বাংলা ছোটগল্পে মুসলিম জনজীবন

পুরুষোত্তম সিংহ

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মহেশতলা থেকে উঠেছেন সাদিক হোসেন (১৯৮১)। আর্থিক কারণে পরাশুনায় বিচ্ছেদ ঘটে, বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। কবিতা দিয়েই সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল। প্রথম কাব্য ‘দেবতা ও পশুপাখি’ (২০০৭)। এরপরে কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেছেন। ইতিমধ্যেই বেশকিছু গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে –‘সম্মোহন’ (২০০৯), ‘গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময়’ (২০১৪), ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ (২০১৭) ও ‘হারুর মহাভারত’ (২০১৯ )। ‘কী লিখতে চাই’ শীর্ষক অংশ থেকে সাদিক হোসেনের লিখনবিশ্বের যাবতীয় ভাবনা গুলিকে প্রথমেই তুলে ধরি –

“কী লিখব আমি ? কী লিখতে চাই ? এখানে নির্জন দুপুরবেলা ঢ়োঁড়া সাপ গুটিয়ে শুয়ে থাকে খাটের পায়ায়। যথেষ্ট কার্বালিক অ্যাসিডেও তাঁর কোনো নড়নচড়ন নেই। যেন এই তার বাড়ি, এই তার কুঁড়েমির সংসার। আমি কেন তাকে অযথা অপ্রস্তুতে ফেলছি !

….    …..    ……    …….    ……    …….

কী লিখব আমি ? আমি কী লিখতে চাই ? হে আমার শব্দ, হে আমার ব্যাকরণ, হে আমার আ-কার, ই-কার, উ-কার তোমরা আমার পাসে এসে দাঁড়াও। আমাকে গাছের ভেঙে পড়ার শব্দ শোনাও। আমাকে দেখাও লক- আউট কারখানার সংগীত। আমাকে দেখাও আদিবাসী মুদ্রা।

আমি এই অচেনা ঘরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমি এই বিদেশে, এই অস্থানে, এই অসময়ে তোমাদের অপেক্ষায় কান পেতে রয়েছি।

তোমরা বজ্রপাতের মতো নেমে এসো, অতর্কিতে আঘাত করো, মশাল জ্বালিয়ে, লন্ঠন দুলিয়ে সোচ্চার হয়ে নেমে এসো আমার সাদা পৃষ্ঠায়।“ (কথাসোপান, শারদীয় ১৪২৪, পৃ. ১২৮, ১৩০) 

 বাংলা গল্পে ভিন্ন ভুবন নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন সাদিক হোসেন। একবিংশ শতাব্দীর বাংলা কথাসাহিত্যে অন্যতম শক্তিশালী তরুণ লেখক সাদিক হোসেন। আত্মপ্রকাশের কোন বাসনা নেই। তিনি গল্প নির্মাণ করেই সুখ পান। বাজারি পত্রিকায় সাদিকের লেখা তেমন স্থান পায়না। কেননা সাদিক বাজারি লেখক নন। শিল্পকে তিনি এলোমেলো ভাবে ছেড়ে দিতে চাননা। প্রবল ভাবে সময় সচেতন ও গল্পের রন্ধে রন্ধে এক প্রতিবাদের সুর বপন করে যান, যা রাষ্ট্রকে আঘাত করে মাঝে মাঝে। তিনি সস্তা প্রেমের গল্প লিখতে চাননি। বিনোদনের কাহিনি ফাঁদতে চাননা। অথচ এঁরাই আজকের শক্তিশালী লেখক। বাঙালি পাঠকের রুচি কোনদিকে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। অবশ্য চিরকালই তা ছিল। স্রোতের বিরুদ্ধে একদল লেখক শক্তভাবে নিজের আখ্যানভুবন নিয়ে বিচারণ করেছেন। নব্যকালের সেই লেখকদের মধ্যে অন্যতম সাদিক হোসেন। ‘অভিসারিকা’ ভিন্ন স্বাদের গল্প। মধ্যম পুরুষের মধ্য দিয়ে তিনি গল্পের কাহিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে গদ্য নির্মাণে সাদিক অত্যন্ত শক্তিশালী। দাদি ও নাতির ভাঙাগড়া জীবনচিত্রের মাধ্যমে গল্প শুরু হলেও তা এগিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়। এয়াকুব পছন্দ করত রাহেলাকে। কিন্তু সে রাহেলাকে পায়নি। অথচ বিনা অর্থে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে যেতে হয়েছে। গল্পের নায়িকার আজ দৃষ্টি পড়েছে এয়াকুবের প্রতি। নায়িকা আজ যৌবনে পা দিয়েছে। কিন্তু এয়াকুবের চেতন, অবচেতন মনে রাহিলা। এয়াকুব ও নায়িকার কথোপকথনে প্রচ্ছন্ন যৌনতার ইঙ্গিত আছে বটে কিন্তু লেখক যেন সচেতন ভাবেই তা এড়িয়ে যান। সাদিকের গল্পে যৌনতা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতেই ব্যক্ত হয়, কখনও বা পশু পাখির রূপকেই মানুষের অবদমিত কামনাকে তিনি প্রকাশ করেন। এয়াকুব ও নায়িকা আজ বেরিয়েছে অভিসারে। সেখানে শুধুই রহস্য ও রোমান্স। তেমনি নায়িকা যৌনতার উষ্ণ স্পর্শ পেতে চেয়েছে ভিন্ন ভাবে। এয়াকুব দুধের জোগান দেয় নায়িকার বাড়িতে। এয়াকুবকে সে শিস দিয়ে ডেকে সাড়া দিয়েছে। আবার কখনও আঙুল টিপে ধরে-

“তুমি এয়াকুবের আঙুলগুলোকে মুঠোতে নিয়ে বলো, ‘আর তুমি দুধ দোও বলে তোমার আঙুলগুলো এমন লকলক করতেছে।‘

এয়াকুব হাসে।

তুমি এয়াকুবের আঙুলগুলোকে টিপে টিপে দ্যাখো। আঙুলগুলোকে গাছে ঝোলা ডাঁটার মতো লাগে। মনে হয় দাঁতে চাপ দিলেই সাদা সাদা শাঁসালো আঁশ বেরিয়ে পড়বে। তুমি তাতে নখ দিয়ে চাপ দাও।“ (গিয়াস আলির প্রেম ও তার নিজস্ব সময়, সোপান, প্রথম প্রকাশ-২০১৪, পৃ. ৫৮)

 এরপর এয়াকুবকে ঘরে আহ্বান জানালেও কিছু হয় নি। বরং এয়াকুবকে দিয়ে দাদির পিঠে মলম মালিশ করা হয়েছে। গল্প শেষে তারা অভিসারে গেলেও দৈহিক মিলন হয় নি। দুজনই দুজনকে সাড়া দিয়েছে, আকারে ইঙ্গিতে উষ্ণতার ডাক দিয়েছে কিন্তু কোন মিলন হয় নি। লেখক এক আবহের সৃষ্টি করেছেন যেখানে মিলনের আকুতি আছে কিন্তু কেউ আর এগিয়ে যাবার সাহস পায় নি। প্রচলিত ছক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফর্মে সাদিক গল্প লেখেন, যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় নিজস্ব এক কথনভঙ্গি ও আঙ্গিক- এখানেই সে স্বতন্ত্র।

                                                        সাদিক হোসেনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সম্মোহন’ (২০০৯ )। গ্রন্থটি ‘সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার’ পায় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে। পাঁচটি গল্পের সংকলন, প্রথম গল্প ‘সম্মোহন’। প্রথম গল্পেই লেখক ব্যক্তি অপেক্ষা সমষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি নয় লেখকই কথক। জোহরবাদ, হাফিজ, ইব্রাহিম খাঁ, আলতাফ ও লেয়াকত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে গল্পের বৃত্তটি গঠন করেছেন। এঁদের পারস্পরিক বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে মুসলিম সমাজের রীতিনীতি, সমাজ-সংস্কার, লোকায়ত ,ধর্মীয় জীবন সমস্তই মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে লেখক সৃষ্ট ছড়াগুলি গল্পের কাব্যিকমূল্য বৃদ্ধিতে অনেকটাই সহায়ক হয়েছে। ‘আবদুল কাদেরের প্রতিশোধ’ গল্পেও শ্রেণি চরিত্রের কথা উঠে আসে। আর এই শ্রেণি হল মুসলিম জনমানসের প্রতিছবি। ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সাদিক যেন গোটা সমাজ মানসের কথাই বলতে চান, তাই তিনি বহু চরিত্রের অবতারণা করেন। জোলেখা বিবি, আব্দুল কাদের, ছাত্তার সাহেব, জৈগুন বিবি, ইয়াসিন, বদরুদ্দিন প্রভৃতি চরিত্রের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে গেছে। একটি সমাজের যেন ইতিবৃত্ত যেন লিখতে চান সাদিক –সেই সমাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলে এই বর্ণনা সম্ভব নয় – যেটা পারেন নি হিন্দু কথাকাররা। তাই হিন্দু কথাকারদের লেখাতে মুসলিম সমাজ এলেও রক্তমাংস সহ মুসলিম জীবনের অন্দরমহল ও বহিঃমহলের স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে নি – যা পেরেছেন সাদিকের মত অন্যান্য মুসলিম কথাকাররা। আব্দুল কাদেরের স্ত্রী জোলেখা বিবি। গল্পের শেষটা গড়ে উঠেছে মুসলিম উৎসব উপলক্ষে কোরবানীর দৃশ্যকে কেন্দ্র করে। তেমনি কে মসজিদের দায়িত্ব পাবে, কেন এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে জটলা, ছাত্তার সাহেবের হজ যাত্রাকে কেন্দ্র করে নানা মন্তব্য ও আলোচনা স্থান পেয়েছে। শুধু তাই নয় ফকির মোল্লার দ্বিতীয় পক্ষের জেগুন নিঃসন্তান। নিঃসন্তান নারীকে কেন্দ্র করে মুসলিম নিয়ম লোকাচার নানা ফাঁদ ফন্দি, নারী বলেই জোলেখাকে সবসময় পদদলিত হতে হয়েছে তা যেমন উঠে এসেছে তেমনি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সমাজ মানসিকতার ছবিও ফুটে উঠতে দেখি। সামান্য অংশ তুলে ধরি-

“ইলিয়াস মৌলনা এই অঞ্চলের কেউ না। সবে বছর দুই হলো তিনি এখানে এসে বাসা গেড়েছেন। তবে কী না মসজিদ কমিটি তাকেই এই মসজিদের ইমাম বানালো ? আর আব্দুল কাদের হয়ে গেল মোয়াজ্জিন! নিজের উপরই থুতু দিতে ইচ্ছে হয় আব্দুল কাদেরের। ছাত্তার সাহেবের সাথে ইলিয়াস মৌলনার কীসের এ্যাতো ভাব ! আব্দুল কাদের নিজের মনেই ছক কষে। ছক কষতে কষতেই সে নিয়েত বেঁধে নামাজে দাঁড়ায়।“ (তদেব, পৃ. ৫৩ )

সাদিক কখনোই কাহিনিমালা গড়ে তোলেন না। গল্প তাঁর কাছে কাহিনির উৎসব নয়। কখনও তিনি গল্প বলেন ,কখনও গল্পের সঙ্গে গপ্প জুড়ে দেন। আপাত দৃষ্টিতে তা অবাস্তব মনে হলেও গল্পের মধ্যে জড়িয়ে থাকে গভীর সত্য ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা। ‘করিম আলির রোশেনারা’ গল্পটিতে নানা প্রসঙ্গ জুড়ে দিয়ে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে এক অন্যরাজ্যে পাঠককে তিনি নিয়ে যান। একবিংশ শতাব্দীর জটিল তত্ত্ববিশ্বের মতোই তিনি গল্পে নানা রূপক, ধর্মীয় মিথ ও ইমেজের মাধ্যমে  পাঠককে এমন এক রহস্যজালে দাঁড় করান যেখানে থেকে পরিত্রাণ হতে বহু সময় লাগে। বলা ভালো সাদিকের গল্প উপন্যাস সাধারণ পাঠকের জন্য নয়। এ গল্পের প্রথমেই দেখা যায় রাতের বিছানায় করিম আলি ও রোশেনারার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে গল্প এক অবিশ্বাস্য পথে এগিয়ে যাচ্ছে। পাঠক যখনই ভেবছেন এক ফ্যান্টাসির দিকে গল্প বোধহয় এগিয়ে যাচ্ছে তখনই তিনি পাঠককে বাস্তবের মাটিতে নিয়ে আসেন। করিম আলির রোশেনারা ছাড়াও জমিলা বিবির প্রতি টান ছিল, তবে সমস্ত ত্যাগ করে সে এখন রোশেনারাকে নিয়েই বেঁচে আছে। গ্রামে ভোটের যে কোলাহল, ভোট নিয়ে গ্রাম্য পার্টির মধ্যে বিবাদ কোন্দল যেমন এসেছে তেমনি গ্রাম্য বাস্তবতার অনুপুঙ্খ চিত্র পাই। তবে সমস্তকে অতিক্রম করে প্রধান হয়ে উঠেছে করিম ও রোশেনারার দাম্পত্য জীবন। রোশেনারা আজ গল্প শুরু করেছে পীর দরবেশের। ফলে তাঁরা ভেসে যায় এক রূপকথার জগতে। যৌন জীবনে মিলিত হতে গিয়ে নানা বাধা, তা অতিক্রম করেও মিলিত হয়, রোশেনারা শারীরিক টান অনুভব করে। কিন্তু যৌনসুখ বলতে আমরা যা বুঝি তা নেই, সেখানেও তিনি পাঠকের মতিভ্রম ভেঙে দেন-

“করিম আলি আঁতকে ওঠে। পরক্ষণে ভীষণ রাগে রোশেনারাকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দেয়। ঠেলা খেয়ে রোশেনারা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। সেখানেই চিৎ হয়ে শুয়ে করিম আলিকে পেটি দেখায়। করিম আলি চেঁচায়, ’হারামজাদী মাগি’। রোশেনারা বলে ‘এসো’। করিম আলি একখণ্ড ভাঙা কাচ নিয়ে রোশেনারার দিকে তেড়ে গেলে রোশেনারা কেমন কায়দায় করিম আলির থেকে কাঁচখন্ডটা ছিনিয়ে করিম আলির মুন্ডুটা নিজের পেটের উপর চেপে ধরে বলে, ‘শোনো।‘

করিম আলি রোশেনারার পেটের ভেতর মাছের সাঁতার কাটা অনুভব করে।“ (সম্মোহন,দ্বিতীয় মুদ্রণ, কলিকাতা লেটারপ্রেস, পৃ. ১০২)

আজকের আখ্যানবিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প ছোটোগল্প। বাংলা ছোটোগল্পের যে রীতিবদল, নতুনত্বের খোঁজ দশকে দশকে শুরু হয়েছিল তা আজ প্রবাহমান। রাজনীতির সংস্কৃতি বা সংস্কৃতির রাজনীতি কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে সেই প্রাককথন উঠে এসেছে আজকের গল্পে। কুহকের বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবের মাধ্যমে আজকের গল্পকাররা গল্পে প্রবেশ করেছেন। আধুনিক ছোটোগল্পে যেসব নবীন লেখকরা এগিয়ে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাদিক হোসেন। তিনি নির্দিষ্টি কোন কাহিনি নিয়ে গল্প ফাঁদেন না। তিনি এলোমেলো জীবনস্রোতের মত গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভালোবাসেন। তেমনি সাদিকের গল্পে থাকে বহু উপকাহিনির সমাবেশ। এই উপকাহিনি গুলি নিয়েই তিনি গল্পের চরম সত্যে উপনীত হন। বাংলা ছোটোগল্পের যে আবহমান পাঠক তারা যেন সাদিকের গল্প পড়তে গিয়ে চমকে যান। বাস্তবের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন বাস্তবতা, স্বপ্ন- স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে যে বাস্তবতা, ইতিহাস, মিথ, লোককাহিনি নিয়েই তিনি গল্পে অবতীর্ণ হন।

27