২৩ শে মার্চ২০২০, অন্যান্য অনেকের মতোই দিনটা কাটিয়েছিলাম এক নতুন ধরনের উত্তেজনার সাথে। কোভিড নামক নতুন ভাইরাসের প্রকোপ আসন্ন লকডাউনকে কেন্দ্র করে তখন বিশ্বজুড়ে সাজো সাজো রব। আমাদের ঘরেও তখন ছুটির মেজাজ। ১২ কিলোমিটার দূরে থাকা বাবা মায়ের কাছে ঘন ঘন ফোন,ভিডিও কল করছি। সব কলের ই তখন বিষয়বস্তু একই … ভুলেও ঘরের বাইরে পা নয়, ঘন ঘন হাত ধোয়া ইত্যাদি।

কিন্তু সেই অখন্ড গৃহবন্দি অবস্থাও একটু একটু করে বদলাতে লাগলো জুন মাস থেকে। আন্ত দেশীয় বিমান চলাচল শুরু হলো, আমার জীবনসঙ্গীটি ও ফিরে গেলো নিজ কর্মস্থলে। আসতে আসতে নিঃসীম ভয় কাটিয়ে আমরাও ফিরে পেতে শুরু করলাম জীবনের পুরোনো ছন্দ। ঠিক সেই সময়েই ফের ছন্দপতন ! জাস্ট পুজো , দীপাবলি এসব মিটেছে। দীর্ঘ নয় মাস পর ভাইরা এলো মা বাবার কাছে, আমরা সবাই মিলে একটু হইহই করলাম ঘরে বসেই অনেকদিন পর। কিন্তু সেদিনই বাবাকে যেনো একটু চুপচাপ লাগলো বেশি। অন্যান্যবারের তুলনায় একটু দুর্বল। তেমনটা গা করিনি শুরুতেই। বরং বকাবকিই করলাম একটু তাঁর অতিরিক্ত পরিশ্রম করার জন্য। মোটে বিশ্রাম নিতে চায়না মানুষটা, সারাদিন ঘরে- বাগানে- বারান্দায় টুকটুক করে এটা সেটা করেই চলেছে, বয়স হয়েছে সেটা যেনো মানতেই চায়না। আর ঘন ঘন দোকান বাজার যাওয়া তো রয়েছেই !

পরদিন সব ঠিকঠাক। ভাইরা ফিরেও গেলো দিন দশেকের ছুটি কাটিয়ে । ঠিক তার পরদিন, ১৮ নভেম্বর বিকেলে বাবার জ্বরটা এলো, মায়ের ফোনে জানলাম। সত্যি কথা বলতে মনটা কেমন কু ডাকলো। প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় রাতটা কাটলো, পরদিন সক্কাল সক্কাল কোভিড টেস্টও করানো হলো রায়গঞ্জ হাসপাতালের ফিভার ক্লিনিকে বাবার। বাবা তখনো ফোনে আশ্বস্ত করে চলেছে আমাকে, ভাইকে। সত্যি কথা বলতে আমাদের আসল চিন্তা মাকে নিয়ে, একে তো সে প্রবল ডায়াবেটিক, তার ওপর আরো নানান সমস্যা। সে তুলনায় বাবা মোটামুটি সুস্থ ই বলা যায়।

২০ তারিখ রিপোর্ট এলো, পজিটিভ ! মুহূর্তে মাথায় বাজ পড়লো ! অরূপ ঘোষ এবং হেমতাবাদ BMOH এর উদ্যোগে বিকেলে বাবাকে ভর্তি ও করানো হলো রায়গঞ্জের কোভিড হাসপাতাল মিককি মেঘাতে। একটুও নার্ভাস না হওয়া আমার স্মার্ট বাবাটা তখন ফোনে ভরসা যোগাচ্ছে আমাকেই। অবস্থা স্টেবল থাকায় জেনেরাল ওয়ার্ডেই রাখা হলো বাবাকে।

তারপর আরো দুদিন কাটলো মোটামুটি ভালোই। বাবা নিজেও ফোন করতো, আর আমরা তো অসংখ্য বার কথা বলছিলাম ই। প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস হাসপাতালের গেটে পৌঁছে দিচ্ছিল কুন্তল। ২৩ তারিখ দুপুর অবধি এমনটাই চললো। আমাদের সবার মন তখন অনেকটাই শান্ত। দুপুরে পৌনে দুটোয় শেষবার বাবার সাথে কথা সেরে আমিও স্নান সেরে দুগাল খেয়ে নিলাম। এই কদিনের মধ্যে প্রথমবার একটু নিশ্চিন্ত বোধ করছিলাম। বিকেলে ৪ টা থেকে ৫ টা অবধি খাবার দেবার সময়। ঠিক ৪:০৫ মিনিটে চিকেন স্টু করে কুন্তলের হাত দিয়ে পাঠিয়ে আবার ডায়েল করলাম বাবার নম্বরে। কিন্তু এইবার শুধু রিং… রিং …. রিং  ! 

আমাকে স্তব্ধ – নির্বাক – অসহায় করে দিয়ে বিকেল চারটে কুড়িতে ‘সাডেন কার্ডিয়াক এরেস্টে’ বাবা চলে গেলো !

কি হলো, কেমন করে হলো … কিচ্ছু জানিনা। শুধু এইটুকুই জানি 

” আমার সুস্থ সবল বাবাটা আর কোনোদিন ও মামনি বলে ডাকবে না” !

আজ আমি রিক্ত …..

39