচ্ছে ম্যালেরিয়া আটকানোর জন্য একটি ওষুধ অর্থাৎ এটি একটি প্যারাসাইটিক ড্রাগ। কাজেই থিওরিটিক্যালি কিছু করোনা ভাইরাস কে মারতে সক্ষম হলেও সার্বিকভাবে এটি কাজ করে না। আপনাদের হয়তো মনে থাকবে আমেরিকা ভারতবর্ষের কাছে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন চেয়েছিল, এবং তখন যেহেতু WHO এর নির্দেশে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন ছিল করোনার একটি ওষুধ তাই ভারত সরকার এটি দিতে অস্বীকার করে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেয় ভারত বর্ষ যদি হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন না পাঠায় তাহলে ভারতকে এর ফল ভুগতে হবে। তারপরে ভারত বর্ষ থেকে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন যেটা কিনা CIPLA তৈরি করে সেটি আমেরিকায় পাঠানো হয়। তার ঠিক কয়েকদিন পরেই আবার একটি গবেষণা পত্রে দাবি করা হয় যে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন ঠিক করোনা কে সেই ভাবে বাগে আনতে পারছে না এবং হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন এর একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে  ব্যবহারকারীদের মধ্যে তাই পরবর্তীকালে হাইড্রক্সি ক্লোরোকুইন কে করোনার ওষুধের লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়।

তারপরে আসলো রিটোনাভির রেমডিসিভির এবং আইভারমেকটিন। রেমডিসিভির এবং রিটোনাভির হলো অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ এবং আইভারমেকটিন হল অ্যান্টি পারাসাইটিক ড্রাগ। যথারীতি রিটোনাভির আবার ক্যান্সেল হল এবং তার পরে থাকল পড়ে থাকলো শুধু আইভারমেকটিন এবং রেমডিসিভির। দেখা যাচ্ছে রেমডিসিভির অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগটি করোনাভাইরাস এর পপুলেশন কিছুটা কমাতে সাহায্য করছে কিন্তু আইভারমেকটিন এ উপকারের তুলনায় সাইডএফেক্ট এর পরিমাণ টা একটু বেশি।

প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার রেমডিসিভির বা আইভারমেকটিন কোন ওষুধই করোনাভাইরাস কে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারবেনা। রেমডিসিভির কেবলমাত্র ভাইরাল লোড কে কমাতে সাহায্য করবে। আপনার শরীরে যতদিন না এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারছে ততদিন এই ভাইরাস থেকে আপনি সুরক্ষিত থাকবেন না। ফলে রেমডিসিভির ব্যবহার করলে যেহেতু ভাইরাল লোড কমছে সুতরাং ভাইরাসটি আমাদের শরীরের ক্ষতি করার জন্য বেশি সময় নিচ্ছে এবং সেই সময়টুকু আমাদের শরীর পাচ্ছে অ্যান্টিবডি তৈরি করার জন্য। অর্থাৎ মূল মন্ত্র টি আমাদের শরীরে লুকিয়ে আছে। যেদিন আমাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাবে সেদিনই আমরা এই রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারবো।

এইবার আসি ভ্যাকসিনের কথায়।

ভ্যাকসিন সাধারণত দু রকমের হয় একটা হোল বডি এবং আরেকটা যেটাতে ভাইরাসের ডিএনএ অথবা আর.এন.এ এর কিছু অংশ কে বিশেষ পদ্ধতিতে নিয়ে আমাদের শরীরে ঢোকানো হয়। হোল বডি ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে সাধারণত মৃত ভাইরাস অথবা ভাইরাসকে ইন্যাক্টিভ করে আমাদের শরীরে ঢোকানো হয়। দু’ধরনের ভ্যাকসিন’ই সমানভাবে কার্যকরী। আমাদের শরীরের ধর্ম হল যখনই কোনো ফরেন বডি আমাদের শরীরে ঢুকে তখন আমাদের শরীর সেটাকে নিষ্ক্রিয় করার অথবা সেটা কে মেরে ফেলার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ফলে যে পদ্ধতিতেই ভ্যাকসিন তৈরি হোক না কেন উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। আমরা দু’ধরনের ভ্যাকসিনের কথা এখানটায় শুনেছি একটা হচ্ছে COVAXIN এবং আরেকটা হচ্ছে COVISHIELD। COVAXIN এর ক্ষেত্রে একজন অ্যাসিম্টোমেটিক পেশেন্ট এর কাছ থেকে ভাইরাস কালেক্ট করে সেটাকে ইন্যাক্টিভ করে আমাদের শরীরে ঢোকানো হয়। আর COVISHIELD এর ক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করে করোনাভাইরাস এর আর.এন.এ এর একটি বিশেষ অংশকে নিয়ে সেটিকে আমাদের শরীরে ঢোকানো হয়। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং আস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন হচ্ছে COVISHIELD যেটা কিনা বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন নির্মাতা সিরাম ইনস্টিটিউট বানাচ্ছে। এই সিরাম ইনস্টিটিউট আগে পোলিও ভ্যাকসিন বানিয়ে গোটা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দিয়েছে। যাইহোক কোন ভ্যাকসিন ভালো এবং কোন ভ্যাকসিন বেশি ভালো সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এখানে দুটো ভ্যাকসিন প্রায় সমান ভাবে কার্যকরী। সাধারণত একটা ভ্যাকসিন বানাতে এবং তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে, হিউম্যান ট্রায়াল করতে এবং তার অনুমোদন পেতে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় বছর লাগে। কিন্তু প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার যেহেতু এখানে প্যানডেমিক ঘোষণা করেছে এবং গোটা পৃথিবীতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে তাই তড়িঘড়ি করে এই ভ্যাকসিন গুলো কে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, এবং একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে করোনাভাইরাস একটি আর.এন.এ ভাইরাস এবং এটি চরিত্রগতভাবে খুব তাড়াতাড়ি মিউটেশন করতে পারে। সাধারণত একটি স্ট্রেনের ভ্যাকসিন অন্য স্ট্রেন এ সঠিকভাবে কাজ করে না। এখন যে স্ট্রেন টি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেটাকে কিনা সুপার স্প্রেডার বলা হচ্ছে সেটা হচ্ছে B117। COVISHIELD এর মাধ্যমে আগের করোনাভাইরাস এর স্পাইক প্রোটিনের যে অংশটি কে নিয়ে আমাদের শরীরে ঢোকানো হয়েছিল এই B117 স্ট্রেন এ সেই স্পাইক প্রোটিন চেঞ্জ হয়ে গেছে। ফলে ভাইরাসটির গঠনগত পরিবর্তন হওয়ার জন্য দুই প্রকার ভ্যাকসিন কতটা কাজ করবে সেটা নিয়ে এখনও বিস্তর গবেষণা বাকি। কিন্তু সিরাম ইনস্টিটিউট বলছে যে ভাইরাসের যে পরিবর্তনই হোক না কেন তাদের ভ্যাকসিন প্রত্যেকটা মিউটেশনের ভাইরাসের ওপর সমানভাবে কাজ করবে। এইখানটায় একটা থিওরিটিক্যাল কনফ্লিক্ট আছে। যাইহোক ভ্যাকসিন নির্মাতা এবং বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা যখন বলছেন যে এই ভ্যাকসিন প্রত্যেকটা স্ট্রেনের উপর কাজ করবে এবং নতুন মিউট্যান্ট ভাইরাস এর উপর কাজ করবে সে ক্ষেত্রে আমরা ধরে নিচ্ছি এটি প্রত্যেকটি মিউটেশন এর পর উৎপন্ন ভাইরাসের ওপর সমানভাবে কার্যকরী। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই ভ্যাকসিন টা অন্তত নেওয়া উচিত। এবার অনেকের মনে হতে পারে যে আমার করোনাভাইরাস আক্রমণ হয়ে গেছে তাই আমার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে সুতরাং আমার ভ্যাকসিন না নিলেও চলবে।  কথাটা সম্পূর্ণরূপে ঠিক এবং বাস্তবসম্মত। ভ্যাকসিন যে কাজটা করে, আমার শরীরে ভাইরাস ঠিক সেই কাজটা আরো ভালোভাবে করেছে। এবার মনে রাখা দরকার অনেক ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রেই আমাদের শরীর ওই ভাইরাসের অ্যান্টিবডি কে নিজের স্মৃতিতে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনা। ফলে একবার করোনা ভাইরাসের আক্রমন হলে ভবিষ্যতে আবার করোনা ভাইরাসের আক্রমণ হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অনেকেই পরপর দুবার করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য অর্থাৎ আপনি ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও আপনার করোনা সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে দ্বিতীয়বার করোনা আক্রমণ হলে অথবা ভ্যাকসিন নেওয়ার পর যদি আপনি করোনা আক্রান্ত হন তাহলে সেই আক্রমণের তীব্রতা অর্থাৎ রোগের তীব্রতা অনেক কম হবে। তাহলে আপনারা ভাবতে পারেন যে আমাদের কি এই আক্রমণের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার কোন উপায় নেই..? অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে আপাতত এই আক্রমণের হাত থেকে আমাদের কোন নিস্তার নেই, এটাই কঠোর বাস্তব এবং আজ হোক বা কাল হোক, ভবিষ্যতে আপনার করোনা সংক্রমণ ঘটবেই। হ্যাঁ মাস্ক আর সামাজিক দূরত্ব এবং স্যানিটাইজার এর ব্যবহার আপনাকে হয়তো কিছুদিন সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখবে কিন্তু সংক্রমণ আপনার হবেই এ ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকের মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকা দরকার। আপনার মনে হতে পারে যে করোনা সংক্রমণ তো কমে গেছিল, কিন্তু স্যার ঠিক এটা নয়। আমার মনে হয় টেস্ট কম হচ্ছিল। কারণ আমরা লকডাউন করে এই ভাইরাসটি আটকাতে পারিনি, কাজেই যখন চারিদিকে খোলা তখন এই সংক্রমণ কমার কথাই নয়। তাহলে কি হয়েছিল..? লোকজন টেস্ট করায়নি যার জন্য ধরা পরেনি এখন আবার নতুন করে টেস্ট হচ্ছে দ্বিতীয় সংক্রমনের ভয় আসছে মানুষ টেস্ট করাচ্ছে আর ধরা পরছে। তাও আমি বলব যতটা না ধরা পরছে তার থেকে অনেক বেশি সংক্রমিত রোগী আমাদের দেশে আছেন, তাঁরা টেস্ট করাচ্ছেন না। ফলে আমাদের মতো দেশে আসল সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা জানা কোনদিনই সম্ভব নয়। আপনি ভাবতে পারেন আবার লকডাউন করে এই সংক্রমনের সংখ্যা কমানো যাবে কিন্তু আর লক ডাউন হয়তো হবে না এবং কঠোর বাস্তব হল লকডাউন করেও এই ভাইরাসকে আটকানো যাবে না। কারণ হিসেবে শুনে রাখুন লকডাউন করে কোন বায়ুবাহিত ভাইরাসকে আটকানো যায় না। একটি ভাইরাস শরীরের ভেতরে যখন থাকে তখন সে বংশবিস্তার করে এবং শরীরের বাইরে নির্জীব হয়ে পরে থাকে। সর্বশেষ প্রাপ্ত গবেষণার ফল অনুযায়ী করোনাভাইরাস মাটিতে মিশে দু দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু ল্যাবরেটরি তে পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক অনেকটাই হতে পারে অর্থাৎ একজন করোনা সংক্রামিত ব্যক্তি যদি রাস্তায় থুথু ফেলেন এবং সেই থুতুতে মিশে থাকা ভাইরাস পরিবেশে কতদিন বেঁচে থাকবে সেইটার গবেষণা এখনো পর্যন্ত হয়নি। আরেকটি কথা বলি কোন ব্যক্তি এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হলে তার শরীরে সংক্রমনের চিহ্ন প্রকাশ পেতে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ দিন লাগে এই সময়টুকুতে তিনি অ্যাসিম্টোমেটিক এবং তিনি অপরকে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট রকম সক্ষম।

যাইহোক আমি কেবলমাত্র একটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলাম। আমাদের মনে রাখা দরকার, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া এগুলো হলো আদিজীব/জড় অর্থাৎ প্রাণের সৃষ্টির সময় থেকে এগুলো বিরাজমান। আমি, আপনি এমনকি মানবসভ্যতা পৃথিবী থেকে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু এই ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। সেদিনই বিলুপ্ত হবে যেদিন পৃথিবী তাদেরও বসবাস করার অনুপযুক্ত হবে। তাহলে আমাদের কি কিছুই করার নেই, সত্যি কথা বলতে… না সেরকম কিছু করার নেই। আপনি বড়জোর কিছু জিনিস খেতে পারি যেগুলো আপনার শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে। না এই ভাইরাসের ওষুধ কোনদিন হয়তো বেরোবে না, কারণ ভাইরাসের সঠিকভাবে ওষুধ বা ভাইরাস কে মেরে ফেলার কোন ওষুধ বের করা হয়ত সম্ভব না। ভাইরাল লোড কমানোর জন্য কিছু ওষুধ বের হয় যেটা আমাদের শরীরে ভাইরাসের পপুলেশনকে কমাতে পারে কিন্তু ভাইরাস কে মারতে হলে বা কন্ট্রোল করতে হলে আমাদের শরীরকে নিজেকেই করতে হবে। আমাদের শরীরকে সেই ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি করে সেই ভাইরাসকে কন্ট্রোল করতে হবে। বাইরে থেকে কোন কিছু প্রয়োগ করে কৃত্রিমভাবে ভাইরাসকে কন্ট্রোল করা যাবেনা। সুতরাং আমাদেরকে ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে এইভাবে মিউটেশন হতে হতে যদি সেই আর.এন.এ এর সিক্যুয়েন্সে কোন ভুল সিকুয়েন্স তৈরি হয় তাহলে সেই ভাইরাস নিজে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সংক্রমিত করার বা প্রাণঘাতী হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে। তবে সেটা কতদিনে হবে সেটা এখনো পর্যন্ত বলা সম্ভব না এবং সেটা বের করাও সম্ভব না। ততদিন পর্যন্ত মাক্স ব্যবহার করতে হবে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সেটাতে যতটুকু আমরা সংক্রমণের হাত থেকে বেঁচে থাকি সেটাই আমাদের পাওনা।

 *এইবার আসি ভ্যাকসিন ওষুধ এবং ব্যবসার কথায়:* ভ্যাকসিন এবং ওষুধের ব্যবসা সম্ভবত সবচেয়ে বড় ব্যবসা। দুটো ছোট্ট উদাহরণ দিই। ইবোলা ভাইরাসের কথা শুনেছেন..? ২০১৩ সালে আফ্রিকার কিছু স্থানে এটি ছড়িয়ে যায়। এই ভাইরাসের মারণ ক্ষমতার জন্য WHO এটিকে এপিডেমিক ঘোষণা করে। আশ্চর্য্যের বিষয় বারবার আবেদনের সত্বেও তখন কোন ভ্যাকসিন নির্মাতা এটির ভ্যাকসিন বানাতে এগিয়ে আসেনি। অথচ দেখুন যখনই এই ভাইরাস প্যানডেমিক ঘোষণা হল তখনই বহু সংস্থা এর ভ্যাকসিন বানাতে ঝাপিয়ে পরল এবং যে ভ্যাকসিন বানাতে ৫-৬ বছর লাগে সেই ভ্যাকসিন ছ মাসের মধ্যে তৈরি হলো, ছাড়পত্র পেয়ে গেল এবং বাজারজাতও হয়ে গেল। আরেকটা কথা বলি কিছুদিন আগে, সিরাম ইনিস্টিটিউট যে ভ্যাকসিন বানাচ্ছে সেই ভ্যাকসিন ওদের এক্সপায়ারি ডেট (৬ মাস) এর কাছাকাছি পৌছে যায় তখন তারা আবেদন করে তাদের এই ভ্যাকসিনের এক্সপায়ারি ডেট (৯ মাস) বাড়ানো হয়। কোন গবেষণা ছাড়াই ভারতবর্ষে এই উর্ধ্বসীমা বাড়ানোর আবেদন ছাড়পত্র পেলেও WHO পরে এটিকে নাকচ করে দেয়। আপনারা এটি গুগল সার্চ করে দেখে নিতে পারেন। আরেকটা জিনিস খেয়াল করেছেন, এই বিগত লকডাউন এবং প্যানডেমিক এর সময় বহু ওষুধের কোম্পানি তাদের বহু ওষুধ এর দাম অনেক, অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। যাইহোক ভ্যাকসিন ওষুধ এবং ব্যবসা, এগুলি নিয়ে লিখতে বসলে প্রচুর সময় পার হয়ে যাবে এবং তাও লেখা শেষ হবে না।

আসল কথা হল আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে ততদিন, যতদিন না ভাইরাসটি নিজেই দুর্বল হয় অথবা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের শরীরে যদি এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। তাহলেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ কমে যাবে। তবে আপনারা ভয় পাবেন না এই ভাইরাসের মৃত্যু হার অনেক কম, আমরা একটু সাবধানে থাকলে এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচতে পারব এবং ভাইরাসের সংক্রমণ হলেও আমরা হসপিটাল এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলি তাহলে আমরা দিব্যি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারব।

তবে এই করোনা সংক্রমণে অনেক কিছু হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটি বড় পাওনা আমাদের সামনে আসতে পারে বা অন্তত সেটি আসার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। সিটি হল যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করে তড়িঘড়ি সিরাম ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিন প্রস্তুত করেছে সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে অনেক ক্যান্সারের ভ্যাকসিন এবং ওষুধ আমরা পেতে পারি। অন্তত বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী। অর্থাৎ আগামী দিনে আমরা বহু ক্যান্সারের ওষুধ পেতে চলেছি এমনকি ভ্যাকসিন পেতে চলেছি যাতে করে ক্যান্সার কে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা যেতে পারে, হয়তো করোনা সংক্রমনে অনেক কিছু হারানোর মধ্য দিয়ে, দেশের অনেক জনগণকে হারানোর মধ্যে দিয়ে এটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। হ্যাঁ, সেদিনও সংক্রমণ কমে যেতে পারে যেদিন এই ভাইরাসের টেস্ট কমে যাবে বা WHO ঘোষণা করবে যে সাধারণ হাপানির ইনহেলার প্রয়োগ করেই এই ভাইরাস সংক্রমণ কমানো সম্ভব।

89

Leave a Reply