ভোটপ্রার্থী ও আমি

সন্দীপ কুমার ঝা

আমি রোজ ভোটে দাঁড়াই।আমি রোজকার ভোটপ্রার্থী।
ভোট ব‍্যাঙ্ক বজায় রাখতে প্রতিদিনের খারাপ ‘ইমেজ’ গা বাঁচাই।পারিপার্শ্বিক ধুলোমাখা সব ধরনের ঘটনা থেকে,পালিয়ে চলি দূরে।’ভদ্র’ ইমেজ ধরে রাখতে,রোজ দাড়ি কামাই,বগলে ডিও মারি।ইস্ত্রি করা শার্ট প‍্যান্টে নিজেকে লুকাই।

রাস্তায় লোকজন এর সাথে দেখা হলে, ঘাড় বাঁকিয়ে বিগলিত হাসি বিলিয়ে চলি।এই করতে ঘাড় ট‍্যাঁড়া হয়ে হয়ে গেছে,তবুও এই ঢ‍্যামনামো সোজা হয়নি।

সাধারণ একটা জামা কেনার আগেও দশ দিক দেখে নিই।রঙ অথবা ডিজাইন আমার আজন্ম লালিত ইমেজের সাথে যাবে কিনা,সেটা বারবার দেখে নিতে হয়।
এভাবেই ‘জেকিল ‘ তার ইস্ত্রি করা জামার নীচে লুকিয়ে রাখে ধান্ধাবাজ ‘হাইড’।যে চিরকাল যা বলেছে,মনে মনে চেয়েছে তার অন‍্য কিছু ।প্রতিশ্রুতি দিয়ে,ভেঙেছে চিরদিন।বুকের ভিতরে হাজার ছল চাতুরী, শত রক্তক্ষরণকে, হাসি দিয়ে চাপা দিয়ে গেছে সব দিন।আমিই সেই ভোট প্রার্থী।

আমার আজীবনের,এই রোজকার নির্বাচনে আমার ছেলে,আমার স্ত্রী,আমার বাড়ির লোক,আমার পাড়া,আমার কর্মস্থলের কলিগরাই আমার ভোটার।আমাকে এদের ভোট পেয়ে বর্তে যেতে হয়।জিততে হয়।

ভোট হারানোর ভয়ে,মনের ভেতরেও আমি সবসময় হাতজোড় করেই থাকি।ক‍্যালানো বদনে নিজেকে,নিজেরই সামনে দাঁড় করিয়ে রাখি।

আসলে এই ভোট যুদ্ধে আমাকে অন‍্যের ঈর্ষা হতে উঠতে হয়।আমাকে সাজতে হয় আদর্শের পরাকাষ্ঠা।সবটাই ফাঁপা,তবুও সাজতে হয়।ঠিক যেমন,যাত্রা মঞ্চে ন‍্যাপলা সাজত আলকাপের নবাব।গাঁজাতে ফুঁকে যাওয়া কাঠির মত শরীরটাকে ঢেকে দিত,মুর্শিদকুলির ঝলমলে পোশাকে,ঠিক তেমনি।

শুধু আমার আয়না জানে আসল সত‍্য। “ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি”।ঠিক তেমনি করেই সে জানে,আমি আসলে কে!আমির ভেতরের আমিটাকে সেই কেবল চেনে।আমাকে জানে কেবল ওই একজন।ঐ শুধু জানে,আমার এই সাজিয়ে তোলা ভদ্দরলোকটা,আমি না। আমরা দুজন আসলে আলাদা আলাদা দুটো মানুষ।শরীর আর তার ছায়ার মত।এক সাথেই আছি,তবুও আলাদা।

এ সত্ত্বেও এই নির্বাচনী প্রচার একদিন শেষ হবে।সময় ক্ষয়ে ক্ষয়ে খাটো হয়ে যাবে। আয়ুরেখার সীমা পেরিয়ে,সময় পৌঁছে যাবে সব প্রচারের শেষে।তারপর শেষ ভোটটাও শেষ হলে,নামের পাশে লেখা হবে-‘মৃত’।

সেদিন মূখ‍্য কার্যালয় থেকে চলে গেলে, সম্ভাব্য একটা মিছিল যাবে।ধ্বনি হবে।কিছু ভালো কথা হবে,রুটিন মাফিক চলে যাবার পর যেমন হয় ।সামাজিক অভ‍্যাসে ঝরবে শুকনো খই,বাতাসের শরীরে।

আমির সঙ্গে আমি,সেদিন একসাথে ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাব ।কেউ জানবে না। অজান্তে,আমার সাথেই আরও একটা ছ‍্যাঁচড়া,বগল বাজিয়ে,সবাইকে চুতিয়া বানিয়ে চলে যাবে।পুড়ে যাবে-burn one,get one free.

কেবল আমার আয়না জানবে প্রকৃত সংবাদ, সব ধূর্তামি, সব নোংরামি, সব কাঠিকার্য দিয়ে কিভাবে,আমি বানিয়েছিলাম আমাকে।সবাইকে লুকিয়ে কিভাবে সাফল‍্য এসেছিল।কিভাবে ঠগবাজির উপরে,নির্মিত হয়েছিল- শূন‍্যের সিঁড়ি।কিভাবে হাতে এসেছিল, চিরদিনের winning certificate.

সেদিনও কেউ জানত পারবে না,মৃত ব‍্যক্তি আসলে একজন নয়,- দুজন। কেউ জানবে না কে জয়ী।জানবে না,বিজিতই বা কে!গুলিয়ে যাবে সব।ঘেঁটে যাবে।

আসলে গুলিয়ে দিতে পারাটাই ভোটের খেলা।ধাঁধাটাই বিজয়ের কৌশল।মুখোশটা চিহ্ন।এই তিন দিয়েই বিজয় আসে, আমাদের রোজের নির্বাচনে….

(Edited)

98